'বিগত সরকারের আমলে তৈরি হওয়া রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ভারতের আধিপত্যের প্রতীক। বর্তমান সরকারের উচিত এ প্রকল্পটি বন্ধের পথ বের করা। তাতে সাময়িক যে আর্থিক ক্ষতি হবে তা গত সরকারের জ্বালানি খাতের দুর্নীতিবাজদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জ একটা ভয়াবহ দুর্নীতির আখড়া ছিল। কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই লক্ষ কোটি টাকা নিয়ে গেছে।'
আজ শনিবার রাজধানীর এফডিসিতে বিগত শাসনামলে জ্বালানি খাতে লুণ্ঠনের দায় নিয়ে আয়োজিত ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তিটিও জাতীয় স্বার্থবিরোধী। কুইক রেন্টাল আর চালু রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। জ্বালানি খাতের দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বেশিরভাগই দেশ থেকে কিভাবে পালালো তা তদন্ত হওয়া দরকার। বিগত আমলে জ্বালানি খাতের দুর্নীতিবাজদের শনাক্ত করে তাদের তালিকা প্রকাশ করা উচিত। তা না হলে তারা মুখোশ পাল্টে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হবে। বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতের দায় মুক্তি আইন বাতিলের নামে এর সাথে নতুন শর্ত জুড়ে আমাদের প্রত্যাশা ভঙ্গ করেছে। বিগত সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে গণশুনানির নামে যে প্রহসন করেছে বর্তমান সরকার তা থেকে বেরিয়ে আসবে বলে আশাকরি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি। সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, বিগত শাসন আমলে অর্থনৈতিক বিনিময় ছাড়া কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়নি। কতিপয় রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ী এই তিন পক্ষের যোগসাজশেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সেক্টরে দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। পতিত প্রধানমন্ত্রীর একক পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের হরিলুটের ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরো বলেন, ট্রেড—বেইজড মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ফার্নেস অয়েল ও কয়লা আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে জ্বালানি খাতের মাফিয়ারা। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল ফার্নেস অয়েল ও কয়লার বাংলাদেশি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও বিদেশে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান একই মালিকের নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানি। এমনও ঘটনা আছে আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের চাইতে দ্বিগুণ—তিনগুণ দামে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল আমদানি করা হয়েছে।
কয়লা আমদানিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এলসির পরিবর্তে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক দ্বিগুণ এরও বেশি মূল্যে আমদানিকারকের পক্ষে ইমপোর্ট পারমিট প্রদান করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এতে জনগণকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, কলকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে ট্রেড বেইজড মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। যার প্রভাব রিজার্ভের ওপর পড়েছিল। শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে বলে বিগত সরকার মানুষকে মিথ্যা গল্প শুনিয়েছে। ফেরি করে বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা বলা হলেও বিদ্যুতের ফেরিওয়ালারা এখন জেলে অথবা পলাতক। বিদ্যুতের এমন মিটার বসিয়েছে বাতি না জ্বললেও মিটার ঘোরে। প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গে এক চতুর্থাংশ টাকা মিটার খেয়ে ফেলে। শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাসের পাইপে গ্যাসের পরিবর্তে বাতাস দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে গৃহস্থলি কাজে গ্যাস সরবরাহ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে রান্না-বান্না ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অথচ মাস শেষে ঠিকই বিল গুনতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র পক্ষ থেকে নিম্নের ১০ দফা সুপারিশ করেন
১. বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সম্পাদিত সকল চুক্তি পুণমূর্ল্যায়ন করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা। কোনো চুক্তি দেশের স্বার্থ বিরোধী হলে তা বাতিল করা। ২. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে জ্বালানি খাতের মাফিয়াদের বিচার করা।
৩.বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) দুর্নীতি অনুসন্ধানে ফরেনসিক অডিট করা।
৪. এলএনজি আমদানির দিকে না ঝুঁকে নিজস্ব গ্যাস—কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলন করা।
৫.ধারণা করা হয় আমাদের অফসরে অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণে গ্যাস ও তেলের মজুদ রয়েছে। তা উত্তোলনের ব্যবস্থা করা।
৬.বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নির্ধারণে জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ গণশুনানি নিশ্চিত করে নিরবিচ্ছিন্ন মানসম্পন্ন জ্বালানি সরবরাহ করা।
৭. ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে বেরিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৮. বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা।
৯.গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে দেশিয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
১০.বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল, কয়লা, ফার্নেস ওয়েল ইত্যাদি সঠিক মূল্যে আমদানি নিশ্চিত করা।
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে 'সঠিক পরিকল্পনার অভাবই জ্বালানি খাতে লুণ্ঠনের প্রধান কারণ শীর্ষক ছায়া সংসদে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় বিতার্কিকদের পরাজিত করে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বিতার্কিকরা বিজয়ী হয়।
প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মুহাম্মদ রইস, সাংবাদিক মাঈনুল আলম, অধ্যাপক তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, সাংবাদিক রিশান নসরুল্লাহ ও সাংবাদিক মো. মহিউদ্দিন। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলকে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করা হয়।
