ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠক ভেস্তে গেল বিতণ্ডায়

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৫, ০৭:২৫ এএম

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশা করেছিলেন, ‘গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি ফলপ্রসূ আলোচনা করেই হয়তো হোয়াইট হাউজ থেকে বের হবেন। আলোচনায় একটি খনিজসম্পদ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ারও কথা ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেনের ভবিষ্যতে বড় ধরনের অংশীদারত্ব দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে খালি হাতেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে যেতে হয়েছে। বৈঠকের একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ালে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায়, পূর্বনির্ধারিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়তে বলা হয় জেলেনস্কিকে। এমনকি যে খনিজসম্পদ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল, সেটিও বাতিল করা হয়। ট্রাম্প পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, যখন তুমি শান্তির জন্য প্রস্তুত হবে, তখন ফিরে এসো।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে সম্পর্কের প্রকাশ্য ভাঙন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সমস্যা বাধার ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ ইতিমধ্যেই ন্যাটোর বাকি সব সদস্য দেশের নেতারা ইউক্রেনের পাশে থাকার কথা বলেছেন।

বিবিসি এক খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবারের বৈঠকে প্রথমে সৌজন্যমূলক কথাবার্তা ও আনুষ্ঠানিকতা চললেও, প্রায় আধা ঘণ্টা পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ হতে পারে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটাই করছেন।’

এ সময় জেলেনস্কি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেন, ‘আপনি কী ধরনের কূটনীতির কথা বলছেন, জেডি? ২০১৯ সালে ব্যর্থ যুদ্ধবিরতির পরও রাশিয়া তার আগ্রাসন চালিয়ে গেছে। কেউ কি তাকে থামিয়েছে?’

জবাবে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি এমন কূটনীতির কথা বলছি, যা আপনার দেশের ধ্বংস থামাতে পারবে।’

এরপর ভ্যান্স অভিযোগ করেন, জেলেনস্কি প্রকাশ্যে মার্কিন গণমাধ্যমের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছেন এবং যথেষ্ট সম্মান দেখাচ্ছেন না।

ভ্যান্সের বক্তব্য ছিল মূলত ট্রাম্পের যুদ্ধ সমাপ্তির নীতির পক্ষে, যেখানে পুতিনের সঙ্গে আলোচনা ও দ্রুত যুদ্ধবিরতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আর এ নিয়েই জেলেনস্কির সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়।

ভ্যান্স যখন ইউক্রেনের সামরিক সংকট ও সেনা মোতায়েন-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন জেলেনস্কি বলেন, ‘যুদ্ধকালীন সময়ে সবাই সমস্যার সম্মুখীন হয়, আপনাদেরও হবে। আপাতত আপনারা নিরাপদ, কারণ আপনাদের সামনে বিশাল সমুদ্র আছে। তবে ভবিষ্যতে আপনারাও এর প্রভাব টের পাবেন।’

জেলেনস্কির এই মন্তব্যে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন এবং আলোচনা, যা এতক্ষণ মূলত ভ্যান্স ও জেলেনস্কির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে তিনি সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। তিনি উচ্চ স্বরে বলেন, ‘আমাদের কী অনুভব করা উচিত, তা বলে দেওয়ার অবস্থানে আপনি নেই।’ তিনি বলেন, ‘আপনার হাতে এখন কার্ড নেই। আপনি লাখো মানুষের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন।’

এই বাগ্বিতণ্ডা জেলেনস্কির জন্য ইতিবাচক হতে পারে, বিশেষ করে যারা চান তিনি ট্রাম্পের সামনে দৃঢ় অবস্থান নিন। তবে এর পরিণতি ইউরোপের যুদ্ধ ও শান্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে।

শুধু তাই নয়, এই উত্তপ্ত মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিভাজিত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিফলন ঘটে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার ভবিষ্যতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে। চুক্তি করতে হলে মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।

প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট উভয়েই জেলেনস্কির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন, বিশেষ করে তার কথাবার্তায় যে ‘আগ্রাসী মনোভাব’ ফুটে উঠেছে, সেটি তাদের বেশি ক্ষুব্ধ করে।

একপর্যায়ে ভ্যান্স সরাসরি বলেন, ‘শুধু ধন্যবাদ জানান।’ কিন্তু জেলেনস্কি নতিস্বীকার করেননি। বরং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুই ক্ষমতাধর নেতার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে চান।

যখন বাগবিতণ্ডা তুঙ্গে ওঠে তখন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ওক্সানা মারকারোভাকে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দৃশ্য যেন প্রতিফলিত করে ইউক্রেনের কূটনৈতিক বাস্তবতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরতার টানাপড়েন।

ট্রাম্পের সামনে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় জেলেনস্কির কূটনৈতিক সাহস প্রশংসনীয় হতে পারে। তবে এর চূড়ান্ত পরিণতি যদি হয় পুতিনের কাছে দুর্বল হয়ে পড়া, তাহলে এই অবস্থানের মূল্য কতটা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

অবশ্য বৈঠকের জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ আমেরিকা, আপনাদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ, এই সফরের জন্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং মার্কিন জনগণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনের ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তি প্রয়োজন আর আমরা তা অর্জনের জন্য কাজ করছি।’

এদিকে ওভাল অফিসে বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের মধ্যে সম্পর্কের প্রকাশ্য ভাঙন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সমস্যা বাধার ইঙ্গিতও বটে।

ইউক্রেন ছাড়াও ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়েও এখন আরও অনেক সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দেবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন সেটি হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি তার একসময়ের পূর্বসূরি হ্যারি ট্রুম্যানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন? ১৯৪৯ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ঘোষণা দেন, ন্যাটো জোটের কোনো দেশের ওপর হামলা যুক্তরাষ্ট্র নিজের ওপর হামলা বলেই মনে করবে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির পুতিনের সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠায় দৃশ্যত ট্রাম্পের যে তীব্র আগ্রহ, তার ভিত্তিতেই এসব উদ্বেগ জন্ম নিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের ওপর ভীষণ চাপ তৈরি করেছেন। আর রাশিয়ার জন্য দিচ্ছেন বড় ধরনের ছাড়ের প্রস্তাব, যা ইউক্রেনবাসীকেই দিতে হবে।

ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বাগবিতণ্ডায় ইউক্রেনের নিরাপত্তার বিষয়টি নগণ্য হয়ে উঠছে। সেই সঙ্গে ইউরোপীয়রাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে হয়ে পড়ছেন উদ্বিগ্ন।

এখন যে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে, তা হলো, একজন পর্যবেক্ষকের ভাষায়, প্রকাশ্য এ ঝগড়া ছিল একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ছিনতাই। এর উদ্দেশ্য, হয় জেলেনস্কিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছেমতো কাজ করতে বাধ্য করা অথবা এমন একটি সংকট তৈরি করা, যাতে পরবর্তী সময়ে যা কিছু ঘটবে, তার জন্য জেলেনস্কিকে দোষারোপ করা যায়।

ট্রাম্প যদি এ ঝগড়ার জেরে ইউক্রেনে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেন, তবু ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো, তারা এ যুদ্ধ কতটা কার্যকরভাবে ও কত দীর্ঘ সময় চালিয়ে যেতে পারবে, সেটিই।

কেননা ন্যাটোর অন্যসব সদস্য দেশের নেতারা জেলেনস্কির পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন, মলদোভার প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু দাঁড়িয়েছেন জেলেনস্কির পক্ষে। অন্যদিকে হাঙ্গেরি ও রাশিয়া দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে।

বৈঠকে উত্তেজনা ও বাগবিতণ্ডায় পণ্ড হওয়ার জন্য জেলেনস্কিকেই দায়ী করেছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেলেনস্কির কঠোর সমালোচনা করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে পোস্ট করা এক বার্তায় রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, বৈঠকে জেলেনস্কি যে পরিমাণ ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছেন তাতে তার গায়ে হাত তোলা থেকে বিরত থেকে সংযমের পরিচয় দিয়েছেন ট্রাম্প।

টেলিগ্রাম পোস্টে এ প্রসঙ্গে জাখারোভা বলেন, ‘আমি মনে করি, জেলেনস্কি এ পর্যন্ত যত মিথ্যে বলেছেন, সেসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিথ্যে ছিল ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর সময় কিয়েভ একা ছিল এবং কেউ তার পাশে ছিল না। যে হাত তাকে খাবার দেয়, সেই হাতেই কামড় দিতে উদ্যত হয়েছিলেন জেলেনস্কি। তার এই ঔদ্ধত্যের পরও ট্রাম্প এবং ভ্যান্স (মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স) তাকে শারীরিকভাবে আঘাত না করে যে সংযমের পরিচয় দিয়েছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর।’

জাখারোভার চেয়ে আরও একধাপ কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমানে দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ফোরাম রাশিয়ান সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ। টেলিগ্রামে পোস্ট করা এক বার্তায় মেদভেদেভ বলেন, ‘এই প্রথম ট্রাম্প ওই কোকেন ক্লাউনের (জেলেনস্কি) মুখের ওপর সত্য কথা বলেছেন; তিনি বলেছেন, কিয়েভ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে খেলছে। এই অকৃতজ্ঞ শূকরটি শূকরের খামারের মালিকদের হাতে রীতিমতো থাপ্পড় খেয়েছে।’

‘তবে এটাই যথেষ্ট নয়। আমাদের অবশ্যই এই নাৎসি মেশিনকে সহায়তা প্রদান বন্ধ করতে হবে।’

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রধান নির্বাহী ইয়েভগেনি প্রিমাকভ এক টেলিগ্রাম পোস্টে বলেছেন, ‘বৈঠকের সবকিছু সবাই দেখেছে। কিয়েভের স্বভাব প্রধান দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সেখানে। আর সেটি হলো উসকানি, ঘৃণ্য উসকানি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত