ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বসবাস নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ বৈধ কিংবা অনিয়মিত পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এর মধ্যে প্যারিস অন্যতম গন্তব্য। অনেকেই আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে, কেউবা পড়াশোনার সুবাদে কিংবা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্যারিসে পা রাখেন। তবে যে প্রশ্নটি প্রায়শই বিভিন্ন মহলে উঠে আসে, সেটি হলো—এই অভিবাসী সম্প্রদায়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন?
পরিসংখ্যান যা বলছে ফ্রান্স সরকার সাধারণত অপরাধ পরিসংখ্যানে নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা দেশের ভিত্তিতে তথ্য প্রকাশ করে না। ফলে, বাংলাদেশি নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যাগত তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে ২০২২-২০২৪ সালের ফরাসি পুলিশ প্রিফেকচারের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্যারিস শহরে গ্রেপ্তার ও পুলিশ হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৪৮% বিদেশি নাগরিক, ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে ৪১%, এবং ফ্রান্স জুড়ে ১৯% ছিলেন বিদেশি নাগরিক । এই সংখ্যাগুলোতে বৈধ এবং অনিয়মিত অভিবাসী উভয়েই অন্তর্ভুক্ত।
এই প্রেক্ষাপটে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, “প্যারিসে আজ অন্তত অর্ধেক অপরাধের জন্য দায়ী তারা, যারা বিদেশি এবং তারা অবৈধ অভিবাসী, নয়তো বসবাসের অনুমতির জন্য অপেক্ষমাণ।”
যদিও প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য সমালোচনার মুখে পড়ে এবং অনেকেই তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন, তথাপি বিষয়টি নিয়ে জনমনে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। প্যারিসে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট, সামগ্রিক বা ধারাবাহিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফ্রান্সের মূলধারার মিডিয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা গবেষণায় বিছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া প্রতিবেদনসমূহে বাংলাদেশিদের জড়িত থাকার উল্লেখযোগ্য নজির নেই।
তবে ২০২১ সালে সাইফ রহমান নামের এক বাংলাদেশি ছাত্রকে ফ্রান্স সরকার বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। অভিযোগ ছিল তিনি ইসলামিক স্টেট (IS)-এর সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিলেন ফ্রান্সে। দেশে ফিরে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার মুখোমুখি হতে হয়। এ ধরনের ব্যতিক্রম ঘটনা কখনোই সামগ্রিক বাংলাদেশি অভিবাসী কমিউনিটির চিত্রকে প্রতিনিধিত্ব করে না। প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশি অভিবাসীরা বিভিন্ন পেশায় কর্মরত যেমন রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পোশাক কারখানা, পরিবহন, নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যখাতে কাজ করে থাকে । অনেকে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন এবং অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্য। প্যারিসে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশি উৎসব, ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান। এছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে লাল সবুজের পতাকার মান বৃদ্ধি করেছে বিদেশের মাটিতে। একাংশ বাংলাদেশি নাগরিক অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশ করে। মানব পাচারের শিকার হয়ে, দালালের খপ্পরে পড়ে কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সে প্রবেশ করে তারা। তাদের মধ্যে অনেকে নথিভুক্ত না হওয়ায় বিভিন্ন সেবার বাইরে থেকে যান, বৈধ কাজ পেতে সমস্যায় পড়েন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন। এই শ্রেণির মানুষদের অনেকেই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন, তবে এমন ঘটনা খুবই সীমিত।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, অনিয়মিত অভিবাসন মূলত একটি মানবিক ও সামাজিক সমস্যা, যা আইন-শৃঙ্খলার বিচারে নয় বরং উন্নয়নমূলক হস্তক্ষেপ ও সহানুভূতিশীল নীতির মাধ্যমে সমাধানযোগ্য।গবেষণায় যা উঠে এসেছে।
ফরাসি ও আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোতে বলা হয়েছে, অভিবাসন ও অপরাধের মধ্যে বাংলাদেশী অপরাধী বা মানব পাচারকারী সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বরং অভিবাসীদের মধ্যে অপরাধের হার স্থানীয়দের তুলনায় অনেক সময় কম থাকে। নাজুক অবস্থা, বেকারত্ব, ভাষাগত অসুবিধা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় অপরাধ প্রবণতা বাড়ায় তা যে কোনো জাতীয়তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
সার্বিকভাবে প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আইন মেনে চলা, শান্তিপূর্ণ এবং সামাজিকভাবে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা একটি সম্প্রদায় বাংলাদেশ । তারা নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেও নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা কখনোই গোটা কমিউনিটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে না। বাংলাদেশিদের অপরাধে জড়িত থাকার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রমাণ নেই। বরং প্যারিসের বাংলাদেশি সমাজ প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে চলেছে যে প্রবাস জীবনে সম্মানজনক ও দায়বদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব।
যাদের রক্তে ক্ষমতায় বসছে তাদের তালিকা সরকারের কাছে নেই কেন প্রশ্ন রিজভীর
বগুড়ায় দুদকের তিন চেয়ারম্যানসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা