জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর বিলুপ্ত করে গভীর রাতে সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি এবং এনবিআর সংস্কারে গঠিত পরামর্শক কমিটির সুপারিশ পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি অধ্যাদেশ জারি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সবাই। এ অধ্যাদেশে নির্বাহী বিভাগের করায়ত্ব হওয়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও মনে করে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান টিআইবি। তাই এ অধ্যাদেশ অবিলম্বে সংশোধনের দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া আন্দোলন দমাতে এনবিআরের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নানা ধরনের চাপ অব্যাহত রেখেছেন। একই সঙ্গে বিতর্কিত করতে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গতকাল শনিবার হওয়া রিট ষড়যন্ত্রের অংশ কি না, তা নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে নানা শঙ্কা। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, এনবিআর বিলুপ্তের খসড়া অধ্যাদেশ জারির পর থেকে কোনো ধরনের কর্মসূচি না দিয়ে অবস্থান নিয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার চেষ্টায় করে ব্যর্থ হন। সংশোধনের কথা বলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্ধকারে রেখে মধ্যরাতে জারি করা অধ্যাদেশ তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। এরপর থেকে আন্দোলনে নামেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে কাস্টমস ও ট্যাক্সের ক্যাডার নন-ক্যাডার থেকে শুরু করে এনবিআরের সব শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যোগ দেন। গতকাল বেলা ৩টায় কর্মসূচি শেষ করে রাজস্ব ভবনে আসেন রাজধানী এবং রাজধানীর আশপাশের প্রায় সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তিন দিনের দেওয়া এই কর্মসূচি আজ রবিবার চতুর্থ দিনের মতো চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতেও রাজি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। ঐক্য পরিষদের দাবি, এনবিআর বিলুপ্ত করে যে রাজস্ব অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে, তা বাস্তবভিত্তিক নয় এবং এতে হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারীর মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। এমনকি সংস্কার কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশগুলো এখনো গোপন রাখা হয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য এবং এতে রাজস্ব ব্যবস্থায় সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, গত ১২ মে রাতে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছে। সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির মতামত উপেক্ষা করেই প্রায় অপরিবর্তিত খসড়ার ভিত্তিতে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারি করেছে। নতুন অধ্যাদেশ জারির ফলে দীর্ঘদিনের রাজস্ব সংস্থা এনবিআর কার্যত বিলুপ্ত হলো। এখন থেকে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ এই দুই ভাগে পরিচালিত হবে। কমিটির সুপারিশ আমলে না নিয়ে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে বলে জানিয়েছেন খোদ পরামর্শক কমিটির সদস্য ও এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন। একই সঙ্গে পরামর্শক কমিটির আরেক সদস্য আমিনুর রহমানও কমিটির সুপারিশের বাইরে গিয়ে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে বলেও গণমাধ্যমে জানান। আর প্রশাসন বিভাগে চলে যাওয়ায় শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সুপারিশও বিঘিœত হয়েছে।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, শুরু থেকে এ আন্দোলন দমাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপ দেওয়া হচ্ছে। চেয়ারম্যান ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তা প্রতিনিয়ত এসব কাজ করে যাচ্ছেন। এমনকি এ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা বা প্রশ্নবিদ্ধ করতে এনবিআরের বহিরাগতদের নিয়ে আসা হয়েছে। সর্বশেষ একটি রিট নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। তারা বলছেন, এই রিট আসলে কারা করল? নাকি এর পেছনে কেউ রয়েছে। এ ছাড়া এই আইনজীবী নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখানে আন্দোলন দমাতে তৃতীয়পক্ষ কোনো সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তাদের মধ্যে। অধ্যাদেশের মতো রিট নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন বলেও প্রায় ডজনখানেক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যৌক্তিক দাবির বিষয়ে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সমর্থনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো হয়। তবে এ কর্মসূচির কারণে করদাতা ও সেবাপ্রার্থীদের যে সাময়িক ভোগান্তি হয়েছে, সেজন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছে পরিষদ। তারা জানিয়েছে, আন্দোলন সফল হলে কর্মীরা অতিরিক্ত সময় দিয়ে অনিষ্পন্ন কাজ দ্রুত সম্পন্ন করবেন। এনবিআরসহ দেশের বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে জানা যায়, সকাল ১০টা থেকেই অফিস যথারীতি শুরু হলেও সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসে উপস্থিত ছিলেন। সব ধরনের কাজ বন্ধ ছিল। তবে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা, রপ্তানি কার্যক্রম এবং এনবিআরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন কার্যক্রম এ কর্মসূচির আওতাবহির্ভূত ছিল।
এদিকে বিদ্যমান কাঠামো পুনর্গঠন করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য জারি করা অধ্যাদেশটির বৈধতা নিয়ে রিট করেছেন এক আইনজীবী। গতকাল শনিবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জুয়েল আজাদ হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি করেন। তিনি বলেন, বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে চলতি সপ্তাহে রিটের ওপর শুনানি হতে পারে।
রিটের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আইনজীবী জুয়েল আজাদ বলেন, অংশীজনদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা না করেই তড়িঘড়ি করে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। অধ্যাদেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গঠনসংক্রান্ত ১৯৭২ সালের আদেশ (রাষ্ট্রপতির) বিলুপ্ত করা হয়েছে। এটা বাতিল করতে হলে যথাযথ ন্যায্য প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। রাজস্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত অংশীজনদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। এখন দুটি বিভাগের শীর্ষ পদগুলো প্রশাসন ক্যাডার থেকে পূরণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের কর্মকর্তারা বঞ্চিত হবেন, যা সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদ সমর্থন করে না। মূলত এসব যুক্তিতে রিটটি করা হয়েছে।
