পুরস্কারঘোষিত আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও আবুল রাসেল মাসুদ ওরফে মোল্লা মাসুদসহ চার জনকে গ্রেপ্তার করেছে সেনাবাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে কুষ্টিয়ার কালিশংকরপুরের একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগজিন, ৫৩ রাউন্ড গুলি ও একটি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ দেশের বাইরে পলাতক ছিলেন।
জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোল্লা মাসুদ সম্প্রতি ভারত থেকে দেশে আসেন। সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ভারত ও নেপালের কারাগারে আটক থাকার পর জামিনে বের হয়ে সম্প্রতি আবার ভারতে যান। ভারতে ধরা পড়ার পর তাকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার তাকে কারাগারে না রেখে ‘আয়না ঘরে’ বন্দি করে রাখে বলে কথা চালু আছে। ৫ আগস্টের পর বাইন আয়না ঘর থেকে বের হয়ে যান। তবে তারা দলবল দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুজনের বিরুদ্ধেই ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করেছিল। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ‘মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে ছাত্রদের বসবাসের ওই তিনতলা ভবনের নিচতলায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে ধরে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী। তাদের মধ্যে একজন সুব্রত বাইন ও আরেকজন মোল্লা মাসুদ বলে অভিযানে থাকা সেনা সদস্যদের কথোপকথনের মাধ্যমে জানা গেছে। গত রোজার ঈদের পরে তারা ওই বাসাটি ছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিল কাপড় বিক্রেতা পরিচয়ে। তাদের অন্য দুই সহযোগী হলেন শুটার আরাফাত ও শরীফ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দেড় মাস আগে কালিশংকরপুরের সোনার বাংলা সড়ক এলাকার মৃত মীর মহিউদ্দিনের তিনতলা বাড়ির নিচতলা ভাড়া নেন বাইন ও মোল্লা মাসুদ। বাড়ি ভাড়া নিতে তাদের সহযোগিতা করেন স্থানীয় প্রবাসফেরত হেলাল নামের এক যুবক। বাড়ির নিচতলা ভাড়া নেওয়ার পর দরজা-জানালা খুলতে দেখেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। বাড়িটির দোতলায় ছাত্রাবাস ছিল। গতকাল ভোররাতে হঠাৎ বাড়িটির তালা ভাঙার শব্দ পেয়ে ছুটে যান স্থানীয়রা। তারা দেখতে পান, সেনাবাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর দুজনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীর গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে স্থানীয়রা জানতে পারেন, ওই বাড়িতেই ভাড়া থাকতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও তার সহযোগীরা।
রবিউল ইসলাম নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যাওয়ার সময় রাস্তায় ভোর ৫টার দিকে সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখতে পাই। মীর মহিউদ্দিনের বাড়ি ঘিরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, ছাত্রদের মেসে অভিযান চলছে। বাড়ি থেকে দুজনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
ছাত্রাবাসে থাকা ইমন নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ভোররাতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাত্রাবাসে এসে আমাদের সবাইকে একত্র করেন। আমাদের ১৮ জনকে একটি কক্ষের ভেতরে রেখে বলা হয়, অভিযান চলছে। এরপর নিচতলা থেকে দুজনকে নিয়ে যায়।’
এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর কুষ্টিয়া ক্যাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা থেকে যাওয়া সেনাবাহিনীর একটি আভিযানিক টিম।
মেসের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সকাল ৮টার দিকে একটি কালো মাইক্রোবাস আসে। সেনাসদস্যরা একজন দাড়িওয়ালা ব্যক্তিকে হাতকড়া পরিয়ে এবং অন্য এক যুবককে হাত বেঁধে গাড়িতে তোলেন। সেনা সদস্যদের একজন বলেন, সুব্রত বাইনকে আটক করা হয়েছে।’ তিনি জানান, ‘প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে নিচতলায় তল্লাশি চলে। ৮টার কিছু সময় পর কালো মাইক্রোবাসটি একদম গেটের সামনে চলে আসে। নিচতলা থেকে দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তিকে হাতকড়া পরা ও মাথায় গামছা বাঁধা অবস্থায় গাড়িতে তোলা হয়। আরেক যুবকের কোমরে ও শরীরে দড়ি বাঁধা ছিল। এক ছাত্র জানতে চান, কাকে নিয়ে যাচ্ছেন? তখন একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন, এখন বিস্তারিত বললে ভয় পাবে। পরে মিডিয়াতে দেখে নিয়ো।’
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘এখানে আমাদের অভিযান ছিল না। অন্য কোনো বাহিনী করেছে কি না জানি না। জানার চেষ্টা করছি।’
কালীশংকরপুরের ওই বাসার ভাড়াটিয়া সানজিদুর ও ইভান বলেন, ‘তিনতলা বিশিষ্ট এ ভবনের নিচতলা ফাঁকা ছিল। প্রায় দেড় মাস আগে আমাদের বিল্ডিংয়ের পেছনের বাসার মালিকের ছেলে বাসাটি ভাড়া নিয়ে তাদের ওঠান। যে দুজন এ বাসাতে থাকতেন তারা খুব বেশি চলাফেরা করতেন না। তাদের সঙ্গে আমাদের মেলামেশা ও পরিচয় ছিল না। তবে পাশের ভবনের মালিক বলেছিলেন, তারা তার আত্মীয় পরিচয় দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তারা ব্যবসা করবেন এবং থাকবেন। এরপর তারা এখানেই থাকতেন।’
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার ঘোষণা করেছিল। তাদের মধ্যে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ ছিলেন। তাদের নামে এখনো ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি রয়েছে। তাদের ধরিয়ে দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। ১৯৯৭ সালের দিকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, তানভিরুল ইসলাম জয়, টোকাই সাগর, টিক্কা, সেলিম, চঞ্চল ও মোল্লা মাসুদ মিলে গড়ে তোলেন সেভেন স্টার গ্রুপ। তারা পুরো ঢাকা কাঁপিয়ে তুলত। বিশেষ করে মগবাজার ও মৌচাক এলাকা ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। নব্বইয়ের দশকে মগবাজারের বিশাল সেন্টার ঘিরেই উত্থান হয় সুব্রত বাইনের। তিনি ওই বিপণিবিতানের কাছে ‘চাংপাই’ নামের একটি রেস্টুরেন্টের কর্মচারী ছিলেন। পরে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে যান। বিশাল সেন্টার ছিল তার কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্র। অনেকে তাকে ‘বিশালের সুব্রত’ নামেও চেনে।
গতকাল বিকেলে সেনাসদরে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামিউদ্দৌলা চৌধুরী বলেন, ‘কুষ্টিয়া ও হাতিরঝিল এলাকা থেকে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ এবং তাদের দুজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি আমাদের সেনাবাহিনীর দক্ষতা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং জাতির প্রতি দায়িত্ববোধের প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত। আজ (গতকাল) ভোর ৫টা থেকে শুরু হওয়া কুষ্টিয়া এবং ঢাকার হাতিরঝিলে সাঁড়াশি অভিযানে ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের একটি ইউনিট গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ২ জন শীর্ষ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও তাদের ২ জন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, চাঁদাবাজি ও নাশকতা চালিয়ে আসছিল। সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ ২০০১ সালে সরকারঘোষিত তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও সেভেন স্টার গ্রুপের মূল পরিকল্পনাকারী। অভিযানটি কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও সংঘর্ষ ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় ও সহায়তা করেছে সেনা সদর, সামরিক অপারেশন পরিদপ্তর, ৫৫ ডিভিশন, ১৪ স্বতন্ত্র ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড, ৭১ মেকানাইজড ব্রিগেড ও এনএসআই।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তথ্য পেয়েছি, বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ছায়াসন্ত্রাসীদের ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন রয়েছেন। ভারত সীমান্তের ওপারে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি সন্ত্রাসীকে ছেড়ে দিয়েছে। তারা দেশে ফিরে জোটবদ্ধ হয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় নৈরাজ্য চালাচ্ছে। তাদের অনুগত চক্র রাজধানীতে চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে যুক্ত। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্র্রেপ্তার করা হলে এসব অপরাধ কমবে।’
