অবসরে যাওয়ার বয়স ১৫ দিন। অথচ তিনি এখনো প্রকল্প ঘুরে বেড়ান। তা—ও আবার সংস্থাটির এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিয়ে। এই নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্য সমালোচনার ঝড় বইছে। অবসরে যাওয়া ব্যক্তিটি হচ্ছেন বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। রবিবার দুপুরে হাবিবের রহমানের বিরুদ্ধে প্রধান উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এরই মধ্য আগামীকাল সোমবার সংস্থাটির বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় প্রধান প্রকৌশলীর পদে নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বেবিচকের একটি সিন্ডিকেট কৌশলে প্রধান প্রকৌশলীর পদটি শূন্য রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈদের দিন বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে নিয়ে কাওলা কোয়ার্টার মসজিদে নামাজ পড়েন হাবিবুর রহমান। পরে তিনি ওই কর্মকর্তাকে নিয়ে বেবিচকের বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে কাজের অগ্রগতি দেখেন। এমনকি তিনি প্রকল্পে কর্মরত কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের দিকনির্দেশনা দেন। অবসরে গিয়ে তিনি এই কাজ করতেই পারেন না। তাকে আবারো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পায়তারা চলছে। বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতনদের অবহিত করা হয়েছে। বেবিচকে ঘাপটি মেরে থাকা একটি সিন্ডিকেট হাবিবকে যেভাবে হোক আবারো সংস্থাটিতে রাখবেই বলে ঘোষণা দিয়েছে। ওই সিন্ডিকেটটি মোটা অংকের অর্থও হাতিয়ে নিচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। যার ফলে প্রধান প্রকৌশলীর পদটি কৌশলে কাউকে নিয়োগ দিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, গত ২২ মার্চ অবসরে যান তিনি। অবসরে গিয়েও হাবিবুর আবারো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি বেবিচকের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে তোড়জোড় শুরু করেছেন। যদিও ২৫ মার্চ বেবিচকে বোর্ড সভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকবে তাদের ভালো স্থানে নিয়োগ দেওয়া তো যাবেই না উল্টো ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৌশল বিভাগের প্রধান করতে তিনজন কর্মকর্তার নাম চূড়ান্ত করে একজনকে নিয়োগ দিতে সিদ্ধান্ত হয়। অথচ এই সিদ্ধান্ত অমান্য করে আবারো হাবিবুর রহমানকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। বিষয়টি আজ প্রধান উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে দুর্নীতি বিরোধী সমন্বয় কমিটির প্রধান ড. মো. জুবাইর আলম।
জানা গেছে, গত বোর্ড সভায় হাবিবুর অবসরে যাওয়ার পর তিন জনের বিষয়ে অলোচনা হয়েছে। তারা হলেন, শহীদুল আফরোজ, মোঃ জাকারিয়া ও শুভাষীষ বড়ুয়া। তাদের মধ্য একজনকে নিয়োগ দিতে সিদ্ধান্ত হয়। হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ আছে। টেন্ডারের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৫ লাখ টাকার ঘুষ নিয়েও কাজ না দেওয়ায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মালেকের নাম রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, আসামিরা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাবিবুর রহমানের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে আবারও দুই বছরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে নানা মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছিলেন। গত ২৬ জানুয়ারি সংস্থাটির চেয়ারম্যানের কাছে আবেদনও করা হয়েছে। এ নিয়ে পুরো বেবিচকে তোলপাড় শুরু হয়। গত সরকারের আমলেও সংস্থাটির সাবেক প্রধান আবদুল মালেকের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় দুদক তদন্ত করে। তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ম্যানেজ করে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ভাগিয়ে নেন।
প্রধান উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, দুদকের ৪ মামলার মূল আসামি হাবিবুর রহমানকে সিএএবি’র প্রধান প্রকৌশলীর শূন্য পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য কালক্ষেপণের মাধ্যমে পদটি (শূন্য রেখে) অনৈতিক লিয়াজো করা হচ্ছে। অথচ এ পদে পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন ছয় জন অভিজ্ঞ ও দক্ষ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ সংস্থায় কর্মরত রয়েছে। যারা প্রত্যেকেই দুর্নীতিবাজ বিগত প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান থেকে অধিকতর নম্র, ভদ্র, কারিগরি ও পেশাগত জ্ঞান সম্পন্ন। তথাপিও যোগ্যতা সম্পন্ন ছয় জন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মধ্য হতে কাউকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব প্রদান না করে কিছু কর্মকর্তা দুর্নীতিবাজ হাবিবুর রহমান সম্পর্কে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে কালক্ষেপণ করে তাকে ১ বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত যা পরিপূর্ণ ভাবে স্বার্থান্বেষী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
প্রকৃতপক্ষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প কাজের উদ্বোধন আগামী অক্টোবরে করার জন্য হাবিবুর রহমানকে সিভিল অ্যাভিয়েশনের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে ১ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন মর্মে চেয়ারম্যান সিএএবির মাধ্যমে যে তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে তা অসত্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই। কারণ, দুদক করা তৃতীয় টার্মিনালের অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় হাবিবুর একজন আসামি। উক্ত আসামিকে আবারও একই কাজে নিয়োগ প্রদান করা হলে আরও বেশি করে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ পাবেন। প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতে মনোনিবেশ করায় প্রকল্পের উদ্বোধনের কাজ আরও বিলম্বিত হবে। প্রকল্পের ৯৯.৫% কাজ সমাপ্ত হয়েছে। অবশিষ্ট সামান্য কাজ সমাপ্ত করতে বিদ্যমান প্রকল্প পরিচালকই যথেষ্ট। হাবিবুর রহমানের প্রয়োজন হবে না।প্রকল্পের আওতায় যে ৫০০ এর অধিক ভ্যারিয়েশন হয়েছে তা চূড়ান্ত করার জন্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক সদস্য (অর্থ) এর সভাপতিত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে যাতে প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলীও অন্তর্ভুক্ত আছেন। ফলে সদস্য অর্থ এর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কাজটি সমাধান করতে পারবেন। হাবিবুর রহমান নামক দুর্নীতিবাজ কোন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হবে না। উপরন্তু তাকে নিয়োগ দেয়া হলে variation এর সমাধানের নামে তিনি ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশে সরকারী অর্থ লুটপাটের সুযোগ পেয়ে যাবেন।
চলতি বছরের অক্টোবর তৃতীয় টার্মিনালের অপারেশন চালু সংক্রান্ত কাজ উদ্বোধনের জন্য জাপানি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সুমিতোমোকে নিয়োগের কাজ ও দরপত্র আহ্বান, প্রক্রিয়াকরণ, মূল্যায়ন, নেগোশিয়েশন, কার্যাদেশ প্রদান প্রভৃতি কাজ বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস)-এর দপ্তর হতে সম্পাদিত হচ্ছে। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর এ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। ফলে এ কাজ সফলভাবে সম্পাদনের জন্য হাবিবুর রহমানের প্রয়োজন নেই। বেবিচকের অন্যান্য প্রকৌশলীরা এ কাজে সদস্যকে (অপারেশনস) সহায়তার জন্য যথেষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞ।
৩য় টার্মিনাল ব্যতীত অন্যান্য যে সকল প্রকল্প কাজের জন্য তাকে প্রয়োজন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন সে সকল প্রকল্পের প্রতিটিতে একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ সিএএবির প্রকৌশলী প্রকল্প পরিচালক হিসাবে কর্মরত আছেন। ফলে হাবিবুর রহমান না থাকলেও ঐ সকল প্রকল্প কাজ সিএএবি'র অভিজ্ঞ প্রকৌশলীগণ কর্তৃক সম্পাদনযোগ্য।
হাবিবুর রহমান সুদীর্ঘ চাকরি জীবনের অধিকাংশ সময়েই ওএসডি বা কর্মক্ষেত্রের বাহিরে সিএএবি সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। যে সময়টুকুতে তিনি প্রকৌশল সংক্রান্ত কর্মক্ষেত্রে চাকুরী করেছেন সে সময়ে তিনি দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত ছিলেন। ফলে সিএএবির প্রকৌশল সংক্রান্ত বিষয়ে তার জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা প্রশ্নবিদ্ধ। তার বিরুদ্ধে দুদক ইতিমধ্যে চারটি মামলা দাখিল করেছেন। ছাড়া জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। ফলে এরূপ একজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর জাতিকে কিইবা দেওয়ার আছে বা তাঁর কাছে সতীর্থরা দুর্নীতি ছাড়া আর কিই বা শিখতে পারেন। ফিডার পদ পূরণকারী কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ ভাবে পায়তারা করে একজন দুর্নীতি মামলার আসামীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করা পরিপূর্ণ ভাবে স্বার্থান্বেষী, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এরূপ বিশেষায়িত পদে যোগ্যতর কর্মকর্তা রয়েছে। তারা পদোন্নতি বঞ্চিত হলে সিএএবি'র প্রকৌশল শাখায় বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং দাপ্তরিক কাজে স্থবিরতা সৃষ্টি হবে। জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পায়তারা বন্ধ করে এরূপ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবস্থা সৃষ্টিকরণের জন্য সদ্য অবসর প্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী সহ অন্যান্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে সিএএবি'র প্রকৌশল শাখায় স্বাভাবিক কার্য প্রক্রিয়ায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পায়তারা বন্ধে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। একজনের শূন্যস্থান অপর দক্ষ প্রকৌশলীর দ্বারা পূরণ হবে। এটাই নিয়ম। কোন এক ব্যক্তি না থাকলে সিভিল অ্যাভিয়েশন বা বাংলাদেশ অচল হয়ে যাচ্ছে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ পৃথিবীতে কেহই চিরস্থায়ী নহে। ফলে হাবিবুর রহমান ছাড়া ঐ সকল প্রকল্পের কাজ উদ্ধার হবে না এ ধরনের বক্তব্য অন্তঃসারশূন্য। কোনো এক বিশেষ দুরভিসন্ধির কারণে এখতিয়ার বহির্ভূত কার্যক্রম দেখিয়ে দেরি করার মাধ্যমে সিএএবি'র অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান প্রকৌশলী পদটিতে এখনো নিয়মিত কর্মকর্তার দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে পূরণ না করে কালক্ষেপণ ও নিজেদের অসৎ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো হচ্ছে। ৩০০ ও ৩০১তম বোর্ড সভায় প্রধান প্রকৌশলী পদটি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন উল্লেখ থাকলেও এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে ইচ্ছাকৃতভাবে সময় ক্ষেপণের জন্য তা পূরণের দিকনির্দেশনা চেয়ে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। যা দুরভিসন্ধিমূলক, চক্রান্তমূলক, ইচ্ছাকৃতভাবে কর্তৃপক্ষের সামঞ্জস্যতাকে নষ্ট করা তথা দেরি করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অনৈতিক লিঁয়াজো করার সময় প্রদানে সহযোগিতামূলক। কেননা এত দীর্ঘ সরকারি বন্ধের মধ্যে সিএএবি'তে প্রধান প্রকৌশলী পদটি শূন্য এবং সার্বিক প্রকৌশল শাখার দেখাশুনা করার মত কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। প্রমাণিত হয় যে নিয়মিত কর্মকর্তা দিয়ে পদটি পূরণের চেয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার প্রয়াসকেই কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা সায় দিয়ে যাচ্ছে আরেক সদ্য অবসরপ্রাপ্ত দুদকের আসামি হাবিবুর রহমানকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে।
বেবিচক সূত্র জানায়, বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় প্রকৌশল বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন বেবিচকের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ করেছেন। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দুদক তদন্ত করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বেচিকের যত মেগা প্রকল্প রয়েছে, প্রায় সবগুলোতেই অর্থ-বাণিজ্য করেছেন তিনি। অনিয়ম হালাল করতে রাতারাতি টেন্ডারের নিয়ম পাল্টে ফেলেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিনা টেন্ডারে ১৬ কোটি টাকার কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন কাজে পিডি থাকার সময় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের প্রমাণ পায় মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। পরে তাকে পিডির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সিভিল সার্কেল-১-এর দায়িত্বে থাকাকালে দুর্নীতি ও খামখেয়ালিপনার প্রমাণ পাওয়ায় হাবিবুর রহমানকে বেবিচকের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে অদৃশ্য কারণে তাকে একের পর এক মেগা প্রকল্পে পিডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে খুলনার খানজাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উন্নয়ন, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ ও নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, চট্টগ্রামে শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ এবং প্যারালাল ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান টার্মিনাল সম্প্রসারণ-নবরূপায়ণ এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও রানওয়ে সম্প্রসারণ কাজ। এতসব অভিযোগ থাকার পরও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আওয়ামী লীগবিরোধী বলে প্রচার করতে থাকেন। প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি অবহেলিত ছিলেন বলে পদোন্নতি নেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষমেশ তিনি পদোন্নতি পেয়ে যান।
প্রকৌশল বিভাগের সাবেক প্রধান আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় দুদক তদন্ত করে। তিনিও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তারিক আহমেদ সিদ্দিকীকে ম্যানেজ করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। এ নিয়েও বেবিচকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গত ২৭ জানুয়ারি ৮১২ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় আবদুল মালেক ও হাবিবুর রহমানসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা করে দুদক। গত মঙ্গলবার মামলার আট আসামি যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন সেজন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। এত অভিযোগ থাকার পর গত ২৬ জানুয়ারি হাবিবুর রহমান দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে আবেদন করে।
এ বিষয়ে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে করা আবেদনে হাবিবুর রহমানকে নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা আখ্যায়িত করা হয়েছে। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে কক্সবাজার বিমানবন্দর (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদ্যমান রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রকল্প, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রকল্পসহ আরও ছোট-বড় প্রকল্পের পরিচালক পদে নিষ্ঠা ও সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য আটটি ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, হাবিবুর রহমানের অবসর ছুটি বাতিল করে চলতি বছরের ২৩ মার্চ থেকে ২০২৭ সালের ২২ মার্চ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য প্রস্তাব করা হয়। অবসরে যাওয়ার পরও তাকে আবারো নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, এর আগে দরপত্রের কাজ পেতে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এক ঠিকাদার। কিন্তু তিনি কাজ না পেয়ে অর্থ ফেরত চেয়েছেন। এই নিয়ে টালবাহানা চলতে থাকে কয়েক মাস ধরে। সবশেষে ঠিকাদার সিরাজুল ইসলাম ডিএমপির দুটি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তাছাড়া দিয়েছেন উকিল নোটিস। পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা ও বেবিচক চেয়ারম্যানকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জিডির বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে তদন্তকারী সংস্থা। গত ১১ জানুয়ারি উত্তরা পূর্ব থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২২ সালের ১৪ মে বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে ঠিকাদারি কাজের জন্য অগ্রিম টাকা দিই। কাজ না দেওয়ার পাশাপাশি টাকা ফেরত না দিয়ে হাবিবুর রহমান আমাকে ঘুরাতে থাকে। গত ৫ জানুয়ারি দক্ষিণখানের ‘একুশে ভোজ’ রেস্তোরাঁয় তাকে সামনে পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে সে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে হুমকি দেয়। গত ১২ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে পাঠানো উকিল নোটিশে বলা হয়, হাবিবুর রহমান বেবিচকের পিঅ্যান্ডডি কিউএস সার্কেলে এসই পদে থাকাবস্থায় ৫ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছেন।
