করোনায় প্রকল্প পরিচালকের আগ্রহ ছিল কেনাকাটায়

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৫, ০৮:২০ এএম

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সময় অতি জরুরি মাস্ক ও পিপিইসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী ইউনিসেফ থেকে পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশে। কিন্তু জীবন রক্ষাকারী এসব চিকিৎসাসামগ্রী বিমানবন্দর থেকে খালাস না করে ৯ মাস ফেলে রাখে সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) কর্তৃপক্ষ। এতে বিমানবন্দরকে ডেমারেজ চার্জ হিসেবে ১০ কোটি ৪৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা প্রদান করতে হয়। অন্যদিকে বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নে কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডামিক প্রিপ্রেয়ার্ডনেস প্রকল্পের (ইআরপিপি) আওতায় ৬ হাজার কোটি টাকার জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বলছে, ওই সময় ইআরপিপির প্রকল্প (পিডি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ইকবাল কবির ইউনিসেফ থেকে পাঠানো জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী সিএমএসডির মাধ্যমে খালাসের ব্যবস্থা না নিয়ে সিন্ডিকেট করে চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। স্বাস্থ্যসামগ্রী সরবরাহের সঙ্গে জড়িত নয় এমন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেশি দামে পণ্য কিনে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ করে দিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে জড়িত নয় এমন ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটার মাধ্যমে দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। দুদক এসব অভিযোগ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটি টিম গঠন করেছে। অনুসন্ধান টিম অভিযোগসংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র চেয়ে সিএমএসডির পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছে।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, ইআরপিপির আওতায় জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ২০২০ সালের ৮ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের মধ্যে পিপিই (লেভেল-৩) এবং জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তির আওতায় চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানোর জন্য ইউনিসেফ থেকে সিএমএসডিকে প্রাপক হিসেবে ইনভয়েস ইস্যু করা হয়। ইনভয়েসকৃত চিকিৎসাসামগ্রীর প্রথম চালান ২০২০ সালের ২০ জুন এবং দ্বিতীয় চালান ২০ আগস্ট ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। কিন্তু এসব চিকিৎসাসামগ্রী খালাসের অপেক্ষায় ৯ মাস বিমানবন্দরে পড়ে থাকে। উক্ত পণ্যের প্রাপক সিএমএসডিকে কনসাইনিং করা হলেও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কর্তৃক সিএমএসডির অনুকূলে সিডি-ভ্যাট ও পোর্ট চার্জ বাবদ কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

পরে সিএমএসডিকে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলে পোর্ট ডেমারেজ চার্জ বাবদ ১০ কোটি ৪৩ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৭ টাকা পরিশোধ করে ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে চিকিৎসাসামগ্রী খালাস করা হয়। যেহেতু এসব জরুরি সুরক্ষাসামগ্রী জরুরিভিত্তিতে বিমানবন্দর থেকে খালাসপূর্বক বিতরণ করা প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পের কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী বিমানবন্দরে ফেলে রাখা এবং পোর্ট ডেমারেজ বাবদ ১০ কোটি ৪৩ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৭ টাকা প্রদানের ঘটনার জন্য প্রকল্প পরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তারা দায়ী।

দুদক সূত্রে জানা যায়, ইআরপিপির প্রকল্প (পিডি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ইকবাল কবির তার দায়িত্ব পালনকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করেছেন, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে করোনা চিকিৎসার জন্য নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এমন একটি অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। কমিশন এসব অভিযোগ অনুসন্ধানে সংস্থাটির উপপরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদাকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যদের একটি টিম গঠন করে। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন দুদকের সহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান, মো. শাহজাহান মিরাজ, মো. ফারুক হোসেন ও উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন।

অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা সংক্রমণকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অনুসন্ধান কাজ শুরু করেছে। অনুসন্ধান শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।

জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধান টিম সম্প্রতি অভিযোগসংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র চেয়ে সিএমএসডির পরিচালককে চিঠি দিয়েছেন। টিমের প্রধান উপপরিচালক মোহা. নুরুল হুদা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ইআরপিপির আওতায় ছয়টি প্রতিষ্ঠান জাদিদ অটো মোবাইলস আইএআই (জাহিদ), এসআরএস ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড, এসআইএম কেেপারেশন, ইনশা ট্রেড করপোরেশন, ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেড এবং ই-মিউজিকের মাধ্যমে ২০২০ সালে ক্রয়কৃত মাস্ক, পিপিই এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি আপনার কার্যালয়ে গ্রহণ করা হয়েছে কি না? গৃহীত হয়ে থাকলে মালামাল গ্রহণ-সংক্রান্ত রেকর্ডপত্রে ফটোকপি দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত; অভিযুক্ত ছয়টি কোম্পানি কর্তৃক সরবরাহকৃত মালামাল ফেরত দেওয়া হলে তার রেকর্ডপত্র দিতে হবে। তৃতীয়ত; অভিযুক্ত ছয়টি কোম্পানি কর্তৃক সরবরাহকৃত মালামালের বিষয়ে কোনো বিভাগীয় তদন্ত ও পরীক্ষা হয়ে থাকলে তার রেকর্ডপত্র দিতে হবে।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দেওয়া অন্য এক চিঠিতে ইআরপিপির প্রকল্পের জন্য ক্রয়সংক্রান্ত অনুমোদনপত্র, বরাদ্দপত্র, বাজারদর যাচাই প্রতিবেদন, দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, ঠিকাদার কর্র্তৃক দাখিল করা দরপত্রের কপি চাওয়া হয়। এ ছাড়া ওই প্রজেক্টের দাখিল করা রেকর্ডপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন ও দরপত্রের তুলনামূলক বিবরণী, ঠিকাদার কর্র্তৃক সরবরাহ করা মালামাল আমদানি-সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র, মালামাল রিসিভ কমিটি গঠন, মালামাল বুঝে নেওয়া-সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র, বিল রেজিস্ট্রার, বিল ভাউচারসহ এসব মালামাল ক্রয়সংক্রান্ত নথির সত্যায়িত ফটোকপি চাওয়া হয়।

দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ইআরপিপি আওতায় করোনা সংক্রমণকালে মাস্ক-পিপিই, হাসপাতালের সরঞ্জামাদি, সচেতনতায় বিজ্ঞাপন ও অ্যাপ নির্মাণে দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে এমন একটি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন দুদকে জমা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।

দুদকের তথ্যমতে, ২০২০ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ যৌথভাবে করোনা মোকাবিলায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে। এতে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকও অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ইআরপিপি আওতায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার কাজে মাস্ক-পিপিই, হাসপাতালের সরঞ্জামাদি, সচেতনতায় বিজ্ঞাপন ও অ্যাপ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ওই সময়ে স্বাস্থ্য খাতের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও পিডি ডা. ইকবাল কবির পদে পদে নানা অনিয়ম করেন। অভিযুক্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের মালামাল সরবরাহের মাধ্যমে সরকারের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন উঠে আসে, গাড়ি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জাদিদ অটোমোবাইলস কোম্পানিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহের কাজ প্রদানের ঘটনা। এ ছাড়া পিডির স্ত্রীর কোম্পানিকে ২৯ হাজার ৫০০ ডলার ঘুষ দেওয়ারও অভিযোগ আছে। কাজ শেষের আগেই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, পিডির পরিচিত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়াসহ নানা দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদকের তথ্যমতে, করোনাকালীন অনিয়ম ও দুনীতির অভিযোগ ২০২০ সালেই জমা হয়েছিল দুদকে। ওই অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হলেও শেষ হয়নি। তবে করোনার মতো মহামারীর মধ্যে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ক্রয় ও সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) ছয় কর্মকর্তা ও জেএমআই হাসপাতাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের কর্ণধার মো. আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুদক। এ ছাড়া রিজেন্ট হাসপাতালের অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে মামলা করেছিল সংস্থাটি। আর অদৃশ্য কারণে অন্য অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান বন্ধ থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত