চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ

২৭ দিন জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছুই পায়নি পুলিশ

আপডেট : ০৪ মে ২০২৫, ০৫:৪২ পিএম

তিনটি হত্যা মামলায় চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদকে কয়েক দফায় ২৭ দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছুই পায়নি পুলিশ। তবে তার অপরাধ জগতের সঙ্গী কারা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের ভাণ্ডার কোথায় সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে বলে দাবি পুলিশের। রিমান্ডে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করলেও আদালতে তা ম্বীকার করবেন না বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসী।

নগর পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রিমান্ডে বেশ ‘কৌশলী’ ভূমিকা পালন করছেন ছোট সাজ্জাদ। হত্যা, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রভাণ্ডারের বিষয়ে পুলিশ হেফাজতে তথ্য দিলেও আদালতে দায় স্বীকার করতে রাজি হচ্ছেন না ছোট সাজ্জাদ। গত সাত মাসের ব্যবধানে (২৯ আগস্ট থেকে ৩০ মার্চ) সাজ্জাদ ও তার সহযোগীরা চট্টগ্রাম নগর ও জেলা এলাকায় তিনটি পৃথক ঘটনায় পাঁচজনকে খুন করার অভিযোগ মামলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানায়।

এ বিষয়ে জানতে নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা মোবাইল ফোন রিসিভ না করলেও বাকলিয়া থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দীন বলেন, ‘৩০ মার্চ রাতে বাকলিয়া একসেস রোডে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের মামলায় ছোট সাজ্জাদকে আদালতের নির্দেশে সাতদিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু এ সময় সে আমাদেরকে বলেছে— আমি আপনাদের কাছে বলবো। কিন্তু আদালতের কাছে বলবো না।’

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের বিষয়ে ছোট সাজ্জাদ পুলিশকে তথ্য দিলেও অভিযানে গিয়ে সেসবের হদিস মিলছে না বলে জানিয়ে নগর পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘গত ১৫ মার্চ গ্রেপ্তারের আগে সাজ্জাদ তার অস্ত্রগুলো যেসব সহযোগীর হেফাজতে রেখে ঢাকায় চলে যায় সেসব সন্ত্রাসীর আস্তানায় একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু মিলছে না অস্ত্রের হদিস। ছোট সাজ্জাদ এবং তার সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো বার বার হাত বদল হচ্ছে।

এদিকে জোড়া খুনের মামলায় সবশেষ শুক্রবার দিবাগত রাতে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া থানাধীন নলের চর এলাকা থেকে ছোট সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত মো. মেহেদী হাসান ওরফে হাসানকে নগরের বাকলিয়া থানা পুলিশ বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে একই মামলায় সহযোগী বেলাল, সজীবসহ তিনজন ধরা পড়লেও এখন পর্যন্ত ধরা পড়েনি সাজ্জাদের সহযোগী রায়হান, খোরশেদ, ইমন ও বোরহান।

গত ২২ এপ্রিল দুপুরে চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে মো. ইব্রাহিম (২৮) নামে একজন যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পূর্ব রাউজান ৮ নম্বর ওয়ার্ডে গাজীপাড়ায় সিএনজি অটোরিকশা স্টেশন চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা ইব্রাহিমের মাথায় ও বুকে গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে ছোট সাজ্জাদের অন্যতম ডান হাত রায়হানের নেতৃত্বে ইব্রাহিম খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমকে জানান রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া।

দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের এত অস্ত্র কোথায় আছে, কার আছে, পুলিশ কেন সেই অস্ত্র ভাণ্ডারের নাগাল পাচ্ছে না সেসব বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক কমিটি, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি অ্যাডভোকট আখতার কবীর চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে পুলিশের সদিচ্ছা এবং আন্তরিকতা থাকা দরকার। শীর্ষ একজন সন্ত্রাসীকে প্রায় ১ মাস হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। কিন্তু তার কাছ থেকে কিছুই বের করতে পারেনি তারা। হয় পুলিশ বশীভূত হয়েছে, না হয় তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি আছে। পেশাদারিত্বের সঙ্গে পুলিশ দায়িত্বপালন করলে সত্যটা অবশ্যই বেরিয়ে আসবেই।’

সবশেষ গত ২৭ এপ্রিল জেলার হাটহাজারী থানার একটি হত্যা মামলায় চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন নাহারের আদালত ছোট সাজ্জাদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গত বছরের ২৯ আগস্ট হাটহাজারী ও বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশকে গুলি করে পালানোর মামলায় গত ২৪ এপ্রিল বায়েজিদ বোস্তামি থানার একটি মামলায় সাজ্জাদের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদ।

চান্দগাঁও থানায় দায়ের হওয়া তাহসীন হত্যা মামলায় গত ৬ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় সাজ্জাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদ এই আদেশ দেন। এর আগে প্রথম দফায় একই মামলায় সাতদিনের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল সাজ্জাদকে। জোড়া খুনের মামলায় গত ১৩ এপ্রিল ছোট সাজ্জাদ হোসেনকে সাতদিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশকে অনুমতি দিয়েছিল চট্টগ্রাম  মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম খলিল।

প্রসঙ্গত, ছোট সাজ্জাদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজির ঘটনায় অন্তত দুই ডজন মামলা রয়েছে। নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসীর চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাধীন শিকারপুরের মো. জামালের ছেলে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত