১৮% মা সরকারি হাসপাতালে ৮২% যান বেসরকারিতে

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:৩২ এএম

দেশে এখনো ১৮ শতাংশ মায়ের সরকারি হাসপাতালে ও ৮২ শতাংশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা নেওয়াকে নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য বড় বাধা বলে মনে করছেন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ জন্ম, গর্ভবতী মায়ের যথাযথ যত্ন এবং স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য ও সমন্বিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

গতকাল রবিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় এই আহ্বান জানানো হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনায় একসময় বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা ভালো ছিল। কিন্তু সেই উন্নতি মাঝপথে থেমে গেছে। এখন ভালোর দিকে না গিয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাল্যবিয়ে কমছে না, বাড়ছে। বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে দেখি ছোট ছোট মেয়ে, তারা মা হয়েছেন। তারা নিজেই নিজের যত্ন করতে পারে না, সে বাচ্চার যত্ন কীভাবে নেবে। এটা অপরাধ। আমরা দেখছি, কিন্তু কিছু বলছি না, প্রতিরোধ করছি না।’

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। জন্মের সময় এবং নবজাতক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা শিশুর সুস্থতা ও বিকাশ নিশ্চিত করতে পারব। এজন্য সরকার গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব, নবজাতকের যত্ন এবং মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতকরণে কাজ করে যাচ্ছে। তবে শুধু সরকার নয় এই লক্ষ্য অর্জনে জনসচেতনতা, পরিবার ও সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।’

এ সময় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘নিরাপদ জন্মের জন্য আমাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে, গর্ভবতী মায়েদের যথাযথ যত্ন নিতে হবে এবং স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য ও সমন্বিত করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে আনতে গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সঠিক যত্ন নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর মাধ্যমে প্রসব করানো, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সুবিধা সম্প্রসারণ, শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, টিকাদান ও স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রচার বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

সরকারি হাসপাতালে যান ১৮% মা : স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও দেশের সব প্রসূতির দায়িত্ব রাষ্ট্র নিতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, নিরাপদ মাতৃত্বকে নিশ্চিত করা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। নিরাপদ মাতৃত্ব একজন নাগরিকের অধিকার।

এ সময় বিশেষ সহকারী বলেন, দেশে ১৮ শতাংশ মা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় যান ৮২ শতাংশ মানুষ। এটা অনেক বড় পার্থক্য। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের অবদানের বিরাট পার্থক্য দুর্ভাগ্যজনক।

অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও একটি রাষ্ট্র তার সব মায়ের সন্তান জন্মদানের দায়িত্ব পালন করতে পারে না, এটা বড় ধরনের ব্যর্থতা। অবশ্যই বেসরকারি খাতের অবদান স্বীকার করতে হবে, কিন্তু এটা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে সব দায়িত্ব নেওয়ার এবং বেসরকারি সংস্থা বা অন্যদেরও যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান এই বিশেষ সহকারী। তিনি বলেন, ‘১৮ : ৮২, এটা অবশ্যই একটা অগ্রহণযোগ্য সংখ্যা। এটা নির্দেশ করে রাষ্ট্র মায়েদের প্রতি দায়িত্ব পালনে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমরা অন্তর্বর্তী সরকার অল্প সময়ের জন্য থাকব। কিন্তু আগামীতে যারা আসবেন, তাদের সামনে এটাকে নীতি হিসেবে আনতে চাই।’

৭ হাজারের বেশি সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টি : অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রথমবারের মতো ৭ হাজারের বেশি সুপার নিউমারারি (অতিরিক্ত) পদ সৃষ্টি করেছে সরকার। এসব পদে শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স ও বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জনবল সংকটই এখন দেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই পদসৃজন সেই সংকট মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই অতিরিক্ত পদগুলোয় শুধু চিকিৎসকই নন, শিক্ষক, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরাও যুক্ত থাকবেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জনবল। শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান সব পর্যায়েই ঘাটতি রয়েছে। জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবা কার্যক্রমে এ সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

মহাপরিচালক জানান, স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল পদায়ন ও নজরদারি চালু করা হয়েছে। এখন কে, কোথায় নিয়োগ পেলেন, কোথায় কাজ করছেন সবকিছুই অনলাইনে রেকর্ড থাকবে। এতে করে পোস্টিংয়ে অনিয়ম কমবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব ডা. মো. সারোয়ার বারী, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাজমুল হোসেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফি আহমেদ (এনডিসি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত