দেশি গরু ছাগলকে ‘বিদেশি ও বংশীয়’ বলে প্রচার চালিয়ে কোরবানি পশুর বাজার থেকে ১২১ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছে সাদিক অ্যাগ্রো। এমন দাবি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এছাড়াও সাদিক অ্যাগ্রোর মালিক ইমরান হোসেন মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ১৩৩ কোটি টাকা অর্জন করেছেন যার মধ্যে ৮৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করেছেন।
মঙ্গলবার রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. একরামুল হাবীব এসব তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘গত সোমবার ইমরানকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় ইমরান ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার তৌহিদুল আলম জেনিথসহ এই চক্রের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। তারা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ১৩৩ কোটি ৫৫ লাখ ৬ হাজার ৩৪৪ টাকার অর্থ অর্জন করেছে বলে প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধানে জানা গেছে। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অনুমোদনহীন ব্রাহমা জাতের গরু আমদানি ও সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে বিদেশে প্রায় ৮৬ লাখ টাকা পাচার করেছে। মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় ইমরান ছাড়াও, তার ব্যবসায়িক সহযোগী তৌহিদুল আলম জেনিথ, সাদিক আগ্রো কোম্পানি এবং অজ্ঞাত ৬-৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।’
ইমরান ও তার সহযোগীরা কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে গরু ও মহিষ বাংলাদেশে নিয়ে এসে তা বিক্রি করত। এমনটা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়াও ভুটান ও নেপাল থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে ছোট আকৃতির ভুট্টি গরু বাংলাদেশে এনে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ইমরান প্রতারণার মাধ্যমে দেশীয় গরু-ছাগলকে বিদেশি ও বংশীয় বলে প্রচার করে উচ্চমূল্যে কোরবানির পশুর হাটে বিক্রি করে প্রায় ১২১ কোটি ৩২ লাখ ১৫ হাজার ১৪৪ টাকা আয় করে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করেছেন। অবৈধভাবে অর্জিত মোট ১১ কোটি ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ২০০ টাকা ইমরান ও তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ মেটাল লিমিটেডের নামে এফডিআর খুলে বিনিয়োগ করে লন্ডারকৃত সম্পদে রূপন্তর করেছেন। এছাড়া মোহাম্মদপুরের এলাকায় সরকারি খাল ভরাট ও দখল করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন।’
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিদেশ থেকে আনা ব্রাহমা জাতের ১৫টি গরু ঢাকা কাস্টমস আটক করেছিল। পরে সেগুলো সাভারে কৃত্রিম গরু প্রজনন কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রজনন কেন্দ্র থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো, এ গরুগুলো জবাই করে তিনি ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু এগুলো জবাই না করেই ইমরান জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজ তৈরি করেছেন জবাই করেছেন। এরপর সেগুলো প্রায় ১১ কোটি টাকা মূল্যে বিক্রি করেছেন।’
ইমরানের সঙ্গে কোনো সরকারি কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী কোন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ থাকলে সেটি দুদক তদন্ত করবে। এ মূহুর্তে তদন্তের স্বার্থে সবগুলো বিষয় প্রকাশ করা সমীচীন হবে না।’
থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ ইমরানের পাচার করা টাকা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইমরানের সহযোগী জেনিথ এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। আমরা অভিযান চালাচ্ছি। আমরা আরও ৫-৭ জনের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছি। তাদেরকে গ্রেপ্তারে সুস্পষ্ট তথ্য প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’
এদিকে ইমরান হোসেনকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের উপ-পরিদর্শক মো. ছায়েদুর রহমান তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। এ সময় আসামি পক্ষে আইনজীবী আল মামুন রাসেল জামিন চেয়ে আবেদন করেন। কারাগারে আটক রাখার জোর দাবি জানান ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এম এ আজহারুল ইসলাম আসামি ইমরানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
এর আগে বেলা ১টা ২৩ মিনিটে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তাকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়েছে। পরে বিকেল ৩টার দিকে তাকে আদালতের এজলাসে তোলা হয়।
