বিশ্বের সিংহভাগ দেশ থেকে সব আমদানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, তা গতকাল শনিবার থেকে তা কার্যকর হয়েছে। নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেই শুল্ক সংগ্রহ করাও শুরু করেছেন। নির্দেশ অনুযায়ী শনিবার প্রথম প্রহর থেকেই প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা পণ্য থেকে নতুন এ শুল্ক নেওয়া শুরু করেন। ৫৭টি বড় বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ট্রাম্প আরও বেশি শুল্ক চাপিয়েছেন। ট্রাম্পের আরোপ করা ১১ থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক আগামী বুধবার থেকে নেওয়া শুরু করবে ট্রাম্প প্রশাসন।
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১২টি দেশের ওপর এই ‘ভিত্তি শুল্ক’ জারি করেছেন তিনি। দেশগুলো হলো যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, তুরস্ক, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা, এল সালভাদর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর এবং সৌদি আরব। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সব সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও শুল্কগুদামে পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ১২টা ১ মিনিটে এই ‘ভিত্তি শুল্ক’ কার্যকর হয়। এর ভেতর দিয়ে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত শুল্ক ব্যবস্থাকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করলেন। আমেরিকান-ব্রিটিশ ল’ ফার্ম হোগান লভেলসের বাণিজ্যবিষয়ক আইনজীবী কেলি অ্যান শ বলেন, আমাদের জীবদ্দশায় এটিই একক বৃহত্তম বাণিজ্য পদক্ষেপ। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউজের বাণিজ্য উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এক অনুষ্ঠানে শ বলেন, বিভিন্ন দেশ দরকষাকষি শুরু করায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পণ্যেই শুল্কের হার বদলাতে পারে। তিনি বলেন, এরপরও এটা বিশাল ব্যাপার। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যের পদ্ধতিতে এটি একটি বিরাট ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। বুধবার ট্রাম্প তার নতুন শুল্কনীতি ঘোষণার পর বিশ্বের প্রায় সব শেয়ারবাজার মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছে; শুক্রবার লেনদেন শেষ হওয়া পর্যন্ত টানা দুদিনে এসঅ্যান্ডপি-৫০০-তে নিবন্ধিত কোম্পানিগুলো ৫ লাখ কোটি ডলার হারিয়েছে। তেল ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম নামছে, নিরাপত্তার জন্য বিনিয়োগকারীরা ছুটছে সরকারি বন্ডের দিকে। নৌযানে পণ্য পরিবহনকারীদের পাঠানো বুলেটিনে শনিবার মধ্যরাতে জলসীমায় থাকলেও কোনো জাহাজকে শুল্ক থেকে ছাড় না দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এ দফায় ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যে ২০ শতাংশ এবং চীনা পণ্যে ৩৪ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেছেন। ট্রাম্পের প্রথম বছরে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে লাভবান হওয়া ভিয়েতনামের পণ্যে বসেছে ৪৬ শতাংশ শুল্ক। এই শুল্ক কমিয়ে আনতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনায় রাজিও হয়েছে বলে জানা গেছে। ট্রাম্পের নতুন শুল্ক থেকে বাদ পড়েছে কানাডা ও মেক্সিকো। দেশ দুটির অনেক পণ্যে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আগেই ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে চীনের পাল্টা শুল্ক আরোপে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিংকে সতর্ক করে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, চীন ভুল করছে। তারা আতঙ্কে এমন কাজ করছে। যার পরিণাম ভোগার মতো অবস্থায় তারা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ঘোষণার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আরও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, তারা নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য চীনের বাজার ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারে বিধিনিষেধ আরও বাড়বে। এ ছাড়া ১১টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে অবিশ্বস্ত সত্তা তালিকায় যুক্ত করেছে। এর আওতায় চীন এসব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক মোকাবিলায় চীনের বড় অস্ত্র হতে পারে বিরল খনিজ পদার্থ। বিশ্বে পরিশোধিত বিরল খনিজ উপাদানের ৯০ শতাংশই চীন উৎপাদন করে, আর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিরল খনিজ আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র।
খনিজ সম্পদবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট ব্লুর সদস্য ডেভিড মেরিম্যান বলেন, এ ধরনের পণ্যে বিধিনিষেধ আরোপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলোর ওপর চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। বেইজিং এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তিনটি ধাতু রপ্তানিতে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আর কিছু দেশে রপ্তানি আরও কড়াকড়ি করেছে তারা। বিরল খনিজ উপাদানে নিজেদের আধিপত্যকে চীন যে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্তকে তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
