রোমান ক্যাথলিক চার্চের ২৬৭তম পোপ হিসেবে বৃহস্পতিবার নির্বাচিত হন রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্ট। আর এর মধ্য দিয়ে তিনিই হলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাচিত প্রথম পোপ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিরাট সম্মান বলে মন্তব্য করেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাবশালী দেশ থেকে পোপ নির্বাচিত করা হয় না। কিন্তু প্রচলিত এই ধারণার বাইরে গিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোপ নির্বাচন করা হলো।
নতুন পোপকে ‘পোপ লিও চতুর্দশ’ নাম গ্রহণ করতে হয়েছে। ভ্যাটিকানের ব্যালকনি থেকে তার প্রথম বক্তব্যে তিনি বিশ্বে শান্তির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একটি ঐক্যবদ্ধ চার্চ, যা সর্বদা শান্তি ও ন্যায়ের সন্ধান করে। তার নির্বাচন শুধু ভ্যাটিকানেই নয়, আনন্দের সাড়া ফেলেছে তার জন্ম শহর যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে। পাশাপাশি পেরুতেও মানুষ উল্লাস প্রকাশ করেছেন। কারণ সেখানে তিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন। কার্ডিনালরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে সিস্টিন চ্যাপেলে ‘কনক্লেভে’ ছিলেন। তারা একাধিক ধাপে ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এবারের নির্বাচনে মোট ১৩৩ জন কার্ডিনাল অংশ নেন, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
কার্ডিনালদের অধিকাংশই ছিলেন পোপ ফ্রান্সিসের মনোনীত। বিভিন্ন দেশের প্রান্তিক জায়গা থেকে আসা কার্ডিনালরা একে অপরকে চিনতেন না। এই বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রার্থীদের নিয়ে দ্রুত মতৈক্যে পৌঁছানো খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল।
নতুন পোপের পরিচয়
রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্টের বয়স ৬৯ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পেরুতে তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় কাজ করেছেন। সেখানে তিনি বিশপ হন ও পেরুর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তার আন্তর্জাতিক ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আসেন। পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুর আগে, কার্ডিনাল প্রেভোস্ট ভ্যাটিকানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন। যেখান থেকে বিশ্বব্যাপী বিশপদের নির্বাচন ও তদারকি করা হয়, তিনি সেই দপ্তর পরিচালনা করতেন। এছাড়া তিনি ‘অর্ডার অব সেন্ট অগাস্টিন’ নামক ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্য। দরিদ্র ও শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতি এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর যে নীতি, তা তার মধ্যে পোপ ফ্রান্সিসের মতোই প্রতিফলিত হয়। তিনি ভ্যাটিকানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, একজন বিশপের রাজ্য বা প্রাসাদে বসে থাকা উচিত নয়।
প্রেভোস্ট তার জীবনের বেশিরভাগ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কাটিয়েছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে, ১৯৮২ সালে তিনি ধর্মযাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন। এরপর তিনি রোমের পন্টিফিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট থমাস অ্যাকুইনাস থেকে ক্যানোন আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পেরুতে তিনি মিশনারি, প্যারিশ প্রিস্ট, শিক্ষক ও বিশপ হিসেবে কাজ করেন। স্প্যানিশ ও ইতালীয় ভাষায় দক্ষ তিনি অগাস্টিনিয়ানদের প্রধান হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর বিষয়ে তার অবস্থান
প্রেভোস্টকে সাধারণত সংযত ও আত্মমগ্ন হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তিনি সম্ভবত পোপ ফ্রান্সিসের তুলনায় কিছুটা ভিন্নধর্মী কৌশল অবলম্বন করবেন। তবে তার সমর্থকদের ধারণা, তিনি ফ্রান্সিসের শুরু করা ‘পরামর্শভিত্তিক প্রক্রিয়া’ চালিয়ে যাবেন। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ ও বিশপদের মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এলজিবিটি ক্যাথলিকদের ব্যাপারে তিনি কতটা উন্মুক্ত মনোভাব রাখবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এই বিষয়ে তেমন কিছু বলেননি। ২০১২ সালে এক ভাষণে তিনি এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় তিনি তার দেশের রক্ষণশীল ক্যাথলিকদের সঙ্গে ভিন্ন এক অবস্থান উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের ধর্মীয় শক্তির আগ্রাসী চিত্রের বিপরীতে তিনি দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছেন। পোপ হওয়ার আগে, তার নামে পরিচালিত একটি সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করা হয়েছিল। তবে অন্যান্য অনেক ক্যাথলিক নেতার মতো তাকেও শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত যাজকদের ব্যাপারে তার ভূমিকার জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
