এপেক্স চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর প্রয়াণ

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৫, ০৬:৫৩ এএম

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার সকাল ৯টা ৩১ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তার প্রথম জানাজা আজ সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণে এবং দ্বিতীয় জানাজা জোহরের নামাজের পর ঢাকার গুলশান-২ আজাদ মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে।

এপেক্স ফুটওয়্যার, এপেক্স ট্যানারি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স, গ্রে অ্যাডভার্টাইজিং বাংলাদেশ লিমিটেড, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছেন। ১৯৪২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মঞ্জুর এলাহী। তার পিতা স্যার সৈয়দ নাসিম আলী অবিভক্ত বাংলার প্রধান বিচারপতি ছিলেন। মঞ্জুর এলাহী কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ব্যবসার জগতে পা রাখেন।

তিনি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে কর্মজীবন শুরু করেন, কিন্তু চাকরির নিরাপত্তার পরিবর্তে উদ্যোক্তার অনিশ্চয়তাকে বেছে নেন। ঢাকা ও প্যারিসের মধ্যে চামড়া বাণিজ্যের সূত্র ধরে এক ফরাসি ব্যবসায়ী তাকে চামড়াশিল্পে পদার্পণের সুযোগ করে দেন। গড়ে ওঠে এপেক্স; বিস্তৃত হয় তার বিবিধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এপেক্সকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম জুতা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। তিনি এপেক্স ট্যানারি লিমিটেড, পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের নেতৃত্ব দিয়ে দেশীয় শিল্পের অগ্রযাত্রাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যান। তার প্রভাব বাণিজ্যের বাইরেও বিস্তৃত ছিল। তিনি এপেক্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, গ্রে অ্যাডভার্টাইজিং বাংলাদেশ লিমিটেড, ব্লু ওশান ফুটওয়্যার লিমিটেড এবং কোয়ান্টাম কনজুমার সলিউশন লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন।

তিনি এপেক্স ফার্মা লিমিটেড, এপেক্স ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, সানবিমস স্কুল লিমিটেড, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা ইন্টারন্যাশনাল পাবলিকেশনস লিমিটেড (দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রকাশক), ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ (সিআরএবি), সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন এবং ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পথ দেখিয়েছে।

জাতির ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে দেশকে স্থির রাখার জন্য মঞ্জুর এলাহীকে দুবার আহ্বান জানানো হয়। দুবারই তিনি সাড়া দিয়েছেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে সরকার পরিচালনায় অংশ নেন। তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে তার অবদান বিস্তৃত ছিল। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিইএ) সভাপতি হিসেবে তিনি জাতীয় অর্থনৈতিক নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তার নেতৃত্ব তাকে ব্যবসায়িক জগতে সর্বোচ্চ সম্মান এনে দিয়েছে। আমচ্যাম কর্র্তৃক ‘বিজনেস এক্সিকিউটিভ অব দ্য ইয়ার ২০০০’, দ্য ডেইলি স্টার ও ডিএইচএল কর্র্তৃক ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার ২০০২’ এবং ২০২৩ সালে ২১তম ডিএইচএল-ডেইলি স্টার বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ডে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। কিন্তু পুরস্কার কখনোই তার লক্ষ্য ছিল না। তিনি স্বীকৃতির জন্য নয়, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনুগামী ছিলেন।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল এক শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বাংলাদেশের উদ্যোক্তাজগতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন দেশপ্রেমিক ব্যবসায়ী ছিলেন। দেশের চামড়াশিল্পকে এগিয়ে নিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার একান্ত পরিশ্রমে এপেক্স ফুটওয়্যার দেশের শীর্ষস্থানীয় জুতা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

তার মৃত্যুতে আরও শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী সফল শিল্প উদ্যোক্তা, দেশপ্রেমিক ও রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি হিসেবে সমাজে সমাদৃত ছিলেন। তার মৃত্যুতে আমি শোকাভিভূত। তার মতো গুণী ব্যক্তির শূন্যতা পূর্ণ হওয়ার নয়। আমি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করছি, যেন তারা শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন।’

এ ছাড়া বিশিষ্ট এ শিল্পপতির মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত