ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের পলাতক কাউন্সিলর আকাশ কুমার ভৌমিক ও তার স্ত্রী পপি রানীর নামে ৫২ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার ৬১২ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে ১৯ কোটি ৬৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৪৫ টাকার অবৈধ সম্পদ থাকার অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। সংস্থাটির উপপরিচালক আহসানুল কবীর পলাশ বাদী হয়ে দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা দুটি করা হয় মামলা দুটি করেন। দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের তথ্যমতে, ২০২২ সালে রাজধানী বেইলি রোডের জারা টাওয়ারে সাড়ে চার হাজার বর্গফুটের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট ক্রয় করেন আকাশ। ফ্ল্যাটটির বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। বেইলি রোডে তার আরও তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এসব ফ্ল্যাটের মূল্য ১০-১২ কোটি টাকা। ফ্ল্যাট ছাড়াও তার ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, মেসার্স তালুকদার অ্যান্ড কোম্পানির মালিক ডিএসসিসি ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকাশ কুমার ভৌমিকের নামে ২৮ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার ৩৯১ টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৩ কোটি ৫১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৫ টাকার সম্পদ অর্জনের গ্রহণযোগ্য উৎস পাওয়া গেলেও অবশিষ্ট ১৪ কোটি ৯৬ লাখ ১৯৬ টাকার সম্পদ অর্জনের বৈধ কোনো উৎস পাওয়া যায়নি। এ পরিমাণ সম্পদ তিনি ঘুষ-দুর্নীতির টাকায় অর্জন করায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
অন্য মামলার এজাহারে বলা হয়, কাউন্সিলর আকাশ কুমার ভৌমিকের স্ত্রী পপি রানীর নামে ২৩ কোটি ৮৩ লাখ ৩৬ হাজার ২২১ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৯ কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫৭২ টাকার সম্পদ অর্জনের বৈধ উৎস পাওয়া গেলেও অবশিষ্ট ৪ কোটি ৬৭ লাখ ৬৮ হাজার ৬৪৯ টাকার সম্পদ অর্জনের বৈধ কোনো উৎস পাওয়া যায়নি। যা তিনি অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করে ভোগ দখলে রাখার অপরাধে মামলাটি দায়ের করা হয়।
দুদকের একজন মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দুদকের অনুসন্ধান শেষে মামলার এজাহারে সম্পদের যে মূল্য উল্লেখ করে সেটি দলিল মূল্য অথবা মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। তবে সম্পদের প্রকৃত মূল্য তার থেকে কয়েকগুণ বেশি। দুদকের তথ্য বলছে, আকাশ কুমার ভৌমিক দম্পতির মূল্য ৫২ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার ৬১২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও প্রকৃত মূল্য আরও কয়েকগুণ বেশি।
জানা গেছে, আকাশ কুমার এক সময় মুদি দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন। সাবেক একজন মন্ত্রী ছত্র ছায়ায় থেকে কয়েক বছরে তিনি শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যান। কীভাবে একজন মুদি দোকানদার এত সম্পদের মালিক হলেন তা খতিয়ে দেখতে অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। অভিযোগে বলা হয়, আকাশ কুমার ভৌমিকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ, বদলি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও নিম্নমানের মালামাল সরবরাহের নামে করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকানা অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী কম্বল সরবরাহসহ অন্যান্য মালামাল সরবরাহ না করা ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের নিম্নমানের কাজ করে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ আছে।
দুদকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আকাশ কুমার ভৌমিকের অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের উপপরিচালক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) মোশাররফ হোসেন মৃধাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের কোথায় কী সম্পদ রয়েছে তার তথ্য জানতে চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠান। তিনি ২০২২ সালে পিআরএল-এ চলে যাওয়ার আগে অভিযোগটি পরিসমাপ্তি করার চেষ্টা করেন। তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এটি করতে চেয়েছিলেন। বিষয়টি দুদকের নজরে আসার পর তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপপরিচালক আহসানুল কবির পলাশকে। তিনি অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ করে দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আকাশ ভৌমিক ও তার স্ত্রী পপি রানীর নামে ৫২ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার ৬১২ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পেয়েছে।
দুদকের তথ্যমতে, একজন সাবেক মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে সখ্যতা ছিল আকাশ কুমার ভৌমিকের। ২০১৪ সালে ওই মন্ত্রী দায়িত্ব পাওয়ার পরই আকাশ কুমারের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। তিনি কৌশলে মন্ত্রীর আস্থাভাজন হয়ে মুদি দোকানদার থেকে বনে যান মন্ত্রাণালয়ের প্রভাবশালী ঠিকাদার। অনেকে তাকে মন্ত্রীর স্টাফ হিসেবেও জানতেন। তিনি মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে মন্ত্রণালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি। তিনি টিআর, কাবিখা, ব্রিজ, কালভার্ট, সাইক্লোন সেন্টার ও ফ্লাড সেন্টার অনুমোদন করিয়ে বা বরাদ্দ দিতে মোটা অঙ্কের টাকা কমিশন নিতেন। এসব কাজ করতে তিনি কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র করে তোলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আকাশ কুমার টিআর-কাবিখার প্রতিটন বরাদ্দ দিতে ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা কমিশন নিতেন। আবার প্রকাশ্যে টিআর, কাবিখার বিশেষ বরাদ্দ বেচাকেনা করতেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ব্রিজ, কালভার্ট, সাইক্লোন সেন্টার, ফ্লাড সেন্টার বরাদ্দ নিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কমিশন নিতেন আকাশ কুমার। এর মধ্যে ব্রিজ বরাদ্দে ২ থেকে ৫ লাখ, কালভার্ট বরাদ্দে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ, সাইক্লোন সেন্টার বরাদ্দে ১০ থেকে ১৫ লাখ নিতেন। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা বদলি নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। বদলির ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ নিতেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আকাশ কুমার বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কমিশন গ্রহণ করতে করতে একপর্যায়ে অন্যের লাইসেন্স দিয়ে ঠিকাদারি কাজ শুরু করেন। পরে অবশ্য নিজেই ঠিকাদারি লাইসেন্স করে ব্যবসা করতে থাকেন। তার রাজধানীর বিজয়নগরে মাহতাব সেন্টারের সাততলা ও নয়তলায় তালুকদার অ্যান্ড কোং এবং প্রভাতি অ্যান্ড কোং নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান তিন বছরে মতলব উত্তর উত্তর উপজেলায় ৪৮টি ব্রিজের কাজ করেছে। তিনি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
তথ্য বলছে, আকাশ কুমার ভৌমিক বেইলি রোডের ১৩৩ নম্বর হোল্ডিংয়ের জারা টাওয়ারে প্রায় সাড়ে চার হাজার বর্গফুটের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট কিনেছেন। ভবনটিতে প্রতি স্কয়ার ফ্ল্যাট প্রায় ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সেই হিসেবে ফ্ল্যাটটির দাম প্রায় পাঁচ কোটি টাকার বেশি। একই এলাকার নাভানা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির তৈরি নাভানা বেইলি স্টার শপিং কমপ্লেক্স ভবনে তার আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য প্রায় চার কোটি টাকা। বেইলি রোডের ১৮ নম্বর বেইলি নেষ্ট ভবনের দ্বিতীয়তলার পুরো ফ্লোর নিয়ে তার একটি বিলাশবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। সবমিলিয়ে বেইলি রোডে তার যে চারটি ফ্ল্যাট রয়েছে যার মূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। রাজধানীর বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারে তার কয়েক হাজার বর্গফুট আয়তনের দুটি ফ্লোর রয়েছে। একটি ফ্লোরে সুং গার্ডেন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট চলছে। এ ছাড়া মৌচাক মার্কেটে ঋত্তিকা জুয়েলার্স, গ্রামের বাড়িতে একটি বাড়ি, দোতলা মন্দির এবং প্রায় ১০০ বিঘা জমি রয়েছে। এর বাইরে তার নিজের, স্ত্রী, সন্তানের নামে মোটা অঙ্কের ব্যাংক-ব্যালেন্স, সঞ্জয়পত্র, শেয়ার রয়েছে।
সাবেক এমপি আক্তারুজ্জামানের নামে মামলা : দুদকের অনুসন্ধানে খুলনা-৬ আসনের সাবেক এমপি মো. আক্তারুজ্জামানের নামে ১৩ কোটি ৯৬ লাখ ১৬ হাজার ১৪১ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১০ কোটি ৪৮ লাখ ৩৯ হাজার ১৬৭ টাকার সম্পদ অর্জনের বৈধ উৎস পাওয়া যায়। অবশিষ্ট ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৭৬ হাজার ৯৭৪ টাকার সম্পদ অর্জনের বৈধ কোনো উৎস পাওয়া যায়নি। এসব সম্পদ অবৈধ উপায়ে অর্জন করে নিজ ভোগ দখলে রাখার অপরাধে মামলাটি দায়ের করা হয়। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
