বিমানের চাকা : ধোলাইখালে নাট জিঞ্জিরায় বল্টু!

আপডেট : ২০ মে ২০২৫, ০২:০৭ এএম

মহাকাশের উদ্দেশে বাংলার রকেট যাত্রার উচ্চাশার পারদ ছিল কিছুদিন আগেও। রকেটটি তৈরি করছিলেন, ময়মনসিংহের একদল তরুণ উদ্ভাবক। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’। ২০১৮ সাল থেকে ধূমকেতু-০১ শিরোনামে ময়মনসিংহে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক উপ-কক্ষপথ রকেট ‘বিদ্রোহী’ উন্মোচনও করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তা দেশের মহাকাশ-প্রযুক্তি উন্নয়নের এক নতুন যুগের সূচনা করবে। পরে গবেষণাটি আলোর মুখ দেখে ২০২২ সালে। আশা জাগানিয়া খবর ছিল, চট্টগ্রামের আশিরের বিমান থেকে ড্রোনও। বিমানের প্রায় ৬০০ মডেল তৈরি করেছিলেন তরুণ আশির উদ্দিন। পরে বিমানের মডেল তৈরি বাদ দিয়ে সময়ের চাহিদা বিবেচনায় তিনি মন দেন চালকবিহীন উড়ন্ত যান ড্রোনে। বিভিন্ন মডেলের ১০-১২টি ড্রোন তৈরিও করেন চট্টগ্রাম বাঁশখালীর আশির। রাজশাহীর সেতারাও ছিলেন শিরোনামে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের সেবার জন্য রোবট ‘ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম’ তৈরি করেছিলেন, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-রুয়েটের একদল সাবেক শিক্ষার্থী। রোবটটি রোগীর পাশে গিয়ে শরীরের তাপমাত্রা নির্ণয়, চিকিৎসকের পরামর্শ পৌঁছানোসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে সক্ষম ছিল। ২০২০ সালে এটি তৈরি করা হলেও, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেটি আর এগোয়নি। তারপরও তো উদ্ভাবনের শক্তি-হিম্মতের খবর। উচ্চমার্গের  এই বাতাবরণে দেখতে হয়, ওড়ার পর বিমানের চাকা খুলে যাওয়ার বেদনাদায়ক খবর। ভাবতে হয়, আকাশে-পাতালে বাংলাদেশের মানুষের জীবনের জন্য অদৃশ্য শক্তির কত না হাত! এরপরও মন্দের মধ্যে ভালো খবর, উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়েনি। পড়তে হয়নি হতাহতের খবর। এর আগেও বিমানের চাকা খুলে পড়ার রেকর্ড রয়েছে। এবার মহাশূন্য থেকে চাকা খসে পড়লেও কক্সবাজার থেকে ৭১ যাত্রী নিয়ে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ড্যাশ ৮-৪০০ মডেলের উড়োজাহাজের সফল অবতরণ একটি সুখবর। বিমানটিকে নামাতে পারা ক্যাপ্টেন ও ফার্স্ট অফিসারের অসাধারণ দক্ষতা ও উপস্থিত বুদ্ধির একটি ঘটনা। সেইসঙ্গে বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশলগত ত্রুটির ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন আরেক ঘটনা।

গত এক দশকে বাংলাদেশের বিমানের উড়োজাহাজে ছোট-বড় মিলিয়ে বেশ কয়েকটি যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনার রেকর্ড রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি, পুরাতন যন্ত্রাংশের ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তির অভাব শনাক্ত হয়েছে বারবার। বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশল শাখার কর্মীদের নিয়মিত উন্নত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হলেও বাস্তবায়নে ব্যাপক ঘাটতি। কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা বিমানের চাকা খুলে যাওয়ার পেছনেও, এ গাফিলতির নমুনা রয়েছে। এয়ারক্রাফটি প্রচলিত মান মেনে প্রকৌশল বিভাগ রক্ষণাবেক্ষণ করেছিল কি না? উড্ডয়নের আগে নিয়ম অনুযায়ী প্রি-ফ্লাইট ইন্সপেকশন হয়েছিল কি না এসব প্রশ্ন ঘুরছে। কোনো ফ্লাইট অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৌশল শাখার কর্মীরা পুরো এয়ারক্রাফট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। ফ্লাইট উড্ডয়নের আগেও প্রতিটি চাকার নাট-বোল্ট থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ইন্সপেকশন করে লগ বইতে ‘এয়ারক্রাফট ফিট ফর ফ্লাই’ লিখতে হয়। তারপরও অনেক কারণেই চাকা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। চাকাগুলো অনেক স্পিডে ঘোরার কারণে উড্ডয়ন বা অবতরণের সময় সামান্য ঢিলা থাকলেও সেটি আস্তে আস্তে ছুটে যেতে পারে। তবে খুব কাছাকাছি সময়ে সেটি পরিবর্তন করলে এবং সেক্ষেত্রে নাটগুলো ভালোভাবে টাইট দিলে আর ঝুঁকি থাকে না। এক্ষেত্রে তা হয়নি। ঘটনাটি দিনে ঘটায় তাৎক্ষণিক বিষয়টি ধরা পড়ে। রাতের বেলা হলে বা কেউ না দেখলে, এটি ভয়াবহ পরিণতির দিকে যেতে পারত।

বিমানের চাকা বা নাট-বল্টু ধোলাইখাল-জিঞ্জিরায় মেলে না। আলোচিত বিমানটির বাম পাশের ল্যান্ডিং গিয়ারের চাকাও কোনো যেনতেন টায়ার-টিউবের দোকানের মাল নয়। আলামতে স্পষ্ট গোলমালটা একেবারেই প্রকৌশল বিভাগে খামখেয়ালির কারণে। প্রাথমিক তথ্যের ধারণায় বলা হচ্ছে, উড়োজাহাজটির ল্যান্ডিং গিয়ার প্রায় দেড় বছর ধরে ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। এতে গিয়ারে ব্যবহৃত গ্রিজ শুকিয়ে যান্ত্রিক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ৬ মাস অন্তর ল্যান্ডিং গিয়ারের রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক হলেও, তা অনুসরণ না করার কথা শোনা যাচ্ছে। যদিও উড্ডয়নের আগে বিমানটির ‘সব হুইল কন্ডিশন এবং সিকিউরিটি সেটিসফ্যাকটরি’ বলে উল্লেখ ছিল। বিমান বাংলাদেশ সূত্রে যতদূর জানা গেছে, এ ফ্লাইটটি এর আগে সিলেট রুটে চলাচল করেছে। ল্যান্ডিং করেছে ৯৭৬৮ বার। ক্যাপ্টেন এনামুল হক তালুকদার, ক্যাপ্টেন আনিসুর রহমান, প্রকৌশলী নাজমুল হকদের তদন্তে পরে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ কর্মকর্তা রওশন কবীর গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি হতেই পারে’। কথা কিন্তু সত্য। প্রশ্ন তো থাকছে ত্রুটি ‘হতেই পারে’, সেটা ধরে নিয়ে বিমান চলবে? না-কি, ত্রুটি যেন না হয় সেই লক্ষ্য থাকবে? তা হলে এত প্রশিক্ষণ-মেরামত, কারিগরি সহায়তা কেন? ‘হতেই’ পারের জন্য ট্রেনিং দেওয়া হয়? ‘হতেই’ পারে ধরে নিলে তো হচ্ছেই। সামনে আরও ‘হতেই’ থাকবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একবার পানি সম্মেলনে হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে নাট-বল্টু ঢিলার শিকার হয়েছিল তাকে বহনকারী বিমানটি। ঘটনা ধরা পড়ায় তুর্কমেনিস্তানে জরুরি অবতরণ করানো হয় বিমানটিকে। তখন প্রধানমন্ত্রীর হাঙ্গেরি সফরের পথে ঘটনার কারণে পুরনো কথার সঙ্গে যোগ হয় কিছু নতুন কথাবার্তা। বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে, ইঞ্জিনে অয়েল (লুব্রিকেন্ট) সিস্টেমের ঢিলা নাট-বোল্ট নিয়েই উড়েছিল ‘রাঙা প্রভাত’ নামের বোয়িং উড়োজাহাজটি। ওই ঢিলা অংশ দিয়ে লুব্রিকেন্ট বেরিয়ে যাওয়ায় ইঞ্জিনে অয়েল জিরো হয়ে যায়। যার কারণে পাল্টাতে হয় বিমানের গতিপথ। ভূপৃষ্ঠের ৩০ হাজার ফুট ওপর থেকে বিমানটিকে নামতে হয় তুর্কমেনিস্তানের আসগাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। নামার ১২ থেকে ১৫ মিনিট আগে সেটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বিমানটিতে ছিলেন শেখ হাসিনা ও তার সফরসঙ্গীসহ মোটমাট ৯৯ জন। আর ক্রু ২৯ জন। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর তখনকার বিমানমন্ত্রী কমরেড মেননের কোন রেটে শাস্তি হবে এমন প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। বিমান কর্মকর্তাদেরই বা কী হবে? এমন গোলযোগের পেছনে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা, বিএনপি-জামায়াত, আইএস-জঙ্গি সম্পৃক্ততা নিয়েও কথা কম হয়নি। বাদ পড়েনি প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনায় মিলাদখানিও। বিশ্বায়নের সুবাদে এখন দেশের অজগাঁয়ের ছেলেরাও ভালো মতো বিমান চেনে। কাগজ দিয়ে তারা এখন আর আগের মতো নৌকা বানায় না। তারচেয়ে বেশি বানায় উড়োজাহাজ। সেই উড়োজাহাজ কখনো কখনো ধানক্ষেতে চিতিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখে বিনোদিত হয়। তারা এখন চিনতে শুরু করেছে প্যারাসুটও। বিমানে গোলমাল দেখা দিলে নামতে হয় প্যারাসুট দিয়ে তা জেনে নিচ্ছে নিজ দায়িত্বেই। ভেবে নিচ্ছে, সেটা সম্ভবত টিভি সিরিয়ালে প্রচারিত আলিফ লায়লার জাদুর পাটির মতো। যে পাটিতে চড়লে আসমানে ভাসা যায়। ল্যান্ডও করা যায়। আবার গাড়ি-জাহাজের নাট-বল্টুসহ পুরান মাল ধোলাইখালে পাওয়া যায় এটা রাজধানীর সোনামণিরাও জানে। আরও জানে, জিঞ্জিরার ভেজালের কথা। আদি ঢাকার খান্দানি ব্যবসায়িক এ মোকামের নামডাক অনেক দিনের। পলাশী যুদ্ধে পতনের পর জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দি রাখা হয়েছিল বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মা আমেনা, স্ত্রী লুৎফা, মেয়ে কুদসিয়া ওরফে উম্মে জোহরা ও খালা ঘষেটি বেগমকে। বন্দিখানায় তাদের জিঞ্জির পরিয়ে রাখা হয়েছিল বলেই না-কি জায়গাটার নাম হয়ে যায় জিঞ্জিরা।

নবাবী জমানায়ও ছিল জিঞ্জিরার বাণিজ্যখ্যাতি। পরে ইংরেজ আমলে জিঞ্জিরায় জমে ওঠে পাট, বাঁশ, কাঠ, টিনজাত সামগ্রী, মসলা, গজারি লাকড়ি, ইত্যাদির ব্যবসা। প্রসিদ্ধ ছিল মৃৎশিল্প, লোহার সামগ্রীর জন্যও। পাকিস্তান আমলে জিঞ্জিরা এলাকায় গজায় আলকাতরা, নারিকেল তেল, সাবান, ডিটারজেন্ট, শাড়ি-লুঙ্গিসহ  কিছু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। স্বাধীনতার পর যোগ হয় মেলামাইনসহ আরও কিছু পণ্যের কারখানা। এর ফাঁকেফুকে জিঞ্জিরায় ভর করে বিভিন্ন মালসামানার নকল ভার্সন। অনেকের মতে, ওষুধ ছাড়া জিঞ্জিরার বেশিরভাগ নকলবাজিই দেশের জন্য সম্ভাবনার। জিঞ্জিরার ঢেউটিন, স্ক্রু, নাট-বল্টু, ক্লাম, তারকাঁটা, জিআই তার, হ্যাসবোল্ট, কব্জা, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ডেকোরেটর সরঞ্জাম, ওয়াশিং টব, পিতলের বার্নার, ক্রোকারিজ, তাওয়া, টিফিন ক্যারিয়ার, অ্যালুমিনিয়ামের জগ-মগ বিদেশেও সাপ্লাই হয়। জাপান, জার্মান, ইতালির মতো দেশ থেকে আসা মোবাইল ফোন সেট, ফ্লাস্ক, ওয়াটার হিটারের মতো মাল নকল করাও এই মালিকদের হাতে ইশারার মতো। মাল-মালিকের এ নকলামি ধরতে বা প্রমাণ করতে পারেন না জিঞ্জিরার অন্য কারিগররাও। মনোকষ্টও কম নয় জিঞ্জিরাদের। ব্যবসায়িক যন্ত্রণাও কম নয়। সরকারি পারমিশন না পাওয়ায় তারা নিজেদের তৈরি করা মাল নিয়ে গর্ব করতে পারেন না। তাই জিঞ্জিরাকে বাজারে ছাড়ে মেইড ইন চায়না, জাপান, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সিলমোহর দিয়ে। অথচ নকল ধরার নামে তাদের কী হয়রানিটাই না করা হয়! কিন্তু, নকল প্রমাণ করা যায় না। কেরানীগঞ্জ-কালীগঞ্জে গড়ে ওঠা বিশাল বিশাল কারখানা, আগানগর-শুভাঢ্যার শত শত মার্কেটে খুচরা-পাইকারি দোকানে জিঞ্জিরা ভার্সনের মালামালের কদরই বেশি। কিন্তু, তাদের অবদান স্বীকারের বালাই নেই। বিশেষ করে জিঞ্জিরার জিন্স প্যান্টের দাপট দেশজোড়া। লোকাল মার্কেটে জিন্সের প্রায় ৮৫ ভাগ চাহিদার জোগান হয় কালীগঞ্জ থেকেই। জিঞ্জিরায় অভাবনীয় এ শিল্পবিপ্লবের কারিগরদের ইজ্জত করে ডাকা হয় ‘ইঞ্জিনিয়ার’ নামে। সোনামুখী সুই থেকে সমুদ্র ও আকাশের জাহাজ, রেলগাড়ির  যন্ত্রাংশ, ফ্লাস্ক থেকে মোবাইল ফোনসেট কী বানাতে না পারে তারা ? বিমানের কোনো যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বানাতে পারে কি-না, সেই তথ্য নেই। জাহাজ নির্মাণে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা বানিয়ে দিচ্ছে যাত্রী ভ্যাসেল, এমপিসি ভ্যাসেল, পাইলট ভ্যাসেল, ফেরি, ট্যাঙ্কার, পন্টুন, কার্গো, ট্যাংকার শিপ, কার্গো শিপ, প্যাসেঞ্জার শিপ, ক্যাটামেরিন শিপ, ওয়াটার বাস, ফেরি, জেটি, পন্টুন, বালুবাহী ট্রলার, ড্রেজারসহ বিভিন্ন শিপ। রেলওয়ের গেজ ও ব্রড গেজ বানাতে তো পারেই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন  

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত