ঈদের ছুটি শেষে ফিরছে মানুষ

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:৩৪ এএম

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ৯ দিনের ছুটি শেষে ফের রাজধানীতে ফিরছে কর্মজীবী মানুষ। গতকাল শনিবার রাজধানীর বাস, লঞ্চ ও কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। তবে বাস টার্মিনালগুলোতে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেন যাত্রীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছুটি চলাকালে বিগত দিনের তুলনায় সড়কে গতকাল থেকে বেড়েছে যান চলাচল। বেড়েছে সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও। কিছুক্ষণ পর পর রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে আসছে ফিরতি ঈদযাত্রার দূরপাল্লার পরিবহন। তবে বেশ কিছু জায়গায় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেন যাত্রীরা। তবে ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রাপথে সড়কে দীর্ঘ যানজটসহ কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করছেন যাত্রীরা।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে বরিশাল থেকে আসা এক যাত্রী মুন্না বলেন, ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বরিশালে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ঈদের ছুটি শেষ হওয়ায় আজ (গতকাল) ঢাকায় আসতে হয়েছে। তবে আগের থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি ভাড়া দিয়ে আসতে হচ্ছে ফিরতি যাত্রায়।

ওয়াসিম মঈন নামের এই টার্মিনালের আরেক যাত্রী বলেন, এবার ঈদে যাওয়া-আসায় কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। তবে শরিয়তপুর সুপার সার্ভিস পরিবহন যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। ২৫০ টাকার ভাড়া ৪০০ টাকা করে নিচ্ছে।

ছুটি শেষে মাদারীপুরের শিবচর থেকে ঢাকায় ফিরছেন নাছিমা বেগম। তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি বলেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামে ঈদ করলাম। ৯ দিনের ছুটি নিমেষেই পার হয়ে গেছে। আগামীকাল (আজ) থেকে অফিস। যার জন্য ঢাকায় ফিরতে হয়েছে। তবে এবারের ঈদযাত্রায় স্বস্তি ছিল বলে জানান এই যাত্রী।  

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের দোকানি মনসুর হোসেন বলেন, গতকাল বিপুলসংখ্যক মানুষ ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। আজ ভোর থেকে দেখছি মানুষ ঢাকায় ফিরে আসছে। তুলনামূলকভাবে বেশি মানুষ ঢাকায় ফিরছে আজ।

ভিড় বাড়ছে কমালপুর রেলস্টেশনে : এদিকে শেষ মুহূর্তের ছুটি কাটিয়ে রাজধানীতে ফিরছে লাখ লাখ মানুষ। এমনি পরিস্থিতিতে দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ নিয়ে ঢাকায় আসছে দেশের বিভিন্ন গন্তব্য থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনগুলো। শনিবার সকাল ৯টা ৩৩ মিনিটে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে থামে পঞ্চগড় থেকে ছেড়ে আসা একতা এক্সপ্রেস। যদিও ট্রেনটির ঢাকায় আসার কথা ছিল সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে।

নরসিংদী কমিউটার-১ ট্রেনটি থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছায় সকাল ১০টায়। যদিও সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে থাকার কথা ছিল ট্রেনটির।

একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে থামার সঙ্গে সঙ্গে ছাদে যেসব মানুষ ছিলেন, তারা যে যেভাবে পেরেছেন ট্রেন থেকে নেমেছেন। ট্রেনের ভেতরে দেখা গেছে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে এসেছেন। আর আসন তো ভর্তিই ছিল। সাধারণত ট্রেনটিতে ১২৩০-১২৫৪ জন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারেন। কিন্তু ট্রেনের যাত্রীরা মনে করছেন, ট্রেনটিতে দেড় থেকে প্রায় ২ হাজার মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেছেন।

নরসিংদী কমিউটার-১ ট্রেনের যাত্রীরা জানিয়েছেন, আজ (শনিবার) ট্রেন ভর্তি করে মানুষ ঢাকায় এসেছে। ট্রেনের মধ্যে হাঁটাচলা করার মতো ন্যূনতম জায়গা ছিল না।

পঞ্চগড় থেকে একতা এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়েছেন আবদুর রহমান। তিনি বলেন, পঞ্চগড় থেকে ট্রেনের লোকসংখ্যা ছিল প্রচুর। পরের প্রতিটি স্টেশনেই গাদাগাদি করে ট্রেনে লোক উঠেছে। পথে স্টেশনগুলোতে নির্ধারিত সময় থেকেও ৫-৭ মিনিট বেশি বিরতি দিয়েছে। ট্রেনের ভেতর যেন শ্বাস নেওয়ার জায়গা ছিল না।

আরেক যাত্রী জাহিদ হাসান বলেন, এই ট্রেনে কমপক্ষে ১৫০০ থেকে ২ হাজার মানুষ ঢাকায় এসেছে। ট্রেনের ভেতর ওয়াশরুমে যাওয়ার মতো জায়গা ছিল না আজ। ট্রেনের ছাদেও মানুষ ছিল।

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, সারা দিনে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেশের বিভিন্ন গন্তব্য থেকে ৪৩টি আন্তঃনগর ট্রেন ও ২৫টি মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন আসে।

দিনভর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট : মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া অংশসহ পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁও উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দিনভর দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরতে যাওয়া হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। আর এই যানজটের মধ্যে একাধিক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় একাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার ভোর রাত থেকেই মহাসড়কের গজারিয়া অংশে যানজটের সৃষ্টি হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা দীর্ঘ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আরও জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মহাষ্টমী পুণ্যস্নান।এই পুণ্যস্নানে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ পুণ্যার্থী অংশগ্রহণের কারণে এই যানজটের সৃষ্টি হয়।

তবে দীর্ঘ যানজটের মধ্যেও একাধিক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহতসহ ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার বালুয়াকান্দী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি মিনিবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাইভেটকারকে পেছন দিক থেকে ধাক্কা দিয়ে মহাসড়কের পাশে মার্কেটে ঢুকে যায়, এই ঘটনায় আনোয়ারা বেগম নামে এক নারী গুরুতর আহতসহ দোকানদার জর্জ মিয়া, তপন, সোহাগ শিকদার, মাহমুদা বেগমসহ ১০ জন আহত হনঅ। অপর দুর্ঘটনা পার্শ¦বর্তী সোনারগাঁও উপজেলার মোগড়াপাড়ায় ঘটে। জানা যায়, একটি যাত্রীবাহী বাস বেপরোয়া গতিতে এসে একটি অটোরিকশা দুমড়ে মুচড়ে দেয়। এই ঘটনায়ও অটোরিকশা চালক গুরুতর আহত হন।

বেলা ১ ঘটিকায় দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকা বাসচালক অলিউল্লাহ জানান, ভবেরচর থেকে জামালদী বাসস্ট্যান্ডে আসতে ৫/৭ মিনিট লাগার কথা, সেখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গেছে।

চট্রগ্রাম থেকে আগত আমির হামজা নামে এক যাত্রী জানান, এই গরমের মধ্যে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা ধরে যানজটের মধ্যে থেকে নাভিশ্বাস অবস্থা।

গজারিয়া ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ মো. শওকত হোসেন জানান,পার্শ¦বর্তী নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মহাষ্টমী পুণ্যস্নানের কারণে এই যানজট সৃষ্টি হয়েছিল; তবে বেলা ৩টার পর যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যায়।

এ বিষয়ে কাঁচপুর হাইওয়ে থানায় অফিসার ইনচার্জ কাজী ওয়াহেদ মোর্শেদ জানান, পুণ্যস্নানের কারণে এই যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার (৪ এপ্রিল) রাত ২টা থেকে শুরু হয়ে ৫ এপ্রিল রাত ১২টা ৪৫ পর্যন্ত দুদিনব্যাপী এই উৎসব চলবে তবে এই মুহূর্তে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

এদিকে ঈদুল ফিতরের ছুটির শেষ দিনে বরিশালের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল যেন এক দুঃসহ মানবস্রোতের নাম। কর্মস্থলে ফেরার তাড়ায়, রাজধানীমুখী মানুষের ঢল আর সেই সঙ্গে বাড়তি ভাড়া, যান সংকট ও দুর্ব্যবহার সব মিলিয়ে রীতিমতো ‘দুর্ভোগযাত্রা’য় রূপ নিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের সড়কপথ। শনিবার সকাল থেকেই সরেজমিনে দেখা গেছে, বাস কাউন্টারগুলোতে ভিড়, অপেক্ষা, হতাশা আর কান্না মিশে এক বেদনাবিধুর চিত্র। 

ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করা বাকেরগঞ্জ উপজেলার বাদলপাড়া এলাকার রোকেয়া বেগম (৫০) অসহায় কণ্ঠে বললেন, ‘ভাইরে ভাই, এ্যা বুজলে জীবনেও বাসে রওয়ানা দিতাম না। পা হালাইলেই ভোগান্তি। ৫শ টাহার ভাড়া ৮শ টাহা দিয়াও টিকিট পাই না। ঈদে আর কস্মিনকালেও বাসে উডমু না।’

রোকেয়ার চোখে ছিল নিঃসঙ্গতা, সঙ্গে হতাশা। বললেন, ‘লঞ্চে ম্যালা ভিড় হুইন্না আইছি টার্মিনালে। এইহানেও মউতের ভিড়। ঠেলাঠেলি, মারামারি সবই হইতাছে। শেষমেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলা বাসে ৬০০ টাকা দিয়া উঠছি।’

বাবুগঞ্জের দেহেরগতি ইউনিয়নের বাসিন্দা মুসলিম মাঝি জানালেন, গোল্ডেন লাইন পরিবহনের টিকিট কেটেছিলেন, কিন্তু বাসটি রহমতপুর থেকে তাকে না নিয়েই চলে গেছে। এখন আশঙ্কায় আছেন টাকাটা আদৌ ফেরত পাবেন কি না।

কবিরুল ইসলাম নামে এক যাত্রী আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন, ‘বিএমএফ কাউন্টারে গিয়া টিকিট চাইছি। ওরা সারা বছর সাড়ে ৩শ থেকে ৫শ টাকায় ঢাকা নিছে, এখন ৬শ থেকে ৭শ টাকায় বিক্রি করতাছে। আমি জিগাইলে দুইজনে কলার ধইরা চড়-থাপ্পড় দিছে। এইটাই কি যাত্রীসেবা?’

এ দৃশ্য শুধু ব্যতিক্রম নয় বরং সিস্টেমেটিক নৈরাজ্যের বহিঃপ্রকাশ। 

সকাল ৯টার দিকে নথুল্লাবাদ টার্মিনাল পরিণত হয় যাত্রীদের হাহাকারের মঞ্চে। নারী, পুরুষ, শিশু সব বয়সী মানুষ কাউন্টারগুলোর সামনে অপেক্ষা করছেন দীর্ঘ সময় ধরে। খালি বাস এলেই যাত্রীরা ছুটে যাচ্ছেন, ধাক্কাধাক্কিতে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

পারুল নামে এক নারী যাত্রী বললেন, ‘দেড় ঘণ্টা ধইরা লাইনে দাঁড়ায়া টিকিট পাই না। ভাড়া বেশি চাইতাছে, আমার হাতে টাকা নাই। বেশি ভাড়া দিলে ঢাকায় নাইমা বাসায় যাইতে পারুম না। আগের ভাড়ার জন্য অপেক্ষা করতাছি।’

এদিকে বাসচালক নিজাম হোসেন পরিস্থিতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘যাত্রী অনেক, কিন্তু কেউ দুই-চার টাকা বেশি দিতেও চায় না। আমরা তো খালি বাস নিয়াই বরিশাল আসি। সেই খরচ তো তুলতে হইব। তাই ৫০-১০০ টাকা বাড়তি নিচ্ছে অনেকে।’

বরিশাল বিআরটিসি ডিপো ম্যানেজার জামিল হোসেন জানান, যাত্রীচাপ সামলাতে ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ দোতলা বাসগুলো বরিশাল-ঢাকা রুটে যুক্ত করা হয়েছে।

বিআরটিএ বরিশালের সহকারী পরিচালক সৌরভ দাস জানান, ‘যাত্রী হয়রানি রোধে আমরা বিভিন্ন বাস টার্মিনালে অভিযান চালাচ্ছি। আমি নিজে নথুল্লাবাদে অবস্থান করছি।’

র‌্যাব-৮-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, ‘ঈদের আগে মানুষ যেমন নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে, তেমনি যেন কর্মস্থলেও নিরাপদে ফিরতে পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য র‌্যাব কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’

রিপোর্টটি করতে সহযোগিতা করেছেন গজারিয়া (প্রতিনিধি) মুন্সীগঞ্জ ও বরিশাল প্রতিনিধি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত