দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ৫১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানেই না যে, তারা রোগটিতে আক্রান্ত। শনাক্তকৃত ৮৬ শতাংশ মানুষ রোগটি নিয়ন্ত্রণ করতেই পারছে না। এ রোগের নিয়ন্ত্রণের হার মাত্র ১৪ শতাংশ। আর চিকিৎসা নিচ্ছে ৩৫ শতাংশ রোগী।
উপজেলা পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপের সংক্রমণ উদ্বেগজনক। উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে অনিয়মিত ওষুধ সরবরাহের কারণে রোগটির নিয়ন্ত্রণের হার ৭ শতাংশ কমেছে। গত এক বছরে মিসভিজিট বেড়েছে ১০ শতাংশ। অর্থাৎ ওষুধ না পাওয়ায় এ রোগে আক্রান্তরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ নিতে নিয়মিত আসে না।
বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, গ্রামাঞ্চলে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিয়মিত না হলে রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে আসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ হার আরও কমবে। সারা দেশে রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন হতে হবে ও সরকারি পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা বাড়াতে হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. শামীম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষ জানে না যে, তার শরীরে রোগটি আছে। এ রোগ নীরব ঘাতক। প্রাপ্তবয়স্করাই বেশি আক্রান্ত হয়। তাই ১৮ বছরের ঊর্ধ্বের সবাইকে নিয়মিত রক্তচাপ মাপতে হবে।’
ন্যাশনাল স্টেপস সার্ভে ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ রিস্ক ফ্যাক্টর্স ইন বাংলাদেশ-এর ২০১৮ সালের পূর্ণাঙ্গ ও ২০২২ সালের খ-িত অংশ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন-২০১৯-এ উপজেলা পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কর্মরত প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
রোগী ৩ কোটি, শনাক্ত ৪৯ শতাংশ : ২০১৮ সালের সরকারি জরিপ অনুযায়ী, দেশে ১৮-৬৯ বছর বয়সী দুই কোটি ৯০ লাখ উচ্চ রক্তচাপের রোগী রয়েছে। এর মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখকে, যা মোট রোগীর ৪৯ শতাংশ। ৫১ শতাংশ বা এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের ক্ষেত্রে রোগটি শনাক্তই হয়নি। এই লোকগুলো জানে না যে, তাদের এ রোগ রয়েছে।
বেড়েছে ৪ শতাংশ : সরকারি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রাপ্তবয়স্কের ২১ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন। ২০২২ সালের জরিপে তা বেড়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। চার বছরে ৪ শতাংশ রোগী বেড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, গত ৩ বছরে আক্রান্তের হার আরও বেড়েছে।
নিয়ন্ত্রণে মাত্র ১৪ শতাংশ : বর্তমানে ২৯ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর রোগটি নিয়ন্ত্রণে আছে, যা মোট শনাক্তকৃত রোগীর মাত্র ১৪ শতাংশ। ৮৬ শতাংশের ক্ষেত্রে রোগটি নিয়ন্ত্রণে নেই। এ রোগের রোগীদের মাত্র ৩৫ শতাংশ বা ৭৩ লাখ মানুষ নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছে। বাকি ৬৫ শতাংশ রোগী ঠিকমতো চিকিৎসা নিচ্ছে না।
৫৪ শতাংশ মৃত্যুর কারণ উচ্চ রক্তচাপ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে মারা গেছে ১৯ শতাংশ মানুষ। হৃদরোগে মারা গেছে ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ। হৃদরোগে মৃত্যুর ৫৪ শতাংশই ঘটেছে উচ্চ রক্তচাপের কারণে।
৫ ঝুঁকির সব ঊর্ধ্বমুখী: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উচ্চ রক্তচাপের জন্য পাঁচটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। এ সবের অন্যতম লবণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, ২৫ বছরের বেশি বয়সিরা দৈনিক পাঁচ গ্রাম বা এক চা চামচ লবণ খেতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশে এ বয়সীরা লবণ খাচ্ছে ৯ গ্রাম।
দ্বিতীয় ঝুঁকি ধূমপান। দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সি ৩৫ শতাংশ মানুষ ধূমপান করছে। তৃতীয় ঝুঁকি হচ্ছে স্থূলতা। দেশে বর্তমানে ১৮ বছরের বেশি বয়সী ৪ শতাংশ মানুষ স্থূলতায় বা অতিরিক্ত ওজনে ভুগছে। চতুর্থ ঝুঁকি মদ্যপান। সংস্থাটি এ সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান দেয়নি। পঞ্চম ঝুঁকি শারীরিক পরিশ্রম। প্রাপ্তবয়স্ক ২৮ শতাংশ মানুষ কোনো ধরনের কায়িক শ্রম করে না। ফলে তাদের স্থূলতা বেড়ে যাচ্ছে।
নারীরা আক্রান্ত বেশি, নিয়ন্ত্রণে পিছিয়ে : সরকারি জরিপ অনুযায়ী, দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর মধ্যে ২৪ শতাংশ নারী ও ১৮ শতাংশ পুরুষ। নারীদের নিয়ন্ত্রণের হারও কম। ২৪ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে রোগটি নিয়ন্ত্রণে নেই ও পুরুষের ক্ষেত্রে এ হার ১৬ শতাংশ। ১৪ শতাংশ নারী চিকিৎসা নিয়ে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ও ১৫ শতাংশ পুরুষ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
শহরাঞ্চলে ও বরিশালে বেশি : মোট উচ্চ রক্তচাপের রোগীর ২৫ শতাংশ শহরে ও ২০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে। শহরাঞ্চলে রোগটির নিয়ন্ত্রণের হারও কম। শহরাঞ্চলে চিকিৎসা নিয়েও ৩০ শতাংশ রোগী রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। গ্রামাঞ্চলে এ হার ১৮ শতাংশ। শহরাঞ্চলে চিকিৎসা নিয়ে রোগটি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছে ১৫ শতাংশ মানুষ ও গ্রামাঞ্চলে ১৪ শতাংশ মানুষ।
আট বিভাগের মধ্যে বরিশালে উচ্চ রক্তচাপের রোগী সবচেয়ে বেশি, ২৫ শতাংশ। চট্টগ্রামে ২৪ শতাংশ, ঢাকায় ২১ শতাংশ, খুলনায় ১৮ শতাংশ, ময়মনসিংহে ২২ শতাংশ, রাজশাহীতে ২১ শতাংশ, রংপুরে ১৯ শতাংশ ও সিলেটে ১৮ শতাংশ।
চিকিৎসার মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে বেশি সিলেট বিভাগের মানুষ, ২৮ শতাংশ। এরপর বরিশালের ২২ শতাংশ, চট্টগ্রামের ১৮ শতাংশ, ময়মনসিংহের ১৩ শতাংশ, খুলনার ১২ শতাংশ, ঢাকার ১১ শতাংশ, রাজশাহীর ১০ শতাংশ ও সর্বনিম্ন রংপুরের ৫ শতাংশ।
গ্রামে ওষুধ নেই, রোগ বাড়ছে : সরকারের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ২০১৮ সালে প্রথম চারটি উপজেলায় কাজ শুরু করে। এখন ২২৫টি উপজেলা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ কর্মসূচি চলছে। আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে এ সংখ্যা ৩১০টি হবে।
হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২২৫টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৫ লাখ রোগী নিবন্ধিত আছে এবং তাদের নিয়মিত তিনটি করে ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় এক বছর হলো সরকার ওষুধ সরবরাহ করতে পারছে না। উপজেলা পর্যায়ে দরিদ্র রোগীরা এ ওষুধ কিনে খেতে পারে না। এখন ওষুধ না পাওয়ায় রোগীরা অনিয়মিত হচ্ছে এবং সংখ্যাটা বাড়ছে। যখন ওষুধ নিয়মিত ছিল তখন রোগীরা নিয়মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসত, রক্তচাপ পরীক্ষা করত, ওষুধ নিত। তখন নিয়ন্ত্রণ হার ভালো ছিল।
কর্মসূচির চিকিৎসকরা জানান, এতদিন উচ্চ রক্তচাপের জন্য এসব কেন্দ্র থেকে তিনটি ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হতো। গত এক বছর ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে না। কারণ সরকারের অপারেশন প্ল্যান নেই। অপারেশন প্ল্যান বাতিল করা হয়েছে। এ কর্মসূচির ব্যাপারে এখনো সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, গত প্রায় এক বছর ওষুধ না পাওয়ার কারণে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ হার কিছুটা কমে গেছে। রোগীর অনিয়মিত হার বেড়ে গেছে। এখন অনিয়মিত রোগীর হার ৩০ শতাংশ। যখন ওষুধ ছিল তখন এ হার ছিল ২০-২২ শতাংশ। গত এক বছরে মিস ভিজিট ১০ শতাংশ বেড়েছে।
এমনকি করোনার পর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল। এখন ৫৩-৫৫ শতাংশে নেমেছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, ওষুধ নিয়মিত না হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা অনিয়মিত রোগীর সংখ্যাও বাড়বে। এ লোকগুলো যদি ওষুধ না খায় তাহলে তাদের উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ রক্তচাপজনিত অন্য রোগ, যেমন স্ট্রোক হওয়া, কিডনি ড্যামেজ হওয়া, হার্ট অ্যাটাক হওয়া বাড়তে থাকবে।
ডাক্তাররা বলছেন, এখন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি চারজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। সবার রক্তচাপ মাপা যাচ্ছে না। সচেতনতা আরেকটু বাড়ানো যেতে পারে। সরকারের ওষুধ সরবরাহ ঠিক থাকলে এটি একটি যুগান্তকারী কর্মসূচি হবে। মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেতে উপজেলামুখী হবে।
গ্রামে নিয়ন্ত্রণ হার ৫৫ শতাংশ : ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন জানায়, ২২৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিবন্ধিত উচ্চ রক্তচাপের রোগী ৪ লাখ ৯৭ হাজার বা ৫ লাখ। দেশের ৪২৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ২২৫টিতে অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ কমপ্লেক্সে এ কর্মসূচি চলছে। ওষুধ খেয়ে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আছে ৫৫ শতাংশ রোগীর। ৩০-৩২ শতাংশ মিস ভিজিট রয়েছে, অর্থাৎ এ রোগীরা নিয়মিত নয়। ১৫ শতাংশ ওষুধ খাচ্ছে, কিন্তু রোগটি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
জীবনযাপনের ধরন মূল কারণ : ডা. শামীম জুবায়ের বলেন, ‘আমাদের জীবনযাপনের ধরন বদলে গেছে এটাই মূল কারণ। শহরাঞ্চলে আমরা রেস্তোরাঁগুলোতে খাওয়া শুরু করেছি। এখানে লবণসহ অন্য খাবারের উপাদান ঠিক মাত্রায় নেই। তামাকের ব্যবহার এখনো কমাতে পারিনি। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও স্থূলতা বাড়ছে। মানুষ কায়িক শ্রম কম করছে। এসব কারণে উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে।’
তিনি বলেন, প্রথম পরামর্শ হলো লবণ কম খেতে হবে। তারপর স্থূলতা কমাতে হবে। শারীরিক কাজকর্ম বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে খেলাধুলার ব্যবস্থা রাখতে হবে। দরিদ্র সাধারণ মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ ও চিকিৎসা রাখতে হবে।
আজ বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস : বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সচেতনতা বাড়াতে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
