ছেলের লাশ দাফনের জায়গাও নেই মোখলেছুরের

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৩:৪৮ এএম

‘আমার তিনটা পুত। এর মধ্যে সাইফুলডা বড়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পুতের জন্য আমি সাত প্লেট ভাত আনছি হোটেল থাইক্কা। তখন পুতে কইলো, আব্বা, কসবা স্টেশনে যাইয়াম, বোতল টোকানোর লাইগ্যা। আমি কইছিলাম, পুত, তুই ভাত খাইয়া যা। পুতে আমার কথা না হুইন্যা চইল্যা গেল। রাইতে ফিরল না... আর ফিরলই না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলেন ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত সাইফুলের বাবা মোখলেছুর রহমান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাইফুলের বাবা কুমিল্লা রেলস্টেশনের এক কোনায় বসে ছেলের মরদেহ জড়িয়ে ধরে আহাজারি করছেন। কান্নায় ডুবেছে তার কণ্ঠ, চোখের কোনায় জমে থাকা জল ঝরছে টপ টপ করে। তার পাশে পড়ে আছে সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো মরদেহ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাইফুল ইসলামের বয়স ১৮। জীবনের শুরুতেই জীবিকার তাড়নায় নেমেছিলেন রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। যেখান থেকে প্রতিদিন শুরু হতো তার বোতল কুড়িয়ে বেড়ানোর জীবন। সেই পথেই থেমে গেল তার জীবন।

গতকাল বুধবার ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মাধবপুর এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয় কিশোর-তরুণ তিন বন্ধুর।  নিহতদের বয়স ১৬-১৮ বছরের মধ্যে।

সাইফুলের পিতা মোখলেছুর আরও বলেন, তিনি দেবিদ্বার উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। ভিটেমাটি না থাকায় স্ত্রী-সন্তানসহ কুমিল্লা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই বসবাস করেন। ছেলের লাশ দাফনের জায়গাও নাই। রেলওয়ে পুলিশরে কইছি, লাশটা যেন সরকারিভাবে দাফন করে।

এদিকে এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, রেল রাস্তার পশ্চিম লাইনে ৩টি মরদেহ খন্ড-বিখন্ড হয়ে পড়ে ছিল। একজনের মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে পড়ে আছে, আরেকজনের কোমরের নিচ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার বিষয়ে সোহেল নামে এক যুবক বলেন, লোক মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় তিনি ২ যুবককে জীবিত দেখতে পান। তাদের পা ও হাত কাটা ছিল। তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় আহত দুই যুবক বাঁচানোর জন্য আকুতি করছিলেন ও পানি চাচ্ছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরই একে একে দুই যুবক মারা যান। তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলের ঠিক ৫০ গজ দূরে রেল লাইনের পাশে একটি পরিত্যক্ত ঘর রয়েছে। এই ঘরটিতে প্রতিনিয়ত মাদক সেবন করত বখাটেরা। নিহত এই যুবকদের এই এলাকায় কখনো দেখা যায়নি।

দুর্ঘটনার বিষয়ে কুমিল্লা রেলওয়ে পুলিশ বলছে, তারা সবাই সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির পরিচয়ে ‘টোকাই’। বিভিন্ন স্টেশনে ঘুরে ঘুরে কুড়াতেন বোতল ও পরিত্যক্ত সামগ্রী।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে একজন সাইফুল ইসলাম। তিনি কুমিল্লা রেলস্টেশনে মা-বাবার সঙ্গে বসবাস করতেন। মা-বাবা উভয়েই পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বোতল কুড়িয়ে সংসার চালান। আরেকজনের নাম জানা গেছে তুহিন। তিনিও ছিলেন  ‘টোকাই’। আর তৃতীয় জনের নাম-পরিচয় এখনো অজ্ঞাত। এতে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তারা তিনজনই বন্ধু।

পুলিশ আরও জানায়, নিহতরা কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনে করে আখাউড়া যাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে। তাদের সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েকজন পথশিশু। তাদের একজন রাজীব হোসেন জানান, ‘গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সাইফুল, তুহিন আর একজন আমাগো কইছিল, চলো আখাউড়া যাই। আমি আর ইউসুফ যাইনি। তারা বলছিল বিকালে ফিরবে। কিন্তু আর ফেরে নাই।’

রসুলপুর (সদর) স্টেশন মাস্টার প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী বলেন, মাধবপুর এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে কোন ট্রেনে কাটা পড়েছে সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অনেকগুলো আন্তঃনগর ও মালবাহী ট্রেন যাতায়াত করে। তবে ভোরের দিকের কোনো ট্রেনে কাটা পড়তে পারে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক সোহেল মোল্লা বলেন, ‘তাদের মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হয়ত মাদক সেবন করে অসাবধানতায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয়ের দুজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পরিচয় না মিললে তাদের লাশ দাফনের দায়িত্ব নিতে পারে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম।’

এ বিষয়ে বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আজিজুল হক জানান, ভোরে খবর পেয়ে তিনি সর্বপ্রথম ঘটনাস্থলে আসেন এবং রেললাইনের ওপর খ--বিখ- মরদেহগুলো দেখতে পান। পরবর্তীতে তিনি রেলওয়ে পুলিশকে খবর দেন। রেলওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত