সরকারি কাজে শতভাগ পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহার করার নির্দেশনা থাকলেও ২০ শতাংশের কম ব্যবহার হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি। সংগঠনটি বলছে, চলতি বছরের মধ্যে সব উন্নয়ন ও সংস্কার কাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে পোড়া ইটের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবানেরও কোনো উদ্যোগ নেই। উল্টো পরিবেশবান্ধব ব্লকের ভ্যাট ইটের তুলনায় ২৩ গুণ বেশি। সার্বিক দিক বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব ব্লকে আগামী ৫ বছরের জন্যে সম্পূর্ণভাবে কর ও ভ্যাটমুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমিতির সভাপতি মো. শাখাওয়াত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. মুস্তাফিজুর রহমান, সহ-সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ও মনির চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব প্রমুখ।
বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সভাপতি মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকার দেশের কোটি মানুষের খাদ্য সংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইটপ্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ), ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯) এর ধারা ৫ (৩ক) এর ক্ষমতাবলে ইট উৎপাদনে মাটির ব্যবহার কমানোর উদ্দেশ্যে সব ধরনের সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে পরিবেশবান্ধব ব্লক (পোড়ানো মাটির ইটের বিকল্প) ব্যবহারের প্রজ্ঞাপন জারি করে। সরকারের ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০০ ভাগ ব্লক ব্যবহার করার নির্দেশনা রয়েছে। অর্থাৎ চলতি ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের সরকারি উন্নয়ন ও সংস্কারকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে পোড়া ইটের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, শতভাগ দূরের কথা এখন পর্যন্ত ২০ শতাংশ ব্লক ব্যবহারও কার্যকর হয়নি। সরকারের অধিকাংশ প্রকৌশল সংস্থা এখনো নির্মাণকাজে ইট ব্যবহার করছে। যথাযথ উদ্যোগের অভাব, সংশ্লিষ্টদের অবহেলা এবং বিভিন্ন জটিলতায় তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ ছাড়া সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বলা আছে, ২০২৫ সালের পর সরকারি কোনো কাজে আর মাটির পোড়ানো ইট ব্যবহার করা হবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি এ দেশের অর্থনীতির বৃহত্তম উৎপাদনকারী খাতগুলোর মধ্যে একটি, যা জিডিপির ১৩.৩১ শতাংশ নিয়ে গঠিত এবং মোট শ্রমশক্তি ৪৩ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত। দেশের প্রায় ১০ হাজার বৈধ ও অবৈধ ইটের ভাটা বছরে ৩৫০০ কোটি সিএফটি মাটি ধ্বংস করে ইট প্রস্তুত করছে। এতে দেশের কৃষিজমি হুমকির সম্মুখীন, এছাড়া কয়লা পোড়ানোয় ইটের ভাটার চারদিকে জমির সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, চাষের জমির উপরিভাগের মাটি ইট ভাটায় ব্যবহার করায় হেক্টরপ্রতি প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ টাকার ফসল ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাহলে বাংলাদেশের ৮ দশমিক ১ লাখ হেক্টরে ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৩১৩ কোটি টাকার ফসল কমে যাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া ও বায়ুদূষণের ফলে আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, মাটি পোড়ানো ইট এবং পরিবেশবান্ধব ব্লকের মধ্যে অসম ভ্যাট ব্যবস্থা বিদ্যমান। সারা বিশ্বেই জনস্বার্থে পরিবেশবান্ধব পণ্যগুলোতে সরকারের কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু ইটের মতো ব্লকের কোনো সঠিক ভ্যাটনীতি না থাকায় বর্তমানে ইটের বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্লকের ভ্যাট অব্যাহতিতে শুধু মাত্র ছিদ্রযুক্ত ব্লকে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আপনারা জেনে অবাক হবেন যে, পোড়া মাটির বিকল্প পরিবেশবান্ধব ব্লকের ভ্যাট ইটের তুলনায় প্রায় ২৩ গুণ বেশি। যেখানে একটি পোড়া মাটির ইটের মাত্র ভ্যাট দশমিক শূন্য ৮ টাকা, সেখানে পরিবেশবান্ধব ব্লকের ভ্যাট ১ দশমিক ৮০ টাকা। এই ভ্যাট সংক্রান্ত অসামঞ্জস্যতার কারণে কোনো ইটভাটার মালিক এখন পর্যন্ত ব্লক ফ্যাক্টরি স্থাপনে উৎসাহী হচ্ছেন না। আমরা যারা উদ্যোক্তা তারাও ভ্যাট জটিলতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অনেক ইটভাটার মালিক আমাদের জানিয়েছেন যে, ভ্যাট সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তারা এই সেক্টরে আসতে আগ্রহী নন।
বক্তারা বলেন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইটের বিপরীতে পরিবেশবান্ধব ব্লক কারখানা এখন পর্যন্ত কোনো ভর্তুকি বা আর্থিক প্রণোদনা পাচ্ছে না। কংক্রিট ব্লক কারখানার উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেশিনের অংশ প্যালেট আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা আছে। এতে বিনিয়োগ খরচ অনেক বেড়ে যায়। অথচ এই পণ্যে শুল্ক আরোপের যৌক্তিক কারণ নেই। যেখানে পরিবেশবান্ধব সেক্টর হিসেবে প্রণোদনা পাওয়া প্রাপ্য, সেখানে ব্লক ফ্যাক্টরি মালিকরা পাচ্ছেন হয়রানি আর অতিরিক্ত ভ্যাট ও করের বোঝা। আমরা এ সম্ভাবনাময় খাতকে আগামী ৫ বছরের জন্য সম্পূর্ণভাবে কর ও ভ্যাটমুক্ত ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। আমরা মনে করি যথাযথ কর ছাড় এই শিল্পের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে।
