গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও শীত পেরিয়ে এখন চলছে বসন্তকাল। সব ঋতুতেই আবহাওয়ার পরিবর্তন হলেও কমছে না মশার দাপট। প্রাণঘাতী এডিস মশার মধ্যেই শুরু হয়েছে কিউলিক্স মশার যন্ত্রণা। ঢাকাসহ সারা দেশে মশার উৎপাত চললেও সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় মেয়র এবং কাউন্সিলর না থাকায় মশক নিধন কার্যক্রমে আরও ভাটা পড়েছে।
শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলের মানুষও মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। বিশেষ করে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দারা মশার অত্যাচার থেকে কোনোভাবেই রক্ষা পাচ্ছেন না। ঘরে, বাইরে, রাস্তাঘাটে, অফিস-আদালতে, স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ও গণপরিবহন কোনো জায়গাতেই মশা থেকে নিস্তার নেই। মশারি, কয়েল, ইলেকট্রিক ব্যাটসহ মশা তাড়ানোর নানা সরঞ্জাম দিয়ে পরিত্রাণ মিলছে না। সম্প্রতি মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে মশারি নিয়ে মিছিল করেছেন খুলনার বিক্ষুব্ধ নাগরিকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি মাসে আরও বাড়তে পারে মশার দাপট।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বারিধারা, গুলশান, বনানী, উত্তরা, ধানমন্ডি থেকে শুরু করে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, বনশ্রী, মালিবাগ, মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, মুগদাসহ পুরান ঢাকার সর্বত্রই মশার উৎপাত বেড়েছে। মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। আগে সপ্তাহে একবার মশার ওষুধ ছিটালেও, এখন এক মাসেও তাদের দেখা যায়নি।
নাগরিকদের অভিযোগ, ড্রেন ও নর্দমাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে না। যে কারণে মশার বংশ বিস্তার বৃদ্ধি পাচ্ছে। মশককর্মীদের দেখাও মেলে কালেভদ্রে। মাহফুজা বেগম নামে মোহাম্মদপুর এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘দিনে-রাতে কখনো মশার থেকে পরিত্রাণ নেই। কাকে বলব, কাকে নালিশ করব জানি না। বড়দের যেমন, তেমন ছোট বাচ্চাদের নিয়ে পড়েছি বেকায়দায়। খেলতে গেলেও মশা কামড়ায়, স্কুলে গেলেও কামড়ায়। মশার জন্য মশারি আছে, ব্যাট আছে, কয়েল আছে কিন্তু এগুলো তো আর সব সময় ব্যবহার করতে পারি না।’
বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দুই থেকে তিন মাস আমাদের এখানে মশার ওষুধ ছিটানোর দৃশ্য আমার চোখে পড়েনি। মশার ওষুধ কই ছিটানো হয়, তা সিটি করপোরেশনই ভালো বলতে পারবে।’
এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘অনেক জায়গা থেকে অভিযোগ পাচ্ছি, ঠিকমতো সব এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হয় না। এজন্য ফগিং মেশিনে ট্র্যাকার দেব। মশার ওষুধ ল্যাবে পরীক্ষা করিয়ে মান যাচাই করার উদ্যোগ নিয়েছি। এরপর কর্মকর্তাদের নিয়ে বসে করণীয় ঠিক করব।’ তিনি বলেন, ‘এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মশক নিধনের পরিকল্পনার পাশাপাশি আমরা ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য ডিএনসিসি ডেডিকেটেড ডেঙ্গু হাসপাতাল প্রস্তুত করছি। এখানে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে আমরা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।’
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত লার্ভা ও এডাল্ট মশা ধ্বংস করার কাজ করে যাচ্ছি। সম্প্রতি মশার উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। যেখানে ডিএসসিসির মশককর্মী ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবক এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অংশ নেন।’ তিনি বলেন, ‘মশককর্মীরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, এজন্য আমাদের মনিটরিং সেল রয়েছে। ডিএসসিসি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম মনিটরিং করা হচ্ছে।’
এদিকে মশার কামড়ে প্রতিবছরই মানুষ মারা যাচ্ছে। এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু এখন শুধু মৌসুমি রোগ নয়, সারা বছরেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। এর মধ্যে অনেকেই মারা যাচ্ছে। শুধু গেল ২০২৪ সালে ডেঙ্গু রোগে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৬০০ মানুষ। শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে গেল দুই মাসে এডিস মশাবাহিত রোগে অন্তত ১৫০০ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। ঢাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বরাবরের মতো বেশি থাকলে, এই দুই মাসে বরিশালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল আশঙ্কাজনক।’
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মশা নিয়ন্ত্রণে কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও এর সুফল নগরবাসী পায় না। নতুন নতুন কার্যক্রম হাতে নিলেও তা কদিন না যেতেই তা মুখ থুবড়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে মশা নিধনে প্রায় ১১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে ডিএনসিসি। এর মধ্যে মশা নিধনে কীটনাশক কিনতে রাখা হয় ৬৫ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ফগার, হুইল, স্প্রে মেশিন ও পরিবহন, ব্লিচিং পাউডার ও জীবাণুনাশক এবং মশা নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি কিনতে বরাদ্দ রাখা হয়। এ টাকা দিয়ে ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ডিএসসিসির মশা নিয়ন্ত্রণের বরাদ্দ ৪৪ কোটি টাকা। প্রতিবছর মশা মারছে শত কোটি টাকা খরচ করেও নাগরিকদের মন পাচ্ছে না সংস্থা দুটি। মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ নিয়ে কোনো এলাকার মানুষই সিটি করপোরেশনের ওপর সন্তুষ্ট নয়।
চলতি মাসে আরও বাড়তে পারে : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি মাসের শুরু থেকে ঢাকা মহানগরে কিউলেক্স মশা বাড়ছে। এভাবে আগামী মার্চ পর্যন্ত মশা বাড়বে। সিটি করপোরেশনগুলোর উচিত ডেঙ্গুর মতো কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া।’
