২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে দুটো চরিত্র বিদ্যমান। এই গণঅভ্যুত্থান সফলে নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন একটি অংশ। যদি ব্যর্থ হতো, তবে ভিলেন হিসেবে সাব্যস্ত হতো আরেকটি অংশ। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে এক দফার মাধ্যমে। সেই এক দফার প্রভাবিতকারী কারা? জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীরা চরম প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিজেদের জেনারেলাইজেশন তথা সাধারণীকরণ করেন সেই ৭ জুন আবিষ্কৃত ‘কোটা পর্যালোচনার গ্রুপ’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। এই টিম সদস্যরা ৭ জুন থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত তাদের পরিকল্পিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ১৪ জুলাই হাসিনা কর্র্তৃক শিক্ষার্থীদের প্রতি রাজাকার ট্যাগ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা। তারপরই শ্লেষাত্মক স্লোগান ওঠে ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার’। এরপরই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ‘কোটা পর্যালোচনা গ্রুপ’ থেকে সংযুক্তি সেøাগানটুকু লেখা হয়, ‘কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। নিমিষেই রাজু ভাস্কর্য থেকে হাসিনাকে গোটা বাংলাদেশে স্বৈরাচার শব্দে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তবে জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এই সংযুক্তিটুকু লেখেন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী রিজভী আলম এবং রাজু ভাস্কর্য থেকে এই সংযুক্তির উত্তোলন করেন সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও কবি জসিম উদ্দীন হল ছাত্রদলের সিফাত ইবনে আমিন। পরবর্তীকালে সিফাতের আজিমপুরস্থ ইরাকি মাঠের বাসা তছনছ করা হয় এবং এলাকার বাড়িতে আওয়ামী লীগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হানা দেয়। হাসিনাকে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠায় প্রভাবকের ভূমিকায় ছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই।
১৫ জুলাই ৭১ হল থেকে হামলার সূচনা হলে ৭১ হল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই সর্বপ্রথম পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা বিভিন্ন মিডিয়াতে স্পষ্ট দেখা যায় এবং ছাত্রলীগ ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতিও গ্রহণ করে। ১৫ তারিখ হামলার পর ১৬ তারিখ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আন্দোলনে অংশগ্রহণে প্রকাশ্য ঘোষণা এবং ১৫ তারিখ সন্ধ্যায় শহীদ মিনারে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অবস্থানের ছবি ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের ওয়াসিম আকরাম তার ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করেন ‘আমার ভাইরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে, এই পরিচয় আমি শহীদ হব’। ঠিক এর ১৬ ঘণ্টা পর ওয়াসিম আকরাম পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র হামলায় শাহাদাতবরণ করেন। ১৬ জুলাই সারা দেশে ছয়জন শাহাদাতবরণ করলে সেদিনই একে একে ছাত্রদল ও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সব রাজনৈতিক শক্তি এই আন্দোলনে প্রকাশ্য অংশগ্রহণের ঘোষণা করেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক দফায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান করেন এবং তিনি ঘোষণা করেন দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায়, মানুষের রক্ষায় হোক এই মুহূর্তের সেøাগান, দফা এক দাবি এক, খুনি হাসিনার পদত্যাগ। ১৭ তারিখ গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি পালনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাংলোর সামনে অসম সাহসী স্লোগান উচ্চারিত হয় ‘মোদির সন্তানরা সীমান্তে ফিরে যা/ সীমান্তের বিলাইয়েরা সীমান্তে ফিরে যা’। যে স্লোগান দিয়েছিলেন স্যার এএফ রহমান হল ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল হাসানসহ উপস্থিত ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। ১৮ তারিখ সকাল শুরু হয় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রদল কর্মী ইরফান ভূঁইয়ার শহীদ হওয়ার সংবাদ দিয়ে। ১৮ তারিখ দুপুরে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ইম্পেরিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী শহীদ জিল্লুরের লাশকে নিয়ে রক্তস্নাত রাজপথে এক দফার সেøাগান তোলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। ১৮ তারিখ সন্ধ্যার পর সমন্বয়কদের দ্বারা জাতি কিছুটা বিভ্রান্ত হলেও এটা অঘোষিত এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৮ তারিখ তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছিলেন তার প্রধান কথা ছিল, ‘দফা এক দাবি এক, খুনি হাসিনার পদত্যাগ’/‘ফয়সালা নয় আদালতে, ফয়সালা হবে রাজপথে’।
১৯ জুলাই থেকে এক দফার আন্দোলনই চলমান থাকে। প্রত্যেকটা স্পটে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের রণ প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ২১ জুলাই থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কিছুটা কমতে থাকে। সে সময়টাতে হাসিনাবিরোধী শক্তিকে মাঠ কামড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এরই মধ্যে কয়েকজন সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে যায় আবার ফেরত দেয়। আবার গ্রেপ্তার করে আবার মুক্তি দেয়। এর মধ্যে দেশের মানুষ এক দফার আন্দোলন চলমান রাখে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা আন্দোলনকে আবারও পুনরুজ্জীবিত করা হয়। অতঃপর ৩ আগস্ট গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এক দফার ঘোষণা আসে ছাত্রদের প্ল্যাটফর্ম থেকে, যে ঘোষণা তারেক রহমান করেছিলেন ১৬ জুলাই। এরপর অনেক ঘটনা এবং হাসিনার পলায়ন।
৭ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনকে এক দফায় প্রভাবিত ও ত্বরান্বিত করতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভূমিকা ছিল সর্বাগ্রে। ৬ জুলাই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন, ১১ জুলাই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সমর্থন, ১৬ জুলাই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অংশগ্রহণের ঘোষণা, ১৬ জুলাই যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সব রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আন্দোলনের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন, ১৬ তারিখ তারেক রহমানের এক দফায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান এবং সবশেষে চূড়ান্ত এক দফা ছিল তারেক রহমানেরই ঘোষণা। অতএব এ আন্দোলন যদি ব্যর্থ হতো, সাধারণের কাতারে অনেকে বেঁচে থাকলেও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নিশ্চিতভাবেই নিশ্চিহ্ন করা হতো। হাসিনার চোখের খলনায়করাই হওয়ার কথা সত্যিকারের নায়ক।
লেখক : যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী
ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
