মরাগুলো তাই হেঁটে হেঁটে যায় পৃথিবীর গায়...

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৫, ০৪:৪৩ এএম

সুমন সাজ্জাদের কবিতা

তালমুদের পাতা

গাজার শেষ বাড়িটিও ধসে গেছে। শিশুদের মাংসের ভেতর গেঁথে গেছে দুঃস্বপ্নের স্পিøন্টার। বেনিয়ামিন আজ খুব খুশি। মার্কিন পতাকা আজ উড়ন্ত জাগুয়ার। আকাশের কিনার ছুঁয়ে বেজে চলছে ট্রাম্পের ট্রাম্পেট। রক্তের সিঁড়িগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে জেরুজালেমের পথে। এইমাত্র মসজিদের গম্বুজ থেকে মুছে গেল আজানের ধ্বনি। ‘ডুমস ডে’, তুমি কতদূর? এত ধুলো, এত ছাই, বারুদের এত এত গন্ধ আমরা কোথায় রাখব?

আমি শুধু ভাবছি, কোথাও কি ভিজে উঠছে না তালমুদের এক টুকরো নির্জন পাতা?

অপেক্ষা

আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। মা কোথায়, জানি না। আমার একটা ছোট্ট ভাই ছিল। হাসপাতালের সিঁড়িতে শুয়ে শুয়ে ঠা-া গলায় একদিন সে বলেছিল, ‘মা, আমি খুব ক্লান্ত। আমি মরে যেতে চাই।’ সত্যি সত্যিই একদিন সে চলে গেল। হারমান পর্বতের শিখর থেকে নাজিল হলো দুর্ভাগ্যের ওহি।

আমার একটা ছোট্ট বোন ছিল; মখমলি স্বপ্নের সঙ্গে উড়ে গেছে তার দুটি চোখ। বারুদের আগুন-কুয়াশায় কোথায় সে গুম হয়ে গেছে, জানি না। আমি এখন আটকে আছি বিধ্বস্ত দালানের জরায়ুর ভেতর। নিশ্চয়ই আমাকেও খুঁজে পাবে কোনো ড্রোন, বন্দুক অথবা যুদ্ধবিমান। এই অন্তহীন কারবালায় আমি একটা নিঃসঙ্গ আলিফ আমি শুধু নিহত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি, একা একা...

চিনার বৃক্ষের পাতা

ভারত আমাদের বন্ধু; আমরা তাই কাশ্মীর নিয়ে কথা বলি না। আমরা বলি না কাশ্মীরের বরফগলা নদীতে ভেসে বেড়ায় রক্তফুল। শীতার্ত উপত্যকায় এখনো ধ্বনিত হয় হাব্বা খাতুনের আর্তনাদ। অবশ্য শ্রীনগরে আমরা বেড়াতে যাই; চমকে ওঠি কাশ্মীরি মেয়েদের আপেলের মতো মসৃণ গাল দেখে।

অথচ, হয়তো তিন দিন আগেও ছিল ব্ল্যাকআউটের মতো রাত, তরুণ ছেলেটির অবশিষ্ট শরীরের খোঁজে বেরিয়েছিলেন এক দুর্ভাগা পিতা। আজ বুকের ভেতর তিনি জড়িয়ে ধরেছেন এক জোড়া স্যান্ডেল আর দলা পাকানো মাংস। ডাল লেকের অতল স্তব্ধতায় তলিয়ে গেছে মৃত পৃথিবীর সমস্ত শোক। কে গাইবে আজ তুষারঢাকা রক্তের মর্সিয়া? গুলমার্গ অথবা পাহেলগাম?

জম্মু থেকে কাশ্মীর বেদনার মতো ঝরে যায় চিনার বৃক্ষের পাতা। পাতাগুলো সরিয়ে দ্যাখো চেকপোস্ট, কাঁটাতার, মৃত্যুর নীরব কনভয়। ভারত আমাদের বন্ধু, বন্ধুর হৃদয় থেকে সরিয়ে দাও পাতার প্রচ্ছদ।

জুয়েল মোস্তাফিজের কবিতা

প্যালেস্টাইন

আদর

ছোট কবরটি বড় কবরের আঙুল ধরে হাঁটছে...

গাজার শিশুরা এভাবেই বাবার আঙুল ধরে হাঁটে।

কবর

মৃত্যুর বাঁশিতে মোচড় দিয়ে উঠেছে কুমারীর বেণি...

তার ভারী বুকের নাম অন্ধকার। তার জীবন একটা

গুজব মাত্র।

জীবন

বুলেটের মতো সুগন্ধি শস্যদানা আর নাই।

লড়াইয়ের মতো নাই কোনো জোয়ান কবর...

মরাগুলো তাই হেঁটে হেঁটে যায়... হেঁটে হেঁটে যায়

পৃথিবীর গায়....

মাটির ডানা ভেঙে উড়বে কবর...

তুই আমার জন্মভূমি। আর আমারে মারিস নে মা।

কবর একটা ঘুমিয়ে পড়া পাখি, মাটির ডানা ভেঙে

উড়বে একদিন...

তোমরা কত কিলোমিটার হত্যা করেছ? আমরা কেন

মরে গিয়েও বেঁচে গেছি... জীবনের নুন খইফোটা খুন

বসন্তের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাইওয়ে...

আমরা কত কিলোমিটার বেঁচে আছি? কাঁধের

জোয়াল হুমড়ি খেয়েছে বুকে। ফাটা মাটির মটরশুঁটি

ফুটেছে মুখে... বাঁকা পানির গ্লাস ভেঙে চুরমার,...

তোমরা কত কিলোমিটার হত্যা করেছ? লাশের পাশে

দাঁড়িয়েছে লাশ, তোমাদের মানুষের পাশে মানুষ কই?

গাছের পাশে শুয়ে থাকা করাতখানা; খুনের পাশে

জেগে ওঠা ছুরিখানা কই?

জীবন গোলাকার লাড্ডু; কবরের ফুসফুসে গলে যায়

রোজ। খুন রক্ত মধুর দুনিয়া; নাই তার কিলোমিটার...

কাঁদতে ভুলে গেলে ফুলের কাছে মুখ থাকে না আর...

ব্যথার গুদামে ঘুমিয়ে পড়া পোকাটা কত

কিলোমিটার? মারো আর মেরে ফেল মানচিত্র।

একদিন মাটির ডানা ভেঙে উড়বে কবর... একটা

কবর কত কিলোমিটার?...

রিফাত আলআরিরের কবিতা

যদি আমাকে মরতেই হয়

ভাষান্তর : রাব্বী আহমেদ

যদি আমাকে মরতেই হয়,

তবে তোমাকে বেঁচে থাকতেই হবে

আমার গল্প বলবার জন্য,

আমার জিনিসপত্র বিক্রি করে

এক টুকরো কাপড়

আর কয়েকটা সুতো কেনার জন্য।

(সেটা হোক শাদা আর লম্বা লেজও যেন থাকে)

যাতে গাজার কোনো শিশু

আকাশের দিকে তাকিয়ে যখন

অপেক্ষা করে তার বাবার,

যে হঠাৎই মিশে গেছে আগুনে

কাউকে কিচ্ছু না বলে

না তার মাংসকে,

না নিজেকেও

সে দেখতে পায় ঘুড়িটা,

আমার ঘুড়ি, যেটা বানিয়েছিলে তুমি,

ওড়ে ওপরে

আর এক মুহূর্তের জন্য ভাবে,

কোনো ফেরেশতা বুঝি

ফিরিয়ে আনছে ভালোবাসা

যদি মরতেই হয় আমাকে

তবে সেই মৃত্যু নিয়ে আসুক আশা

হয়ে উঠুক এক উপাখ্যান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত