চীনা বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভি নির্মাতা বিওয়াইডি। বার্ষিক আয়ে ইলন মাস্কের ইভি নির্মাতা কোম্পানি প্রতিদ্বন্দ্বী টেসলাকে ছাড়িয়ে গেছে শেনজেনভিত্তিক কোম্পানিটি। ২০২৪ সালের বার্ষিক আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। বিওয়াইডি বলেছে, হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের আয় ২৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা টেসলার রাজস্ব ৯ হাজার ৭৭০ কোটি ডলারের চেয়ে বেশি।
টেসলার মডেল ৩-এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে কম দামের একটি গাড়িও চালু করেছে বিওয়াইডি, যা দীর্ঘদিন ধরে চীনে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ইভি ছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে টেসলা। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোতে শুল্ক আরোপের মুখে পড়েছে চীনা গাড়ি নির্মাতারা। গত বছর ১৭ লাখ ৬০ হাজার ইভি বিক্রি করেছে টেসলা, আর ১৭ লাখ ৫০ হাজার বিক্রি করেছে চীনা ইভি কোম্পানিটি। গত সপ্তাহে টেসলাকে টেক্কা দিতে নতুন মডেলের ইভির ঘোষণা দিয়েছে বিওয়াইডি। চীনে ‘কিন এল’ নামের নতুন মডেলের গাড়ির মূল্য ১১ লাখ ৯৮০০ ইউয়ান, যেখানে টেসলার মডেল ৩ গাড়ির সস্তার সংস্করণের দাম ২৩ লাখ ৫৫০০ ইউয়ান। গত সপ্তাহে নতুন এক ব্যাটারি চার্জিং প্রযুক্তি ঘোষণা করেছেন বিওয়াইডির প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং চুয়ানফু। তিনি বলেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে ইভি চার্জ করবে এই ব্যাটারি চার্জিং প্রযুক্তিটি। এ নতুন ব্যাটারি সিস্টেমের তুলনায় টেসলার সুপারচার্জার সিস্টেম ব্যবহার করে ইভি চার্জ করতে প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগে। ফেব্রুয়ারিতে বিওয়াইডি ঘোষণা করেছিল, চালকদের সহায়তা করার জন্য তাদের ‘গডস আই’ নামের উন্নত প্রযুক্তিটি কোম্পানিটির সব মডেলের গাড়িতে বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। অভিজ্ঞ ও প্রবীণ মার্কিন বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের সমর্থনপুষ্ট চীনা কোম্পানিটির শেয়ারের দাম এ বছর এখন পর্যন্ত বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি।
বিওয়াইডির উত্থান
চীনের বাণিজ্যিক মেগাসিটি শেনজেনে ১৯৯৫ সালে পথচলা শুরু হওয়া বিওয়াইডির। প্রচারবিমুখ এক প্রকৌশলী ওয়াং চনফুর হাত ধরে। ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী জীবনে লো প্রোফাইল বজায় রাখা এই উদ্যোক্তার নেতৃত্বে এখনো পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। মজার ব্যাপার হলো কোম্পানির নাম বিওয়াইডি হলেও এই নামের নাকি কোনো বিশেষ অর্থই নেই। অদ্ভুত নাম বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে বলেন, অন্যান্য স্টার্টআপের মধ্যে তার কোম্পানির নামকে আলাদাভাবে পরিচিত করাতে এমন নাম বেছে নিয়েছেন।
বর্তমানে চীনের শীর্ষ বৈদ্যুতিক যান বা ইভি নির্মাতা, যারা ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব জুড়ে বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি, বাস ও অন্যান্য যানবাহন রপ্তানি করে চলেছে। কোম্পানিটি টেসলার মতো শুধু সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়িই বিক্রি করে না, একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্লাগ ইন হাইব্রিড বা মিশ্র বৈদ্যুতিক গাড়িও তৈরি করে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করছে বিওয়াইডি। বিওয়াইডির সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেলের গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে কিন ও সং মডেলের গাড়িগুলো। এর মধ্যে কিন মডেলের গাড়িগুলো সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ও প্লাগ ইন হাইব্রিড এই দুই মডেলেই পাওয়া যায়। অন্যান্য চীনা প্রযুক্তির পণ্যের মতোই পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর তুলনায় বিওয়াইডির তৈরি করা গাড়িগুলো অনেকটাই সস্তা। চীনে বিওয়াইডির গাড়িগুলোর দাম শুরু হয় মাত্র ১০ হাজার ডলার থেকে। অথচ টেসলার সবচেয়ে সস্তা গাড়িগুলোর দামও শুরু হয় ৩২ হাজার ডলার থেকে। ১৯৯৭ সালে ওয়াং-এর প্রতিষ্ঠিত বিওয়াইডি একটি সাধারণ ক্ষুদ্র ওয়ার্কশপ থেকে মাঝারি আকৃতির মোবাইল ফোনের ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে সক্ষম হয়। যার বার্ষিক টার্নওভার ছিল ১০ কোটি ইউয়ান বা ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ২০০৩ সালে যখন তার সামনে শিয়ান নগরীতে অবস্থিত চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি গাড়ি নির্মাণ প্ল্যান্টকে সস্তায় কিনে নেওয়ার সুযোগ এলো, তখন আর কালবিলম্ব না করে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে সেই প্ল্যান্টকে কিনে নেন তিনি। যার ফলে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত বিওয়াইডির শেয়ারের দাম পড়ে যায় ২১ শতাংশ। অবশ্য এসব হতাশা স্পর্শ করেনি ওয়াংকে। নিজের সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অবিচল। শেয়ারের দাম পড়ে যাওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, আমি গাড়ি নির্মাণ করছি কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ির ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। থেকে বিনিয়োগ পেতে সমর্থ হন ওয়াং।২০০৮ সালে ওয়ারেন বাফেট বিওয়াইডিতে ২৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেন। পরের বছরই এর শেয়ারের দাম বেড়ে যায় ১ হাজার ৩৭০ শতাংশ। সে সময় নিজের প্রথম প্লাগ ইন হাইব্রিড মডেলের গাড়ি বাজারে ছাড়ে বিওয়াইডি। চীনের বাজারে ২০১৫ সাল থেকে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে থাকে বিওয়াইডি। সে সময় বিওয়াইডি চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী টেসলাকে অতিক্রম করে। মূলত দামের প্রতিযোগিতাতেই বিওয়াইডির কাছে ধরাশায়ী হয় টেসলা। কারণ চীনে টেসলার সবচেয়ে সস্তা গাড়ি মডেল থ্রির দামও শুরু হয় ৩২ হাজার ডলার থেকে, যার এক চার্জে ১৪০ মাইল প্রতি ঘণ্টায় চলার সক্ষমতা সর্বোচ্চ ২৭২ মাইল। অপরদিকে বিওয়াইডির সিগাল মডেলের ইভির দাম শুরু হয় মাত্র ১০ হাজার ডলার দিয়ে। প্রতি ঘণ্টায় ৮১ মাইল গতিতে যার চলার সক্ষমতা ২৫১ মাইল। টেসলার তিন ভাগের এক ভাগ দামে কেনা গাড়িতেই টেসলার সমান দূরত্ব অতিক্রম করতে পারেন একজন বিওয়াইডি ইভি ক্রেতা। ২০২০ সালে বিওয়াইডির সক্ষমতার পালে যোগ হয় আর একটি সফলতা। প্রথমবারের মতো লিথিয়াম আইরন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারি প্রস্তুত করতে শুরু করে বিওয়াইডি। ব্লেড ব্যাটারি হিসেবে পরিচিত এই এলএফপি ব্যাটারি শুধু বিওয়াইডির নিজস্ব গাড়িতেই ব্যবহৃত হয় না। এমনকি টয়োটা ও টেসলার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোও নিজেদের ব্র্যান্ডের ইভিতে ব্যবহার করে এই ব্লেড ব্যাটারি।
