ব্যাটারিচালিত রিকশা এ দেশে চলা শুরু করার পর কয়েক দফা সরকার পরিবর্তন হয়েছে। দুটো রাজনৈতিক দলীয় সরকার এবং দুটো অরাজনৈতিক নির্দলীয় সরকার এর মধ্যে দেশের শাসন ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু কেউ এই বাহনের সবচেয়ে গুরুতর পাঁচটি ত্রুটি নিয়ে সামান্যতম কোনো কাজ করার প্রয়োজন মনে করেননি। যখনই এই বাহনের ত্রুটি নিয়ে বা সমস্যা নিয়ে কথা ওঠে, সরকার তখন সরাসরি বাহনটিকে নিষিদ্ধ করে দেয়। এখন যেমন পেডেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের মধ্যে প্রায়ই কোথাও না কোথাও সংঘর্ষ হচ্ছে এই বাহন নিষিদ্ধ নাকি বৈধ, তা নিয়ে সরকারও অজানা কারণে খোলাসা করছে না।
ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করে দেওয়াটা কোনো প্রকৃত সমাধান না। প্যাডেল রিকশা এমনিতেই অমানবিক। দুজন বা তিনজন যাত্রী পেছনে বসে থাকবে আর একজন তার দৈহিক শক্তিতে প্যাডেল চালিয়ে ভারী রিকশাটা টেনে নিয়ে যাবে এটা পাশবিক, বর্বরতা। সেই ক্রীতদাসের সময়কাল মনে পড়ে যায়। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশা এই বর্বরতা অনেকটাই দূর করতে পারে। রিকশায় ইঞ্জিন বসানো এবং জ্বালানির সাহায্যে চালানোটা সময়ের দাবি হিসেবে অবশ্যম্ভাবী ছিল। বিশে^র অনেক দেশেই ব্যাটারিচালিত রিকশা চলমান রয়েছে এবং তা যেমন শ্রমবান্ধব, তেমনি পরিবেশবান্ধব। ফলে রিকশায় যন্ত্র ও (রূপান্তরযোগ্য) জ্বালানি ব্যবহার করাটা সমস্যা নয়। সমস্যা অন্যখানে।
এই বাহনের সমস্যা মূলত পাঁচটি
এক. প্রচলিত প্রযুক্তির রিকশায় ইঞ্জিন বসানো ও ব্যাটারির সাহায্যে চালানো। যে রিকশা প্যাডেলের মাধ্যমে চালানোর জন্য তৈরি করা হয়, সেটা প্যাডেলের মাধ্যমে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ গতিতেই চলার যোগ্য। ইঞ্জিন তাকে অনেক বেশি গতি দেয়, স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। এই গতিতে ছোটার জন্য এই বাহনের নকশা উপযোগী নয়। ব্যাটারিচালিত কিছু রিকশা দেখা যায় আমাদের দেশে, যেগুলোর চাকা ছোট, ডিজাইনও আলাদা। ওই বাহনগুলো ঠিক আছে। কিন্তু বড় চাকার রিকশাকে রূপান্তর করে ছোট চাকার রিকশার সমান গতি দিয়ে দিলেই তো হবে না। এই গতিতে চলমান একটা রিকশা বাঁক নেওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ প্রায় শূন্য হয়ে যায়। এ জন্য প্রায়ই এই রিকশাগুলো ডানে-বামে ঘোরার সময় উল্টে যায়।
দুই. ব্রেকিং সিস্টেম। প্যাডেল রিকশার ব্রেক মাত্র একটা, সামনের চাকায়, সেটাও সাধারণ সাইকেলের ব্রেকের মতো, খুবই দুর্বল। জ্যামের রাস্তায় যারা নিয়মিত রিকশায় যাতায়াত করেন, তারা জানেন, গায়ে গা লাগানো রিকশাগুলো যখন এক সারিতে খুবই ধীরে চলতে থাকে, তখন সামনের রিকশা ব্রেক চাপলেই পেছনের রিকশাটা পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। তখন ব্রেক ধরেও একে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। তো, অল্প গতি থাকতেই এই রিকশা সঠিকভাবে ব্রেক ধরতে পারে না, তাহলে এই বাহনের সর্বোচ্চ গতিরও দ্বিগুণ গতিতে ছোটার সময় যদি ইমার্জেন্সি ব্রেক ধরার দরকার পড়ে, তখন এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?
তিন. চালকদের দক্ষতার দিক। যেকোনো বাহনে যখনই ইঞ্জিন বসে যায়, তখন সেটা চালানোর জন্য ড্রাইভারের প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারিক ও লিখিত পরীক্ষা দিয়ে প্রাপ্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে রিকশাচালকদের প্রশিক্ষণের কোনো বালাই নেই, ড্রাইভিং লাইসেন্স তো অবান্তর প্রশ্ন। ফলে হাজার হাজার যান্ত্রিক বাহন প্রায় ৩০-৪০ কিলোমিটার গতিতে রাস্তায় ছুটছে প্রশিক্ষণবিহীন চালকদের নিয়ন্ত্রণে। এ রকম একটা ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা আমরা প্রায় দুই দশক ধরে দেশে চলতে দিচ্ছি।
চার. জ্বালানি। রিচার্জেবল ব্যাটারিচালিত এই বাহন একেকবার ফুল চার্জড হতে প্রচুর বিদ্যুৎ টানে। ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এই বাহনগুলো প্রতিবার রিচার্জ করার জন্য ‘গ্যারেজে’ যে টাকার বিল প্রদান করেন, সেটা রিকশার দৈনিক আয়ের তুলনায় নামমাত্র। মাত্র ১৫ থেকে ২০ টাকায় একেকটি বাহন ফুল চার্জ দিয়ে দেওয়া যাচ্ছে, যদিও এগুলো যতটা বিদ্যুৎ খরচ করে এবং তা বাণিজ্যিক বিতরণ থেকে, তাতে করে বিল এর দ্বিগুণ বা তিন-চারগুণ হওয়া উচিত। গ্যারেজগুলো এত কম টাকায় তাদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে কীভাবে? সরকার কি কখনো খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছে যে, গ্যারেজগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বৈধ কি না? তারা বৈধ উপায়ে বাণিজ্যিক মিটার ব্যবহার করে নিয়মিত বিল-পে করছে কি না? ওখানে কোনো যোগসাজশ নেই তো? দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের একটা বড় অংশ খরচ হচ্ছে রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে। সেই বিদ্যুতের দাম সরকার ঠিকমতো পাচ্ছে?
পাঁচ. চালকের দৈহিক সামর্থ্য। ঢাকাসহ সারা দেশে অসংখ্য ব্যাটারিচালিত রিকশার গায়ে লেখা থাকে ‘প্রতিবন্ধী দ্বারা চালিত’। সেসব বাহনের হাতল থেকে ক্রাচও ঝুলতে দেখা যায়। আমি একাধিকবার এ রকম ক্রাচওয়ালা ‘প্রতিবন্ধী চালক’কে রিকশা থেকে স্বাভাবিকভাবে নেমে এসে হেঁটে যেতে দেখেছি। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, তারা এই প্রতিবন্ধী সাজেন মূলত বড় রাস্তা পারাপারের জন্য। মেইন রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিষেধ, কিন্তু রিকশার গায়ে প্রতিবন্ধী লেখা এবং হ্যান্ডেল থেকে ক্রাচ ঝুলতে দেখলে ট্রাফিক তাদের আর আটকায় না। ... প্রথমত, এটা প্রতারণা। দ্বিতীয়ত, যারা প্রকৃতই প্রতিবন্ধী, তাদের জন্যও এ রকম একটা গতিশীল বাহন চালানো খুবই বিপজ্জনক। দুই হাত, দুই পা, স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি নিয়ে দৈহিকভাবে সমর্থ লোকেরাই যে বাহন চালাতে হিমশিম, সেটা একজন অসমর্থ ব্যক্তি কীভাবে চালাবেন, যার একটা পা বা একটা হাত নেই, বা যার স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি নেই? ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ব্যক্তির জীবিকায়ন বা পুনর্বাসনের জন্য অন্য কোনো কাজের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, মানুষের জীবন নিয়ে রাস্তা পারাপারের ঝুঁকিপূর্ণ কাজটা তাদের জন্য উপযোগী নয়। বাতিল করে দেওয়াটা তো কোনো সমস্যা নয়। বাতিল করে দেওয়ার আগে ভেবে দেখুন, এই বাহনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কত? সারা দেশে কয়েক লাখ যন্ত্রচালিত রিকশা চলে। এই রিকশাচালকদের পরিবার যেমন রিকশার আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি এই বাহন যে যাত্রীসেবা দিয়ে আসছে, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। রাতারাতি দেশ থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করে দিলে স্বল্প দূরত্বের পরিবহন ব্যবস্থায়, একটা চরম অরাজকতার সৃষ্টি হবে। শহরে কমবেশি পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে ও মফস্বলে ১০-১২ কিলোমিটার দূরত্বে যাতায়াতের জন্য এই বাহন যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি আরামদায়ক। এগুলো না থাকলে নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ ছোটখাটো দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কতটা বিড়ম্বনায় পড়বেন তা কি সরকারের নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখেছেন?
আরেকটা ব্যাপার। প্রায়ই দেখা যায়, একটা বাহন নিষিদ্ধ করার পর সেই বাহন উচ্ছেদের জন্য কিছুদিন মোবাইল কোর্ট বা অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এমনও দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তা থেকে জব্দ করে রাস্তাতেই নিলাম করে বিক্রি করছে মোবাইল কোর্ট। কে কিনল সেই রিকশা? কেন কিনল? রিকশা তো আর ট্রাক্টর বা পাওয়ারটিলারের মতো জমি চাষের কাজে ব্যবহার করা যায় না। অতএব, যারা কিনলেন, তারা তো রাস্তাতেই চালাবেন। তাহলে আগে যারা চালাচ্ছিলেন, সেই ‘অবৈধ’ চালকদের থেকে ‘নিলামে কেনা’ চালকরা বিশেষ কোন যোগ্যতার বলে বৈধ হলেন? পত্রিকার রিপোর্টে কোথাও সেটা লেখা ছিল না। ধরে নিলাম, তারা ঢাকা সিটির ভেতরে বা মেইন রোডে বা মহাসড়কে রিকশাগুলো চালাবেন না। যে বাহনকে আপনি নিষিদ্ধ বিবেচনায় জব্দ করছেন, তা সব রাস্তার জন্যই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। অন্যথায়, নিলামে কেনা বৈধ চালকরা যে রাস্তায় চালানোর জন্য রিকশাগুলো কিনলেন, সেই রাস্তায় তো এর পুরনো চালকরাও চালাতে পারতেন। তাদের সে মতো নির্দেশ দিয়ে জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়াই যৌক্তিক হতো না? অতএব, এই রিকশা থাকুক। কিন্তু সঠিক নিয়ম মেনে এগুলো রাস্তায় চলুক। এর জন্য সরকারকে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে :
১. প্যাডেল রিকশাকে ব্যাটারি ও মোটর বসিয়ে ইঞ্জিনচালিত রিকশায় রূপান্তর করা যাবে না। যেগুলো এভাবে রূপান্তরিত হয়েছে, সেগুলোকে অবিলম্বে ব্যাটারি ও ইঞ্জিন সরিয়ে আবার প্যাডেলচালিত করতে হবে। ২. সঠিক নকশায় প্রস্তুত করা প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইককে ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে হবে। এর হর্ন, ব্রেক, হেডলাইট, টার্ন লাইট, ব্রেকলাইট ইত্যাদি ঠিকঠাক কাজ করছে, এটা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. ইজিবাইকের চালককে পরীক্ষা দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হবে। লাইসেন্স হতে হবে সিএনজি-চালিত থ্রি-হুইলারের লাইসেন্সের অনুরূপ, পরীক্ষাও হতে হবে থ্রি-হুইলারের লাইসেন্সের পরীক্ষার অনুরূপ। ৪. ইজিবাইকের চার্জস্টেশন বা গ্যারেজগুলোকে কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। এগুলো যেন কোনোভাবেই অবৈধ সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে না পারে এবং অতি-অবশ্যই নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল হালনাগাদ করে। ৫. দৈহিকভাবে আংশিক বা পুরোপুরি অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো নিষিদ্ধ করতে হবে। ৬. ব্যাটারিচালিত রিকশা বা এর যন্ত্রাংশ আমদানির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আবশ্যক। কারা আমদানি করছে, কোন মানের যন্ত্রাদি আমদানি হচ্ছে, সেসব যন্ত্রাংশ দেশেই প্রস্তুত করা সম্ভব কি না এসব খোঁজ নিন। সম্ভব হলে এই বাহন শতভাগ দেশে তৈরির নির্দেশ দিন। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাবে। ৭. ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইক চালকদের ট্রাফিক আইনের আওতায় আনতে হবে। আইন লঙ্ঘনে তাদের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তথা মামলা ও জরিমানার বিধান করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে নতুন আইন/নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা থ্রি-হুইলারের জন্য প্রযোজ্য আইনেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলার জামানত হিসেবে জব্দ রাখার মতো ডকুমেন্ট (ড্রাইভিং লাইসেন্স, রিকশার মালিকানা-সংক্রান্ত দলিল, ফিটনেস সার্টিফিকেট, বীমা ইত্যাদি) যতদিন পর্যন্ত ইস্যু করা না যাচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত জব্দ ছাড়াই তাদের জরিমানা করার বিধান করতে হবে। এর জন্য জরিমানা আদায়ের ডিজিটাল মেশিন সার্জেন্টের কাছে থাকতে হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা আদায় হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
পায়ে ঘা হলেই পা কেটে ফেলার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং সেই ঘা মলম বা ওষুধ দিয়ে সারানো যাবে এমন ব্যবস্থা নিন। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে যেকোনো ক্ষতই সারানো যায়। কিন্তু ক্ষতটাকে ক্ষত বলেই যদি স্বীকার না করেন, তাহলে কিন্তু সত্যিই একদিন পা কেটে ফেলার মতো গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। আর এভাবে আজ পা কেটে, কাল হাত কেটেই যদি সমস্যার সমাধান করতে পারবেন বলে ভাবেন, তাহলে অচিরেই কিন্তু হাত পা চোখ কান সব হারিয়ে একটা নিরেট জড়বস্তু হয়ে পড়ে থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভেবে দেখবেন কি?
লেখক :কবি, প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক