গাজীপুরের শ্রীপুরে সাতখামাইর রেলস্টেশনের দক্ষিণ দিকে আউটার সিগন্যাল এলাকায় চলন্ত একটি ট্রেনের পাওয়ার কার আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঘটনাটি তদন্ত করছে রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি। ঢাকা বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তাকে প্রধান করে চার সদস্যের ওই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখনো নিশ্চিত হওয়া না গেলেও প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার দুটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। তিনি জানিয়েছেন, তদন্তের পর আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
এদিকে, পাওয়ার কারে আগুন লাগার পর ট্রেনটি থেমে গেলে ওই এলাকার রেলওয়ের সাবেক লোকোমোটিভ মাস্টার শাহাব উদ্দিনের সাহসী ভূমিকায় শত শত যাত্রী বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। এতে প্রশংসায় ভাসছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী মহুয়া কমিউটার ট্রেনটি শ্রীপুরের কাওরাইদ স্টেশনের কাছে পৌঁছালে এর পাওয়ার কারে আগুন লাগে। এতে পাওয়ার কারটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। এলাকাবাসী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নেভান। পরে পুড়ে যাওয়া বগিটি ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের ওয়াশপিটে রাখা হয়।
গতকাল শুক্রবার সকালে পুড়ে যাওয়া পাওয়ার কারটি পরিদর্শন করেছেন রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন। আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারলেও জেনারেটর ওভারহিট হওয়া বা সিগারেটের আগুন থেকে এ অগ্নিকা- হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
রেলওয়ের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাওয়ার কারটি যেভাবে পুড়ে গেছে তা কোনোভাবেই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এটা চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে জেনারেটর ওভারহিট হওয়া এবং অন্যটি হচ্ছে কোনো মানুষ এসে সিগারেট খাওয়ার সময় আগুন ধরতে পারে। তবে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
তিনি আরও বলেন, পাওয়ার কারের ভেতরে থাকা দুটি জেনারেটরই পুড়ে গেছে। শুধু লোহার ফ্রেমটুকু অবশিষ্ট আছে। পাওয়ার কারের ভেতর যেসব দাহ্য পদার্থ ছিল সেগুলোও পুড়ে গেছে। তবে এটি ঠিক করা যেতে পারে। এটিকে চট্টগ্রামে পাঠানো হবে।
মহুয়া ট্রেনের পরিচালক শাহাদাত হোসেন বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছার আগেই ট্রেনের জেনারেটর কোচে আগুন দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করেন যাত্রীরা। এরপর ট্রেন থামিয়ে যাত্রীদের নামার সুযোগ করে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেন। ততক্ষণে জেনারেটর কোচ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
প্রশংসায় ভাসছেন সাবেক লোকোমোটিভ মাস্টার : শ্রীপুর সাতখামাইর স্টেশনের কাছে ট্রেনের পাওয়ার কারে অগ্নিকা-ের ঘটনার সময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক সময়ের লোকোমোটিভ মাস্টার শাহাব উদ্দিন (৬৭)। শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের প্রয়াত আব্দুল হাকিমের ছেলে শাহাব উদ্দিন দেখতে পান ট্রেনে দাউ দাউ করে আগুন জ¦লছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেনটি থেমেও যায়। কোনো ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই তিনি দৌড়ে ট্রেনের কাছে গিয়ে আগুন ধরে যাওয়া বগিটি স্থানীয়দের সহায়তায় আলাদা করে ফেলেন। শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘নিজের চিন্তা করিনি। ট্রেনে থাকা সহস্রাধিক মানুষকে রক্ষা করতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জ¦লতে থাকা বগির কাছে গিয়ে সেটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলি।’ স্থানীয়রা তাকে সহযোগিতা করেন বলেও জানান তিনি।
ট্রেনের যাত্রী মো. সেলিম মিয়া বলেন, ট্রেনটি শ্রীপুর থেকে ছেড়ে আসার পর সাতখামাইর রেলস্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছলে একটি বগিতে হঠাৎ আগুন দেখা যায়। আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ট্রেনে থাকা যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন। এরপর ট্রেনটি সেখানে থামানো হয়। পরে আগুন লাগা বগিটিকে মূল ট্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নেভান।
ট্রেনের যাত্রী সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি ট্রেনের একটি বগিতে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ বগির সব ফ্যান বন্ধ ও বাতিগুলো নিভে যায়। এরপর বিভিন্ন বগি থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে আসতে থাকে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখেন, একটি বগি জ্বলছে, প্রচন্ড ধোঁয়া বের হচ্ছে। স্থানীয়রা এসে আগুন লাগা বগিটিকে অন্যান্য বগি থেকে আলাদা করে দেন।
ট্রেনের পরিচালক শাহাদাত হোসেন বলেন, আগুন লাগার পরপরই বিষয়টি টের পেয়ে লোকোটিভ মাস্টার ট্রেনটি থামিয়ে ফেলেন। এরপর যাত্রীরা এদিক-সেদিক লাফালাফি করে নামতে শুরু করেন। ঘটনার পরপরই একজন বয়স্ক মানুষ ট্রেনের জেনারেটর বগি থেকে অন্য বগি আলাদা করার কাজটি করেন। তা না হলে অনেক মানুষের প্রাণহানি হতে পারত। তিনি বলেন ট্রেনে সহস্রাধিক যাত্রী ছিলেন।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুন বলেন, ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বগির আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হই। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। জেনারেটর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত করে বিস্তারিত জানা যাবে।’
