হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলায় প্রবল বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের ফলে প্রায় প্রতি বছরই দেখা দেয় অকাল বন্যা। সাধারণত মার্চ মাসের শেষের দিকে শুরু হওয়া বৃষ্টির ফলে এবং ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে বন্যার পানিতে হাওরের কৃষকদের বোরো ধান তলিয়ে যায়। তাই ধান রক্ষায় প্রতি বছর সরকারিভাবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে সুনামগঞ্জে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়ে থাকে।
প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ১২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। জেলার ১২টি উপজেলার ৫৩টি হাওরে ৬৮৬ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৪০০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধের নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড দাবি করছে জেলায় প্রায় ৮৫ শতাংশ বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় দেশ রূপান্তরকে জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবিকৃত কাজের সঙ্গে বাস্তবে কোনো মিল নেই। কারণ এখনও অনেক ফসল রক্ষা বাঁধে অর্ধেক কাজ করে ফেলে রাখা হয়েছে। পিআইসি কমিটির দাবি তারা ঠিক মতো কাজের বারাদ্দের টাকা পাচ্ছেন না। প্রথম কিস্তির টাকা পেলেও দ্বিতীয় কিস্তির টাকা এখনও ছাড় করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ।
এ ছাড়াও পিআইসির বিরুদ্ধে নি¤œমানের কাজের অভিযোগ রয়েছে। কিছুু কিছু বাঁধে বালিমিশ্রিত মাটি ফেলা হচ্ছে যা ফসল রক্ষার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, বিগত ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জেরবোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধ নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ করার কথা। তবে, কাজ শুরুর দুই মাস ১৫ দিন পার হলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনও ধীরগতিতে চলছে বাঁধ নির্মাণের কাজ।
সুনামগঞ্জের অধিকাংশ হাওরে কৃষকরা চাষাবাদ করলেও বাঁধ নির্মাণ কাজে ধীরগতির কারণে ফসলহানির আশঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা।
বিভিন্ন হাওর ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও কাজ চলছে। অবাক করা বিষয় হলো এখন পর্যন্ত অনেক বাঁধের অর্ধেকের বেশি কাজ বাকি রয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবার বাঁধ নির্মাণে সময় বাড়ানো হবে বলে অনেকেই মনে করছেন।
কিন্তু যে সময়ে বাঁধ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে ওই সময় থেকে নিয়মিতভাবে কাজ করলে বর্তমানে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর অনেক কিছু বাকি থাকে তা হলো বাঁধ যাতে বৃষ্টিতে ধসে না যায় সে জন্য দূর্বা ঘাস লাগানো, মাটি চাপিয়ে বাসানো (দুরমুজ) দেওয়া ইত্যাদি। আর এখনও বাঁধের কাজ শতভাগ শেষ না হওয়ার ফলে এ সব কাজ করতে আরও দেরি হবে। আর এ সকল কারণেই এ বছরও ফসল রক্ষা বাঁধ রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে।
জানা যায়, সুনামগঞ্জের শাল্লা, দিরাই ও ধর্মপাশা উপজেলাসহ জেলার মোট ১২টি উপজেলায় হাওরের বাঁধ নির্মাণের জন্য হাওরের কাজের ব্যস্ততা থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ।
তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি ইউনিয়নের আঙ্গারউলি হাওরের ১নং প্রকল্পে এখনও পুরোপুরিভাবে কাজ শেষ হয়নি। এ ছাড়া শাল্লার ভা-াবিল হাওরের বাঁধের মাটি নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়, সেজন্য পুরোনো বাঁধের মাটি দিয়েই জোড়াতালি দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন ফসলরক্ষা বাঁধ। এতে করে স্থানীয় কৃষকরা হতাশা ব্যক্ত করে জানান, এমনভাবে কাজ হলে যদি বন্যা হয়, তাহলে একটি বাঁধও টিকবে না।
ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনার থাল হাওরের ৩৩নম্বর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি কৃষক সালাহ উদ্দিন বলেন, আমাদের বাঁধটির দৈর্ঘ্য ৯৯০ মিটার। বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৫ টাকা। যথাসময়ে আমরা বাঁধের কাজ শুরু করেছি। নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ শুরু করার আগেই প্রথম কিস্তি বাবদ বরাদ্দের ২৫ শতাংশ টাকার চেক পেয়েছি। এখন দ্বিতীয় কিস্তির বাবদ একটি টাকাও পাইনি। ধারদেনা করে কাজ করতে গিয়ে খুবই সমস্যা হচ্ছে। এতে বাঁধের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত দ্বিতীয় কিস্তির টাকার চেক প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।
একই হাওরের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, ‘কাজের অবস্থা খারাপ, বাঁধে মাটি ফালাইতেছে ইচ্ছামতো আবার দেখি পুরান মাটি দিয়া বাঁধ করের, ইতা বাঁধ ঠিকতো না যদি বানের পানি আয়। আমরার সরকারের কাছে অনুরোধ বাঁধের কাজে নজরদারি বাড়ানি হইতো, যাতে এই কাজটা নিয়ে কেউ হেলাফেলা না করতে পারে।’
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলায় ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। কোনো প্রকার প্রাকৃতিক যা থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। সুনামগঞ্জের হাওরের ধান থেকে দেশের খাদ্যশস্যের একটি অংশ জোগান দেওয়া হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে জানান, বাঁধের কাজ ৮৫ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে। দুই এক দিনের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করি। কোনো বাঁধে অনিয়ম হলে আমরা তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেব। একই সঙ্গে ওই বাঁধ মেরামতে যা যা করণীয় তা আমরা করব পিআইসির মাধ্যমে। যে সকল বাঁধে অনিয়ম হবে প্রয়োজনে আমরা ওই পিআইসির শেষ বিল আটকে দেব।
জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়া দেশ রূপান্তরকে জানান, আমরা বাঁধের কাজ বিশেষভাবে মনিটরিং করছি। কোনো প্রকার অনিয়ম ছাড় দেওয়া হবে না। যে সকল বাঁধে আমরা অনিয়ম বা অভিযোগ পেয়েছি ওই সকল বাঁধের পিআইসি সর্তক করে দেওয়া হয়েছে।
