ইশরাকের গেজেট নিয়ে লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি

আপডেট : ৩০ মে ২০২৫, ০৬:৪৯ এএম

বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) গেজেট স্থগিত চেয়ে করা লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করেছে সর্বোচ্চ আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ এ আদেশ দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ইশরাকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সাংবিধানিকভাবে ইসির ওপর বর্তায় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন গতকাল বলেছেন, আদালতের রায়ের অনুলিপি পেলে ইশরাকের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে আদালতের রায়ের আলোকে স্থানীয় সরকারকে শপথ পড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ইশরাক হোসেন। তা না হলে আরও তীব্র আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবনে গিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে এসব কথা বলেন ইশরাক। এর আগে আন্দোলনে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শ্রমিক দলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়। নগর ভবনের বুড়িগঙ্গা হলের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়।

ইশরাক হোসেনকে ডিএসসিসি মেয়র ঘোষণা করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায় ও গেজেটের কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে করা লিভ টু আপিল পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তির পর তিনি নগর ভবনে যান। এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিক দলের নেতাকর্মীরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়। ইশরাক হোসেন বলেন, ‘এই রায়ের পর অবিলম্বে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে আমার শপথ গ্রহণের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। আপনারা (ইসি) শপথ নিয়ে যে টালবাহানা করছেন, তারই পরিপ্রেক্ষিতে আজ (গতকাল) টানা দুই সপ্তাহ নগর ভবনের সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এটি করার কোনো এখতিয়ার আপনাদের নেই।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষণার পরপর আপনাদের উচিত ছিল শপথগ্রহণের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা। যেহেতু আগে এটা করেননি, এখন সর্বোচ্চ আদালতের এই নির্দেশনা আপনাদের ওপর এমনিতেই বর্তায়। যত দ্রুত সম্ভব শপথগ্রহণের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করবেন। অন্যথায় আপনাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতের অবমাননার অভিযোগ চলে আসবে।’

দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ১০ : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে নগর ভবনে ইশরাক হোসেনের আগমন উপলক্ষে তাকে বরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে দুপক্ষে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ডিএসসিসি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান প্রিন্সসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় প্রিন্স বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলার আবেদন করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ডিএসসিরি মেয়র পদ বুঝিয়ে দিতে চলমান আন্দোলনে দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের আগে দুই পক্ষই অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আরিফ চৌধুরী ও ডিএসসিসি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান প্রিন্সের পক্ষের কর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় নগর ভবনের বুড়িগঙ্গা হলে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন তারা। এ ঘটনার পর নগর ভবন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় প্রিন্সসহ বেশ কয়েকজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

আরিফুজ্জামান প্রিন্স বলেন, ‘আমরা জানতে পারি কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলতে মেয়র ইশরাক হোসেন নগর ভবনে আসবেন। সেজন্য আলাপ করতে বুড়িগঙ্গা হলে বসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে আরিফ চৌধুরী ও তার লোকজন নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করে। আমিসহ পাঁচজনের মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হই। আমি শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘মেয়র ইশরাক হোসেনের শপথ ইস্যু নিয়ে চলমান আন্দোলনে বিভিন্ন সময় আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা আমাদের সঙ্গে আলাপ করে, কথা বলে এটাই তাদের সমস্যা। ওরা হামলা করার সময় বলে, নগর ভবন আমরা চালাব।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আরিফ চৌধুরী বলেন, ‘নগর ভবনের ঘটনায় আমি নিজেও আহত হয়েছি। তবে এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে আমাদের নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিতে।’ এ ঘটনার পর দুপুর আড়াইটার দিকে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন নগর ভবনে আসেন। তিনি দুই পক্ষকেই সংযত হওয়ার আহ্বান জানান। নগর ভবনের সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে ১৪ মে থেকে এই আন্দোলন করছেন ইশরাক সমর্থকরা। সেবা নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন অনেকেই। এতে কোরবানির ঈদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পশুর হাট ব্যবস্থাপনাসহ করপোরেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

ইশরাকের শপথ নিয়ে লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি

ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে ঘোষণা করে ইসির (নির্বাচন কমিশন) গেজেট স্থগিত চেয়ে করা লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করেছে আপিল বিভাগ। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি হওয়ায় ইশরাক হোসেনের শপথ নিয়ে এখন সাংবিধানিকভাবে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। আদালতে আপিলের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন। ইসির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ড. মুহাম্মদ ইয়াসিন খান। ইশরাকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। গত বুধবার লিভ টু আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। ওইদিন আদালত ইসির বক্তব্য শুনতে চায়। এরই ধারাবাহিকতায় ইসির আইনজীবী গতকাল বক্তব্য তুলে ধরেন। শুনানিকালে ইশরাক হোসেনের শপথ নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসির ভূমিকা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে সর্বোচ্চ আদালত।

অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইসির উদ্দেশে আদালত বলেছে, তারা (ইসি) সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আপিল বিভাগ মামলাটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছে। আমরা আশা করব, ইসি শিগগিরই নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

ইসির আইনজীবী ইয়াসিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত উষ্মা প্রকাশ করেছে, এটা ঠিক। কিন্তু ইসি এ জাতীয় মামলায় আইনগত কারণে কনটেস্ট করে না।’ তিনি বলেন, ‘মামলাটি ২০২১-এর। সে সময় এই কমিশন ছিল না। এ ছাড়া ২৭ এপ্রিলের মধ্যে মেয়াদ চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে যদি গেজেট না করে, তাহলে ইসির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আসবে। এসব কারণেই গেজেট জারি হয়। বাকি কাজ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। এ বিষয়গুলো ইসির পক্ষে তুলে ধরা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ আদেশটি পেলে বিস্তারিত জানা যাবে। ইশরাকের আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালত গেজেটের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়নি। আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, ইসি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এখন ইসি শপথের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’

গত ২২ মে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ইশরাককে মেয়র হিসেবে জয়ী ঘোষণা করে ইসির গেজেটের বৈধতা নিয়ে করা রিট খারিজ করে আদেশ দেয়। ফলে মেয়র পদে ইশরাক হোসেনের শপথে কোনো বাধা নেই বলে তখন জানান ইশরাকের আইনজীবীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ইশরাকের গেজেট স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আপিল করেন রিটকারীর আইনজীবী।

শপথ নিয়ে সিদ্ধান্ত রায়ের কপির পর : সিইসি

ইশরাক হোসেনের শপথ প্রসঙ্গে আপিল বিভাগের রায়ের অনুলিপি না পাওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে চান না প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। গতকাল বিকেলে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ের অনুলিপি এখনো পাইনি। রায়ের কপি পাওয়ার পর আইনগত দিক বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ইসির আইনজীবী শুনানি করেছেন। তার সঙ্গে কথা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি সেখানে ছিলেন? আইনজীবীর সঙ্গে কথা হয়নি। ইশরাকের ইস্যুটি নিয়ে দফায় দফায় ইসির আইন শাখার সঙ্গে বৈঠক করেন সিইসি। এ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন অন্যান্য কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবদুর রহমানেল মাসুদ, বেগম তহমিদা আহমদ এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহর সঙ্গে বৈঠক করেন।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত