বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। এর ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী টানা কয়েক মাস ধরে ঢাকার বাতাস ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে রয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় আইকিউএয়ার প্রকাশিত তথ্য মতে, ঢাকার একিউআই স্কোর ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণ একটি নীরব ঘাতক, যা শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ ব্যক্তি এবং অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণও প্রাণঘাতী হতে পারে। জন্মের প্রথম মাসেই প্রায় পাঁচ লাখ শিশু বিশ্বজুড়ে এর কারণে প্রাণ হারায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বছরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বায়ুদূষণজনিত রোগে মারা যায়। শুধু বাংলাদেশেই এই সংখ্যা বছরে ৮৮ হাজার।
বিশ্বব্যাপী গড় আয়ু কমিয়ে দেওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বায়ুদূষণ। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর গবেষণা বলছে, বাংলাদেশিদের গড় আয়ু ৭ বছর এবং রাজধানীবাসীর ৮ বছর কমে গেছে বায়ুদূষণের কারণে।
গবেষণা মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের ৩০% আসে নির্মাণকাজ থেকে। খোলা ট্রাকে বালি, সিমেন্ট পরিবহন, অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটা (২৯%), যানবাহনের ধোঁয়া (১৫%) ও বর্জ্য পোড়ানো (৮%) সব মিলিয়ে রাজধানীর বাতাসে বিষাক্ত বস্তুকণার ঘনত্ব দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া বায়ুতে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন, সিসা, সালফারসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক কণার উপস্থিতি বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি।
বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে দূষণ রোধে কঠোর বিধান থাকলেও তার বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ। ইটভাটা ও যানবাহনের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকলেও আইনের প্রয়োগ সীমিত। ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ থাকলেও তার কার্যকারিতা তেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে নয়, দরকার সমন্বিত ও বাস্তবমুখী জাতীয় পরিকল্পনা।
কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, ঢাকায় হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট, হাইপারটেনশন, এমনকি বন্ধ্যাত্বের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বায়ুদূষণ। একটি মানুষের মেজাজ থেকে শুরু করে প্রজনন ক্ষমতা পর্যন্ত প্রভাবিত হচ্ছে।
আরেক বিশ্লেষক ও পরিবেশবিদ ড. দেলোয়ার হোসেন জানান, দূষণের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে অপরিণত ও কম ওজনের শিশু। প্রতি বছর প্রায় ২৬৬ মিলিয়ন কর্মদিবস হারিয়ে যাচ্ছে এর ফলে, যা অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতি।
পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে মাস্ক পরার পরামর্শ ও সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীকে ঘরের বাইরে কম বের হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ধরিত্রী কুমার সরকার স্বীকার করেছেন, দেশে একাধিক জ্বালানি নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।
এর থেকে বাঁচার জন্য অধিকাংশ বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, কঠোরভাবে নির্মাণসাইটে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব যানবাহন প্রবর্তন, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ, গাছ লাগানো এবং সবুজায়ন, ক্লিন এনার্জি ও দূষণহ্রাস প্রযুক্তির ব্যবহার, ঢাকার বাতাস আবার শুদ্ধ হতে পারে প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়ন। জনসচেতনতা ও সরকারি সদিচ্ছা মিলেই বাঁচাতে পারে ঢাকাবাসীর নিঃশ্বাস।
