সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আগের দিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল রবিবারও উত্তাল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস। এদিন ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন ঢাবির বিভিন্ন বিভাগসহ রাজধানীর অন্য আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এসব বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ঢাবি শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবমিলিয়ে ৩৬টি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদচ্যুতির দাবি জানানো হয়।
ঢাবি ক্যাম্পাসে গতকাল সকাল থেকেই দিনভর একের পর এক মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ চলতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য, অপরাজেয় বাংলা, বটতলা, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ও কার্জন হল এলাকায় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।
এর আগে, শনিবার মধ্যরাতে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাবি ক্যাম্পাস। ওইদিন রাত ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে যোগ দেন। তারা রাত আড়াইটা পর্যন্ত রাজু ভাস্কর্যের সামনের রাস্তায় বসে অবস্থান নেন এবং ধর্ষকদের শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। সেখানে ঢাবির কয়েক হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। পরে রাত ২টার দিকে ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিতে ‘ধর্ষণবিরোধী মঞ্চ’-এর আত্মপ্রকাশ হয়। ধর্ষণবিরোধী মঞ্চ তাৎক্ষণিকভাবে দুটি দাবি জানায়। সেগুলো হলো ধর্ষণবিরোধী দ্রুত ট্রাইবুনাল গঠন এবং ধর্ষকদের প্রকাশ্যে সর্বোচ্চ শাস্তির। পরে মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার আট বছর বয়সী শিশুটিকে ধর্ষণে জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে তোলার আলটিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতেও বিভিন্ন স্লোগান দেন।
ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ঢাবির যে ৩৬টি বিভাগের আংশিক অথবা পূর্ণাঙ্গ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে লোক প্রশাসন, রসায়ন, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান, পদার্থ, ভূতত্ব, ইংরেজি, ভাষাবিজ্ঞান, বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, তথ্য গ্রন্থাগার ও ব্যবস্থাপনা, পালি অ্যান্ড বুদ্দিস্ট স্টাডিজ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মার্কেটিং, মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স, টেলিভিশন, চলচিত্র ও ফটোগ্রাফি, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, মুদ্রণ ও প্রকাশনা, সংগীত, ম্যানেজমেন্ট, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, স্বাস্থ্য অর্থনীতি, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, উদ্ভিদবিজ্ঞান, দর্শন, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন, গণিত এবং পরিসংখ্যান বিভাগ।
বিক্ষোভ সমাবেশগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। এ ছাড়া দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পদত্যাগের দাবি জানান। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেটওয়ার্কের সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ নয় বরং পদচ্যুতির দাবি জানান ঢাবির ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব।
বিক্ষোভ সমাবেশে বাংলা বিভাগের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার তামান্না বলেন, ‘আমি জন্মের পরে এখন পর্যন্ত কোনো ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখিনি। যার ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন ধর্ষকের জন্ম হচ্ছে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘বিভিন্ন দীর্ঘসূত্রতার মাধ্যমে ধর্ষকদের যথাযথ বিচার হতে আমরা খুব একটা দেখি না। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্ষকদের পার পাইয়ে দেওয়ার মতো বিভিন্ন ঘটনাও আমরা অতীতে দেখেছি।’
বিক্ষোভ সমাবেশে ঢামেকের অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘যারা ধর্ষণ করে এবং যারা এদের মদদ দেয় তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’
লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা লাসনা কবির বলেন, ‘আমরা যদি ধর্ষকদের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে ধর্ষকরা ভয় পেয়ে আর অপরাধ করবে না।’
সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে সহিংসতা হতে পারে, কিন্তু নারীদের প্রতি যে সহিংসতা চলছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নারীদের প্রতি এ সহিংসতা প্রতিরোধ না করতে পারলে দেশে গণতন্ত্রের সফলতা আসবে না।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নারীদের প্রতি চলমান নিপীড়ন ও ধর্ষণের প্রতিবাদ করা সবার কর্তব্য।’
ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের সামনে গতকাল রাতেও মশাল মিছিল করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। এর আগে তারা রাজু ভাস্কর্যের সামনে এক ঘণ্টা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হতে থাকেন। সেখানে তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, হ্যাং দ্য রেপিস্ট’ এমন নানা স্লোগান দেন। মশাল মিছিলটি রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে ভিসি চত্বর হয়ে রাত পৌনে ৯টায়ও ঢাবির প্রশাসনিক ভবনের সামনে ছিল।
বিভাগগুলোর ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণায় শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়বে কি না, জানতে চাইলে ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেশনজটের শঙ্কায় পড়েন তাহলে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করি। যেমন অল্প সময়ে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া, অনলাইন ক্লাস, ছুটির দিনেও ক্লাস এবং সেমিস্টার গ্যাপ কমানো। এই পরিস্থিতিতে যদি শিক্ষার্থীরা সেশনজটের শঙ্কায় পড়েন আমরা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের সেশনজট নিরসনের চেষ্টা করব।’
