মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে ক্রিকেটে!

বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৫, ১১:২১ এএম

এক দেশে শুরু, অন্য দেশে সমাপ্তি, এবং যেখানে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তার থেকেও ২,০০০ কিলোমিটার দূরে। দুবাইয়ের মরুর বুকে রবিবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির এবারের আসরের শিরোপা হাতে তুলল ভারত। নিউজিল্যান্ডকে ছয় উইকেটে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয় তারা। এই জয় শুধুমাত্র আরেকটি ট্রফি নয়, বরং প্রমাণ করে, সাদা বলের ক্রিকেটে ভারতই একচ্ছত্র শাসক। 

তবে এই চ্যাম্পিয়নশিপের নির্লিপ্ত অনিবার্যতা যেন বিশ্ব ক্রিকেটের কর্ণধারদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে আসে। শুরু থেকেই যেন পরিষ্কার ছিল— এই ট্রফির ঠিকানা কোথায় হবে। ম্যাচগুলো হয়ে উঠেছিল প্রদর্শনীর মতো, যেখানে বিশ্বের তারকারা এক সুদৃশ্য নীল জার্সিতে মঞ্চে নেমেছিলেন, আর হাজারো দর্শক গলা ফাটিয়েছেন সেই নামগুলোকে পিঠে নিয়ে। 

পাকিস্তানে কি এমন সম্ভাবনা ছিল? লাহোরে কি ‘কুং-ফু পান্ড্যা!’ ধ্বনি ওঠার সুযোগ পেত? আমরা হয়তো কখনোই তা জানতে পারব না। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের দোহাই দিয়ে ভারত পাকিস্তানে পা রাখবে না— এ ঘোষণা এসেছিল মাস কয়েক আগেই। আইসিসির সামনে তখন কঠিন প্রশ্ন, উত্তর যেন অনিবার্য। 

ভারতকে ছাড়া আয়োজন? অসম্ভব! বিশ্ব ক্রিকেটের আয়ের প্রায় ৮০% আসে ভারতীয় বাজার থেকে। পাকিস্তানকে আবারও স্বাগতিক হওয়ার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করা? সেটাও ন্যায়সংগত নয়। ফলাফল— ভারত ছিল এক শহরে, এক হোটেলে, নির্দিষ্ট রুটে। আর প্রতিপক্ষ? হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ক্লান্ত দেহ আর অভ্যস্তহীন কন্ডিশনে খেলে গেল। 

নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা এক ম্যাচ থেকে আরেক ম্যাচে উড়ে বেড়ালেন সাত হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ। আর ভারতের খেলোয়াড়েরা? বিমানের ধারে-কাছেও যাননি, কেবল কুলদীপ যাদবের উইকেট উদযাপনের ছড়ানো বাহু যেন বিমানের ডানা হয়ে উঠেছিল! কেউ কেউ প্রতিবাদ করলেন, কেউ করলেন না। ভারতীয় ক্রিকেটাররা একরকম নির্বিকার। কোচ গৌতম গম্ভীরের ভাষায়, ‘যারা এসব বলে, তারা যেন বড় হয়।’ কিন্তু মুহাম্মদ শামি ঠিকই স্বীকার করলেন, সুবিধাটা ছিল। 

ক্রিকেটে যেন একটা মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কেউ উচ্চবাচ্য করে না। সবাই কেবল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে— ‘এটাই তো পথ, এভাবেই চলবে।’ 

২০২৩ সালে ভারতীয় স্পিনারদের সুবিধার্থে শেষ মুহূর্তে সেমিফাইনালের পিচ বদলানো হয়েছিল। আট মাস আগে গায়ানায় ভারত-ইংল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি সেমিফাইনাল ঠিক হয়েছিল ভারতীয় টিভির সুবিধার কথা মাথায় রেখে। স্থানীয় দর্শকদের কথা ভাবা হয়নি। 

এটা কি বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ? এভাবে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কি ধীরে ধীরে আকর্ষণ হারাবে? 

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড— কারও পক্ষেই কোনো সাংবাদিক পাঠানো সম্ভব হয়নি। কি দুর্দশা! এমন এক প্রতিযোগিতা যা ক্রিকেট বিশ্বকে নড়েচড়ে বসানোর কথা, সেটাই যেন নিস্তব্ধ এক স্রোত হয়ে গিয়েছে। 

শিডিউল চূড়ান্ত হয় মাত্র ৫৭ দিন আগে। কোথাও বিশৃঙ্খলা, কোথাও নির্বিকারতা। এসব প্রশ্ন কি ক্রিকেট প্রশাসকদের ভাবায়? নাকি সবাই কেবল ভেসে চলছেন নিয়তির ঢেউয়ে? 

এখানেই কি শেষ? না, এখনও আশার আলো টিকে আছে। মাঠের ক্রিকেট এখনও তার শৈল্পিক সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। জশ ইংলিসের শতরান, রাচিন রাভিন্দ্রের আগ্রাসন, আজমতউল্লাহ ওমরজাইয়ের উদ্ভাস— সবই প্রমাণ করে ক্রিকেট এখনও জীবন্ত। 

কিন্তু ক্রিকেটকে শেষ করবে যদি কিছু, তবে তা ব্যাট-বলের লড়াই নয়, দর্শকদের উদাসীনতা। শিরোপা উঠছে, ট্রফি পাল্টাচ্ছে, কিন্তু যদি ধীরে ধীরে ক্রিকেটই দর্শকদের হৃদয় থেকে মুছে যেতে থাকে? তাহলে কে থাকবে, কে হারবে— তার আর অর্থ কী?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত