৮ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি সীমিত আয়ের মানুষের জন্য নেওয়া ‘ফ্ল্যাট প্রকল্প’। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) প্রকল্পের কাজ শুরু করেছিল। এরইমধ্যে নির্মাণাধীন ভবনের রডে মরিচা ধরে গেছে। এরপরও কাজ শেষ হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে ভবনের মান ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমিত আয়ের মানুষের আবাসনের জন্য চট্টগ্রামের হালিশহর জি ব্লক এবং ফিরোজশাহ কলোনিতে ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর পত্রিকায় ঠিকাদার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জাগৃক। এই প্রকল্পের আওতায় ১৪ তলাবিশিষ্ট ৬টি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে সর্বমোট ৩১২টি ফ্ল্যাট রয়েছে। তাছাড়া ৩ তলাবিশিষ্ট ১টি ডিপার্টমেন্টাল শপ ভবন, ২ তলাবিশিষ্ট ১টি হেলথ ক্লাব ভবন এবং ৪ তলা বিশিষ্ট ১টি মসজিদ ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে এ প্রকল্পে। তবে এখন পর্যন্ত এসব কাজ শুরু হয়নি।
২০১৭ সালের ২ আগস্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জিকেবিপিএল (জিকে বিল্ডার্স) এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। ২০২১ সালের ১ আগস্ট কাজের সমাপ্তির সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে ২০১৮ সালের আগস্টে কাজ শুরু করে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প পর্যালোচনায় বলা হয়, ৬টি ভবনের কাজ আংশিকভাবে নির্মিত হওয়ার পর এখন কাজ পুরোপুরিভাবে বন্ধ রয়েছে। ভ‚মি উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বৈদ্যুতীকরণ কাজ এখনো শুরু করা হয়নি। কাজের আর্থিক অগ্রগতি ১৮ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ২২ শতাংশ।
এদিকে যুবলীগ নেতা বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্স কাজটি নিয়ে গড়িমসি করার অভিযোগে কার্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে রিট করলে উচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ দেয়। যে কারণে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারছেন না সংস্থাটি। এরমধ্যে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জটিলতা নিরসনের কাজটি আরও ঝিমিয়ে পড়ে।
সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনেও এমন তথ্য উঠে এসেছে। সরেজমিন পরিদর্শন করে কর্মকর্তারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নির্মাণাধীন ভবনের ৫০ শতাংশ কলামের রিইনফোর্সমেন্টের মরিচা প্রতিরোধী ব্যবস্থা নিয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশে মরিচা প্রতিরোধক দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে ৪, ১৭, ১৮, ও ১৯ নম্বর ভবনের নির্মাণাধীন পিলারে মরিচা ধরে যাওয়ার ছবি যুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে প্রতিরোধক দেওয়ায় ৭ নম্বর ভবনের রডগুলোতে যে মরিচা ধরেনি সেই ছবিও দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের ৬টি ভবনের মধ্যে দুইটি ভবনের (ভবন নং ১৮ ও ১৯) আংশিক নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। উভয় ভবনেরই ৭ম তলা পর্যন্ত নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৪টি ভবনের মধ্যে ৩টির গ্রাউন্ড ফ্লোর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। আর ১টি ভবনের শুধু প্রিকাস্ট পাইল ড্রাইভের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণাধীন ভবনের কলামের রিইনফোর্সমেন্টে মরিচা ধরেছে। এর ফলে রিইনফোর্সমেন্টের শক্তিমাত্রা কমে যাচ্ছে। পাইলের রিইনফোর্সমেন্ট দৃশ্যমান অবস্থায় আছে। এতেও মরিচা ধরে শক্তিমাত্রা কমে যাচ্ছে।
প্রিকাস্ট পাইলের মাথায় রিইনফোর্সমেন্ট দৃশ্যমান রয়েছে। খোলা আবহাওয়ায় রিইনফোর্সমেন্ট এভাবে দৃশ্যমান থাকলে মরিচা পড়ে সক্ষমতা কমে যেতে পারে। প্রিকাস্ট পাইল ড্রাইভের কাজ শেষ। অন্য আর কোনো কাজের অগ্রগতি নেই। নির্মাণকৃত ভবনগুলোতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। কোনো ভবন নির্মাণে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো প্রটোকলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বেজমেন্টে মশার কারখানা : দীর্ঘদিন নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় নির্মাণাধীন ভবনগুলোর বেজমেন্টে পানি জমে আছে। ময়লা আবর্জনায় এসব ভবনের বেজমেন্ট মশার বংশ বিস্তারের কারখানায় পরিণত হয়েছে। গত বছর পরিকল্পনা কমিশনের পরিদর্শনের সময়ও তারা বেজমেন্টে মশার লার্ভা দেখতে পান। ১৭ নম্বর ভবনের বেজমেন্টের ছবি যুক্ত করে বলা হয় বেজমেন্টের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে পানি পানি জমে আছে। এতে মশা বংশ বিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে।
যত জটিলতা : আইএমইডির প্রকল্প পর্যালোচনায় বলা হয়, কাজ শুরুর পর কোভিড ১৯-এর প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ঠিকাদার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেন। নির্মাণ শ্রমিক ও প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টরা নিজ নিজ এলাকায় চলে যান। এতে করে কাজ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে কোভিড১৯ উত্তরকালীন কাজ শুরু করার জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দিলেও ঠিকাদার কাজ মন্থর গতিতে চালাতে থাকে। নির্মাণ কাজে ঠিকাদারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফলে চুক্তি বাতিলের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ২৮ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত জবাব প্রদান করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়। চুক্তি বাতিলের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ২৮ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত জবাব প্রদান করার জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কেন সময় প্রদান করল এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প অফিস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
উল্লেখ্য, পিপিআর ২০০৮ এ ক্রয়সংক্রান্ত নীতিমালায় নির্দিষ্ট সময়সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নির্বাহী প্রকৌশলীর পত্রের প্রেক্ষিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করে জবাব প্রদান করেন। একইসঙ্গে ঠিকাদার নির্বাহী প্রকৌশলীর দেওয়া চিঠির বিপরীতে ২০১৩ সালের ১৯ জানুয়ারি উচ্চ আদালতে মামলা করেন। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত কোনো শুনানি হয়নি। প্রকল্প অফিস জানায়, আইনজীবীর ফি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে মামলাটি ধীরগতিতে চলছে।
অন্যদিকে আইএমইডির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বেশকিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী কাজটি দ্রুত সমাপ্তির স্বার্থে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। সুপারিশ অনুযায়ী মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করে পুনরায় ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা প্রয়োজন। কাজ শুরুর পর মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আবাসন সমস্যা সমাধানে কাজ আরও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করে ফ্ল্যাটগুলো বসবাসের উপযোগী করা প্রয়োজন। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের আবাসন সমস্যা সমাধানে প্রকল্পের নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটগুলোর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে যথাযথভাবে বরাদ্দ দেওয়া হলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ হতে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। তবে বিল্ডিংগুলো আবাসিক ব্যতীত অন্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে না এমন কোনো পরিকল্পনা পায়নি আইএমইডি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৮ বছরে নির্মাণ সামাগ্রীসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় আগের আইনি জটিলতা নিরসন করে আবার কাজ শুরু করলেও ঠিকাদার নিয়োগে সমস্যায় পড়তে হবে। কেননা ৮ বছর আগের মূল্যে নতুন করে কাজ করতে চাইবে না কোনো ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের দাম বাড়িয়ে দিলে নিম্ন আয়ের মানুষদের ওপর প্রভাব পড়বে। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সোহেল সরকারকে একাধিকবার ফোন দিয়ে এসএমএস করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. নুরুল বাসির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দ্রুত সময়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। প্রকল্পের আইনি জটিলতাসহ অন্য বিষয়গুলো সামাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
