উত্তীর্ণদের নিয়োগ না দিয়েই পুনঃবিজ্ঞপ্তি

আপডেট : ১১ মে ২০২৫, ০৭:৩৪ এএম

সরকারি বীমা কোম্পানি জীবন বীমা করপোরেশনে চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগ পাচ্ছেন না চাকরিপ্রার্থীরা। অনিয়মের অভিযোগ এনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ড আগের প্রার্থীদের পরীক্ষার ফল বাতিল করে পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি পদোন্নতি পেয়ে ডিজিএম (ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার) হয়েছেন। এ নিয়ে উত্তীর্ণদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করা হলেও কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টদের জানায়নি। এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট বা এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জীবন বীমার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও পূর্বের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ থাকায় বর্তমান বোর্ড সে বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেনা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ জালিয়াতির বিষয়ে দুদকে মামলার জটিলতা থাকায় নিয়োগপ্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে আছে। তবে পূর্বের বিষয় সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতার বিষয়ে কোনো সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তারা। 

জানা গেছে, ২০২০ সালে ৭ জানুয়ারি উচ্চমান সহকারী ও ২০২২ সালের ২৭ এপ্রিল সহকারী ম্যানেজারের শূন্য পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করে জীবন বীমা করপোরেশন। ওই নিয়োগের প্রার্থী বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম। করপোরেশনের নিয়োগ জালিয়াতির দায়ে তৎকালীন এমডি জহুরুল হকের সঙ্গে তৎকালীন সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাহবুবুল আলমকে আসামি করে দুদক। ৫ আগস্টের পর পদোন্নতি পেয়ে তিনি এখন প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ভারপ্রাপ্ত) প্রশাসন হিসেব দায়িত্ব পালন করছেন।

নতুন বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যারা ইতিপূর্বে আবেদন করেছে তাদের নতুন করে আবেদনের প্রয়োজন নেই। পরিচালনা বোর্ডের সিদ্ধান্তক্রমে উক্ত পদসমূহে নিয়োগের লক্ষ্যে ইতিপূর্বে গৃহীত এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষার ফল বাতিল করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আগের বিজ্ঞপ্তিতে বসয়সীমা ৩০ বছরের পরিবর্তে ৩২ বছর করা হয়েছে। তবে পূর্বের আবেদনকারীদের বসয়সীমা সম্পর্কে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

যোগাযোগ করা হলে বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষরকারী জীবন বীমার জেনারেল ম্যানেজার প্রশাসন আবু মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বোর্ডের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে শূন্য পদে নতুন জনবল নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, এর অতিরিক্ত কোনো তথ্য আমার জানা নেই। বিজ্ঞপ্তিতে যেভাবে বলা হয়েছে, আগ্রহী প্রার্থীদের সেভাবেই আবেদন করতে হবে।

মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পূর্বের নিয়োগ নিয়ে দুদকে মামলা আছে। নিয়োগ বিষয়ে যেসব তথ্য ও কাগজপত্র তা দুদকের হাতে। সেক্ষেত্রে দুদকের দিক থেকে কোনো সমাধান না আসা পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছেনা। আর নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত। বোর্ড যেভাবে ভালো মনে করেছে, সেভাবে উদ্যোগ নিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে জীবন বীমা করপোরেশনের তৎকালীন এমডি জহুরুল হক এবং সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাহবুবুল আলমকে আসামি করা হয়েছে। এ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুর আলম সিদ্দিকী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। প্রতিষ্ঠানটির তিন পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে মামলাটি হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় মামলা রুজু করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, জীবন বীমা করপোরেশন উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পরীক্ষার এমসিকিউ প্রশ্নপত্র প্রণয়নে অভিনব পন্থায় প্রস্তুতকৃত প্রশ্ন ও তার সঠিক উত্তর প্রশ্নপত্রের মধ্যে সাজিয়ে তা ছাপিয়ে দেওয়া হয়। চাকরি প্রার্থীদেও ওই অভিনব পন্থার প্রশ্নপত্র  সরবরাহ করে পরীক্ষা নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে তাদের ওপর অর্পিত সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধজনকভাবে বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের লোকদের নিয়োগদানের উদ্দেশ্যে প্রশ্নের উত্তরের ধারাবাহিক ক্রমবিন্যাস পরিবর্তন করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

এর আগে ২০২১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নেয়ামুল আহসান গাজীর নেতৃত্বে একটি দল জীবন বীমা করপোরেশন অফিসে অভিযান চালায়।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর করপোরেশনের উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ও অফিস সহায়ক পদে ৫১২ জন নিয়োগের জন্য এমসিকিউ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জহুরুল হকের বিরুদ্ধে এসব পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করে নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগ পেয়েছে দুদক। এ নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে অন্তত ৪০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে। এসব পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে করপোরেশনের চুক্তি হলেও এমডি পছন্দের লোকদের দিয়ে একটি কমিটি বানিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরি করে ৫১২ জন পরীক্ষার্থীর কাছে তা বিলি করা হয়। এ জন্য তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে আট লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমডির সঙ্গে করপোরেশনের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত বলেও অভিযোগে বলা হয়। দুদক সূত্র জানিয়েছে, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগে জীবন বীমার মামলাটির চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। মামলা চলমান এবং আদালতে বিচারাধীন।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সদস্য মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, জীবন বীমার চাকরিপ্রার্থীদের কিছু না জানিয়ে পূর্বের ফল বাতিল বা একই পদে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে আমার জানা নেই। এর আগে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে পারছিনা। বিষয়টি শুনলাম, খোঁজ নিয়ে বলতে পারব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত