চোরের সর্দারকে গ্রেপ্তার করায় কক্সবাজারে ওসির বাড়ির সব গরু চুরি করে নিয়ে গেছে সর্দারের শিষ্যরা। আয়োজকরা আড়ালে থেকে মজা দেখেছে। বাগেরহাটের পঙ্গু গণপরিষদ সদস্য, এমপি অধ্যাপক মীর সাখাওয়াত আলী দারুর খানা-পায়খানা সব বিছানায়। বৃদ্ধ প্যারালাইজড দারুর স্ত্রী সংরক্ষিত আসনের বৃদ্ধা ফরিদারও একই দশা। তাদের দেখাশোনা, ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, ওষুধপথ্য চালায় মেয়ে জেনিয়া। চাকরি করে একটি বেসরকারি ব্যাংকে। তাকে মহাদুর্ধর্ষ ও ফ্যাসিস্টের সহযোগী নাম দিয়ে গভীর রাতে ঢাকার বাসা থেকে ডিবি পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বাগেরহাট জেল হেফাজতে। মিরপুরের বাসা থেকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় জেনিয়া পুলিশের পায়ে ধরে বলেছে, আমার মা-বাবার কেউ নেই। আমি না থাকলে তারা মারা যাবে। ব্রেন স্ট্রোক করা অসুস্থ মেয়েটিকে জানে বাঁচিয়ে ফিরে পেতে বৃদ্ধ মা ধরনা দিচ্ছেন স্থানীয় সমন্বয়কের কাছে। জীবনভর স্থানীয় গরিব-দুঃখীদের দান-অনুদান ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সেবা দেওয়া পরিবারটিকে এ পেরেশানিতে ফেলতে পেরে বগল বাচ্ছাচ্ছে ধরিবাজরা। টাঙ্গাইলের সাবেক এমপি, আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে জনাবিশেক পাগল। সমানে চালিয়েছে লুটপাট। ছাত্র প্রতিনিধি পরিচয়ের এ কর্মের আয়োজক মুকাদ্দাসের ইচ্ছা, বাড়িটিকে পাগলের আশ্রম বানাবে। এমন আচানক এক স্বাধীনতায় পড়ে গেছে মানুষরূপী কিছু প্রাণী। যেখানে যা দিয়ে পারছে কায়েম করে দিচ্ছে এ স্বাধীনতা। যা ইচ্ছা করছে। কাউকে ফাঁসাচ্ছে। কাউকে ভাসাচ্ছে। দেখিয়ে দিচ্ছে হিম্মত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নাম পড়ছে সমন্বয়কদের। অথবা বলে দেওয়া হচ্ছে ছাত্র-জনতার কথা। রংপুরে এক বালু ব্যবসায়ীর কাছে ১ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ার অডিও ফাঁস হওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগর সমন্বয়ক ও মুখপাত্রকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। অডিওতে তার যে কথোপকথন শোনা গেছে, মাথা না ঘুরে পারে না। কারণ দর্শানোর নোটিসের ফল কী হবে, কে জানে।
চব্বিশের ছাত্র-গণআন্দোলনের প্রকৃত লড়াকুদের এখন নিজের মাথা নিজে ফাটানোর জোগাড়। এই তরুণদের পাশ কাটানোর জায়গাটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। এরই মধ্যে কিন্তু মুখ খোলা শুরু হয়েছে। আলোচিত টকশো তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক জিল্লুর রহমান অভিযোগ করেছেন প্রথম রোজার দিনে এক সমন্বয়ক তার এক পরিচিত হাসপাতালে ফোন করে একজন রোগীর চিকিৎসার বিল সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিতে বলেছেন। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ সমন্বয়কের ফোন পাওয়ার আগে আংশিক মওকুফ করেছেন এটা তাকে জানানোর পরও তিনি বলেছেন ৫ আগস্টের পর আমার সঙ্গে এভাবে কেউ কথা বলে না। সম্পূর্ণ মওকুফ না করলে হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। বলার কোনো অপেক্ষা রাখছে না, নমুনা কিন্তু বড় খারাপ। এই খারাপ নমুনা বুঝতে পেরে পুলিশও গা বাঁচাচ্ছে। না পারতে পদক্ষেপে যাচ্ছে না। সেদিন রাজধানীর কলাবাগানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কলাবাগান থানার আহ্বায়ক সালাউদ্দিন সালমানসহ বিভিন্ন পদের ১৪ জনকে আটক করতে গিয়ে আগপিছ অনেক ভাবতে হয়েছে পুলিশকে। ছাত্র-জনতা পরিচয়ে তারা রাজধানীর রাসেল স্কোয়ারে শেখ কবির হোসেনের ব্যবসায়িক অফিসে হামলা ভাঙচুর ও লুটপাট করে। কিছু টাকা-পয়সা ও চারটি কম্পিউটার নিয়ে যায়। লুটপাটকারীরা নাও জানতে পারে শেখ কবির কে? তিনি কার কী হন? কিন্তু, পুলিশ জানে। আবার লুটপাটকারীদেরও চেনে। তাই পুলিশ সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে না পৌঁছা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। সেনা সদস্যরা আসার পর অ্যাকশনে গিয়ে মিনিট কয়েকে ধরে ফেলেছে ১৪ জনকে।
মিরপুরের ঘটনা একটু অন্যরকম। রাতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পল্লবী থানা ইউনিটের আহ্বায়ক জামিল তাজের নেতৃত্বে ২০-২৫ জন যুবক ডিওএইচএস-এর একটি বাসায় ঢুকে পড়ে। তারা বাসার লোকজনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে। খোঁজ করে সাবেক এমপি মোতালেবকে। ছাত্রনেতা তাজ গণমাধ্যমকে বলেন, তারা পুলিশকে জানিয়েই গিয়েছিলেন। পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, তারা অভিযানের বিষয়টি আগেই পুলিশকে জানিয়েছিল। পুলিশ তাদের নিষেধ করেছে তা না করতে। কিন্তু তবুও অভিযানে যায় তারা। এ ঘটনায় কাউকেই আটক করা হয়নি। তাদের সতর্ক করা হয়েছে। কী দাঁড়ায় অবস্থাটা? এ সময়ে গুলশানে তানভীর ইমামের সাবেক শ্বশুরের বাসায় যা ঘটেছে তা এক মাৎস্যন্যায়। এইচটি ইমামের ছেলে তানভীর ইমামের সঙ্গে এই পরিবারের সম্পর্ক ২৭ বছর আগে ছিন্ন হয়ে গেছে। তারপরও তিনি সেখানে লুকিয়ে আছেন, সেখানে অনেক টাকাও আছে, সেই অভিযোগ তুলে অভিযানের নামে জোর করে ঢুকে লুটপাট চালানো হয়েছে। ন্যূনতম আইন বা শৃঙ্খলা থাকলেও তা হতে পারে? কাজগুলো তো ভালো হচ্ছেই না, একটা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাও তৈরি করছে। খেলারামদের সুবিধা করে দিচ্ছে। সরকারের চেষ্টায় কমতি করছে না। কিন্তু, কুলাচ্ছে না। তাই বলে প্রতিরোধের নামে মানুষ আবার সোচ্চার হয়ে মাঠে নামবে? সেটির ফলও কি ভালো হবে? মানুষ দেড় দশকের গোষ্ঠী শাসনের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার ক্ষুব্ধ। হতাশা আছে- প্রতিশোধ স্পৃহা আছে। তাই বলে সাত মাস ধরে তার যে বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে তা কাহাতক সয়? বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৪ ‘সমন্বয়ক’ প্যাসিফিক জিন্সের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) আবেদিন আল মামুনকে নিজ বাসা থেকে অপহরণ করে। তারপর মুক্তিপণ হিসেবে ২০ লাখ টাকা নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর অ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হসপিটাল এলাকায় রেখে পালিয়ে যায় অপহরণকারীরা। জামাতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত সাতকানিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ডাকাতি ও লুটপাটের সময় এলাকাবাসীর গণপিটুনিতে ২ জামায়াতি ক্যাডার নিহত। সাতকানিয়া থানার এওচিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ নেতা নজরুলের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট করতে গেলে এলাকাবাসী ডাকাতি হচ্ছে বলে মাইকিং করে গণপিটুনিতে ২ জামাতের ক্যাডার নিহত হয় বাকিরা এলাকাবাসীকে গুলি করে পালিয়ে যায়। এতে ৪/৫ জন এলাকাবাসী গুলিবিদ্ধ হয়। মানুষ রুখে দাঁড়াতে শুরু করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নিহত জামায়াতকর্মী নেজাম মহানগর জামায়াতের আমির শাহজাহান চৌধুরীর চিহ্নিত ক্যাডার। সে ২০০২ সালে গরু চুরি করে ধরা খাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমায় এবং ৫ আগস্টের পর এলাকায় এসে ত্রাস সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। এইরকম সন্দেহজনক শিক্ষার্থীদের বাইরে শিক্ষকরাও কিন্তু কম যাচ্ছেন না। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেওয়া নিয়ে ভিসি এবং প্রো-ভিসির মধ্যে ন্যক্কারজনক হাতাহাতি; ভিসির পক্ষে সমন্বয়ক-শিবির, প্রো-ভিসির পক্ষে ছাত্রদল।
এসব ঘটনায় যুক্তরা গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-জনতার নাম জড়িয়ে নিচ্ছে। আর জীবনবাজি রেখে হাসিনাশাহীর বিরুদ্ধে লড়াই করা এই গণঅভ্যুত্থানকারীরা জনমানুষের পরম আদরের। সম্প্রতি তারা রাজনৈতিক দল গড়েছেন। দল গঠিত হওয়ার পর নানান ঘটনায় তাদের দলের নাম জড়িয়ে একের পর এক অভিযোগের প্রতিক্রিয়া দলটার সঙ্গে যুক্তদের ভেবে দেখতে হবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের দলীয় ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট চক্রের বিচার হওয়া জরুরি। কিন্তু, বিচারের নামে যে প্রক্রিয়া চলছে, তা বরং বিচারকে বরবাদ করে দিচ্ছে। এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কারও বিচার হয়নি প্রমাণিত হয়নি তারা অপরাধী, তারা সন্দেহভাজন। কিন্তু, রাষ্ট্র কি অনুমানের ওপর ভর করে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করতে পারে? বিগত সরকার দেশে টানা ১৫-১৬ বছর ঘৃণার চাষাবাদ করেছে। এর বিপরীতে আবার প্রতিশোধের আগুন ছড়াচ্ছে। ৫ আগস্টের আগে ছাত্রদের আওয়ামী লীগের কর্মী ও পুলিশ গুলি করে মেরেছে।
সরকার ৫ আগস্টের আগের শয়তান ধরছে কিন্তু ৫ আগস্টের পরে মাজারে হামলাকারী শয়তান কই, জেল পালানো অপরাধী কোথায়? অস্ত্র লুট করা শয়তান কোথায়- টেম্পো স্ট্যান্ড দখল-চাঁদা চাওয়া শয়তান কোথায়? তাদের কেন ধরা হচ্ছে না? সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পিএস ৫ আগস্টের পর পালিয়ে ছিল ৬ মাস কিন্তু তার বেতনভাতা বন্ধ হয়নি, এমনকি তাকে মন্ত্রীর পিএস হিসেবে বেতনভাতা দেওয়ার পর সম্প্রতি তাকে প্রকাশ্যে এনে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এটি নাকি বিপুল টাকা ঘুষের বিনিময় হয়েছে। শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকীর সহযোগী হিসেবে তার সঙ্গে তিন মামলার আসামি প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান যার বিরুদ্ধে কেবল একটা প্রকল্পে ৯০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, তাকে বিমানের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার ১ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। মহল্লায় মহল্লায় সমন্বয়ক, ছাত্র প্রতিনিধি। কে কাকে বিশ্বাস করবে? নতুন দলের প্রধান জানিয়েছেন, সমন্বয়ক এখন আর নেই। তাহলে এরা কারা? প্রশ্ন উঠেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় মোট ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা নিয়ে। সে অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকার বেশি। অভ্যুত্থানের পরে গত সাত মাসে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এ বিপুল পরিমাণ খরচের বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই কেন?
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন