কুয়ার পানিতেই জীবনধারণ

আপডেট : ০৮ মে ২০২৫, ১২:৪৬ এএম

রাঙ্গামাটি সদরের সাপছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম নারাইছড়ি গ্রাম। সাপছড়ি এলাকার রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক থেকে পাহাড়ি পথে ঘণ্টাখানেক হেঁটে এই গ্রামে যেতে হয়। গ্রামে প্রায় পাঁচশ মানুষের বসবাস। আর এখানকার একটি ছড়ার ওপর এই গ্রামের প্রায় ১১৩টি পরিবার নির্ভরশীল। কিন্তু শুকনো মৌসুমে ছড়াটি শুকিয়ে যায়। এতে খাবার পানিসহ গৃহস্থালীর কাজের পানির তীব্র কষ্টে ভুগে গ্রামের মানুষ।

নারাইছড়ি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের সবগুলো পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিকাজে পানি ব্যবহার করা হয় পাশের ছড়া থেকে। কিন্তু ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক জমি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। গ্রামের নারীরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে দুটি ছোট কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। এই পানি খাবার ও রান্না-বান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়।

এই চিত্র শুধুই নারাইছড়ি গ্রামের নয়। রাঙ্গামাটির বেশিরভাগ পাহাড়ি এলাকায়ই পানির কষ্টে ভুগছেন মানুষ। পাহাড়ে বসবাসের কারণে জীবনধারণে সারা বছর এসব গ্রামবাসীকে স্থানীয় ঝিরি-ঝরণার পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। সাধারণত বর্ষা মৌসুম থেকে শীত মৌসুম পর্যন্ত ঝিরি-ঝরণা থেকে পানি সংগ্রহ করা গেলেও মাঘ-ফাল্গুন মাস থেকে পাহাড়ে সুপেয় পানির সঙ্কট দেখা দেয়। সরকারের উদ্যোগে দুর্গম কিছু কিছু পাহাড়ি গ্রামে রিংওয়েল ও টিউবওয়েল স্থাপন করা হলেও শুকনো মৌসুমে এগুলো থেকে পানি পাওয়া যায় না। গ্রামবাসী আশপাশের নিচু জায়গার কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করলেও শুকনো মৌসুমে এসব কুয়া শুকিয়ে যায়। তার ওপর নভেম্বরের পর থেকে এ বছর এখনো পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টি না হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির জন্য ধুকছে এসব গ্রামের মানুষ। তীব্র গরমে আধা ঘণ্টা হেঁটে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে অনেকে কাপ্তাই হ্রদ থেকে পানি সংগ্রহ করেন আবার অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে পাশের গ্রাম কিংবা হ্রদ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। বছরের অর্ধেক সময় বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে জেলার ৭০ ভাগ মানুষ পানির অভাবে ধুকছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলার মধ্যে বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির প্রত্যন্ত গ্রামের পানির সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকার মানুষ বেশিরভাগই পাহাড়ে বসবাসের কারণে গভীর নলকূপও স্থাপন করা সম্ভব হয় না। কিছুটা নিচু জায়গায় পানির স্তর পাওয়া গেলেও সেখান থেকেও পানি সংগ্রহ করতে বেশ কষ্ট হয়। আর শুকনো মৌসুমে পানির স্তরও নেমে যায়।

নাড়াইছড়ি গ্রামের অনিন্দ্য চাকমা বলেন, শীতের পর থেকে গ্রামে পানির কষ্ট বেড়ে যায়। পাশের ঝিরি থেকে অন্য সময় পানি পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে তা থাকে না। ছড়া শুকিয়ে সড়কের মতো হয়ে যায়। তাই ঘণ্টাখানেক পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পাশের গ্রাম থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিদিনের গোসলও হয় না।’

বরকল উপজেলারন সুবলং ইউপির চেয়ারম্যান তরুণজ্যোতি চাকমা বলেন, পাহাড়ি গ্রামগুলোতে রিংওয়েল, টিউবওয়েল বসিয়ে বছরের অন্য সময় পানি পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে পানি নেই বললেই চলে। এ সময় দূর-দূরান্তে যেসব ঝর্ণায় পানি পাওয়া যায়, সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এখানকার মানুষ। তার ইউনিয়নের মধ্যে কৈকরকিং মারমা পাড়া, মোনপাড়া, হাজাছড়া, হিলছড়ি এলাকায় পানির কষ্ট সবচেয়ে বেশি বলে জানান তিনি।

নাড়াইছড়ি গ্রামের কার্বারি (গ্রাম প্রধান) খুলমোহন কার্বারি বলেন, ‘প্রতিবছর গ্রীষ্মের সময় পানির জন্য পুরো গ্রামে হাহাকার পড়ে যায়। আমাদের কৃষিকাজ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। ছড়ার পানি খেয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। সরকারের কাছে দাবি, আমাদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হোক।’

রাঙ্গামাটি জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়–য়া বলেন, ‘৫৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। বাকি যেটুকু আওতায় আসেনি সেখানেও পানির ব্যবস্থা করার জন্য আমরা সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত