আমার আব্বাও নাই, ভাইও নাই, মার অবস্থাও ভাল না। কাকা, ওরা মারা গেছে। আমি হাসপাতালে আছি, আমি এহন কী করব? গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সিঁড়িতে বসে এভাবে মোবাইল ফোনে স্বজনকে বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানাচ্ছিলেন মো. সাহেদ সরদার। তার মা একই দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। গতকাল বেলা ১১টায় সদর উপজেলার বাখুন্ডা এলাকায় ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কে ঘটা ওই বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে সাত জন। নিহতদের মধ্যে তিন জন নারী এবং তিনজন পুরুষ ও এক শিশু রয়েছে। এতে আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৩০ জন। নিহতদের মধ্যে সাহেদ সরদারের বাবা জোয়ার সরদার (৬৫) ও ছোট ভাই ইমান সরদার (৩৫) রয়েছেন। তার বৃদ্ধ মা পারুলী বেগম আহত হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন। তারা নগরকান্দা উপজেলার শেয়ারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। এ ছাড়া ওই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন, ফজিরুন নেছা (৬০), শ্রাবন হাসান (৪০), আজিবুর (৪৩), ভারতি সরকার (৪০) ও দীপা খান (৩৪)।
এদিকে গতকাল ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় আরও চার জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা।
ফরিদপুরের বাখুণ্ডা এলাকার স্থানীয় লোকজনের বরাতে আমাদের প্রতিনিধি জানান, মুকসুদপুর থেকে ছেড়ে আসা ‘ফারিয়া’ পরিবহনের একটি বাস নগরকান্দা হয়ে ফরিদপুরে যাচ্ছিল। পথে রাস্তার পাশে বিদ্যুতের খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়রা গিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
ফরিদপুর হাইওয়ে পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেন, বাসটি দ্রুতগতির ছিল। দুর্ঘটনার সময় আরেকটি দ্রুতগতির কোনো যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
সাহেদ সরদারের পরিবারের সদস্যরা জানান, জোয়ার সরদার, ইমান সরদার ও পারুলী বেগম অসুস্থ এক স্বজনকে দেখতে হাসপাতালে আসছিলেন। তাদের সঙ্গে রোগীর জন্য রান্না করা খাবারও ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে তারাই এখন হাসপাতালের মর্গে লাশ হয়ে আছেন।
এ সময় সাংবাদিকরা কাছে এগিয়ে গেলে তাদের কাছে বেপরোয়া লোকাল বাস নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মুকসুদপুর থেকে ফরিদপুরের রাস্তায় ড্রাইভারদের কারণে অনেককেই জীবন দিতে হচ্ছে। কিছু ড্রাইভার লাইসেন্স ছাড়া, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গাড়ি চালায়। এদের দেখভালের কেউ নেই। সেই কারণে আমার মা-ভাইয়ের প্রাণ গেছে। এরা তো বাসে উঠে কোনো পাপ করে নাই।’
সাহেদ সরদার বলেন, ‘এই ড্রাইভারদের ভুলের কারণে অলরেডি আমার পরিবারের দুজন মারা গেছে, আমার মা মৃত্যুর মুখে। আজ যদি ড্রাইভাররা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে গাড়ি চালাত, তাহলে আমার বাবা ও ভাই মারা যেত না। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’
ফায়ার সার্ভিস জানায়, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে ফরিদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে আসা ফারিয়া এন্টারপ্রাইজ নামে লোকাল বাসটি বাখু-া এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর সেটি সড়কের পাশে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে খাদে উল্টে পড়ে যায়। তাতে ঘটনাস্থলেই পাঁচ জনের মৃত্যু হয়। আহতদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই জনের মৃত্যু হয়।
খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্লাসহ প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা। এ সময় জেলা প্রশাসক জানান, এ দুর্ঘটনার কারণ জানতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাসকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন ও সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, এ ছাড়া নিহত প্রতিটি পরিবারকে প্রাথমিকভাবে দাফনের জন্য ২৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে বিআরটিএর মাধ্যমে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, জেলায় লরিচাপায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরও চার জন। গতকাল সকালে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের রামরাইল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ওসি মোজাফফর হোসেন জানান। নিহতরা হলেন- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের নজরদৌলত গ্রামের আমজাদ হোসেনের ছেলে তানভীর মিয়া (২৩) ও আশুগঞ্জ উপজেলার লালপুরের ইদন মিয়ার ছেলে রফিকুল ইসলাম (২৫)।
ওসি মোজাফফর বলেন, পাঁচ যাত্রী নিয়ে অটোরিকশাটি চিনাইর ট্রেনিং সেন্টারে যাচ্ছিল। পথে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি লরি অটোরিকশাকে চাপা দেয়। এ ঘটনায় চালকসহ ছয় জনই আহত হন। তাদের উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগে দুজন মারা যান।
এ ছাড়া ময়মনসিংহের ভালুকায় ট্রাক-মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মাহিম (২৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গতকাল বিকাল ৪টায় ভালুকার আঞ্চলিক সড়ক ভরাডোবা-ঘাটাইল সড়কের বান্দিয়া নামক স্থানে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত মাহিম পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়িয়া উপজেলার কান্দানিয়া গ্রামের সফি মিয়ার ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ থেকে মুড়িবোঝাই একটি ট্রাক (বগুড়া ভ-১১-১৮২৪) কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে উপজেলা বান্দিয়া এলাকার নাফকো ফার্মা লিমিটেডের সামনে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেল আরোহী মাহিম গুরুতর আহত হন। আহত মাহিমকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ভালুকা মডেল থানার ওসি শামছুল হুদা জানান, ট্রাক-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে এক যুবক নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় কবলিত ট্রাকটি জব্দ করা হলেও চালক পালিয়ে যায়।
গতকাল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় আনোয়ার হোসেন (২৬) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। এদিন বেলা ১২টার দিকে উপজেলার তারাব পৌরসভার বরাবো শরীফ মেলামাইন কারখানার সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আনোয়ার হোসেন গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ডুমুরগাছা এলাকার সাইজুল ইসলামের ছেলে। আনোয়ার হোসেন একটি কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান হিসেবে কাজ করতেন। শিমরাইল হাইওয়ে পুলিশ বক্সের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আবু নাঈম সিদ্দিকী বলেন, বেলা ১২টার দিকে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান আনোয়ার হোসেন গ্রাহকদের মালামাল ডেলিভারি করতে বরাবো এলাকায় যাচ্ছিলেন। এ সময় ট্রাক নয়তো কাভার্ডভ্যান মোটরসাইকেলটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই আনোয়ার হোসেন নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে
