ঢাকার গোড়াপত্তন হাজার বছর। তবে রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পায় চারশ বছর আগে । বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে উঠে যে বসতি, সেই অঞ্চলটাকে আমরা বলি পুরান ঢাকা। পুরান ঢাকা একটি ধাঁধার মতো। শহর ও নদীর মধ্যে আটকে থাকা এই নগর এখনো তার গৌরবের অতীত এবং হাল আমলের উন্নয়ন-প্রবাহের মধ্যে দোদুল্যমান। এর সরু রাস্তা ও নোনা ধরা বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার ফাঁক-ফোকরে লুকিয়ে আছে নানান রকম চরিত্র আর অগণতি মানুষের আখ্যান।
ঢাকার গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে আলোকচিত্রী মুনেম ওয়াসিফের একক দৃশ্যশিল্প প্রর্দশনীতে ফুটে ওঠে পুরান ঢাকায় গত ২০ বছরে বেড়ে উঠা তার নানান শিল্পকর্ম। এই শহর, শহর ঘিরে বেড়ে ওঠা সাহিত্য, এখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতি শিল্পীর যে অনুরাগ তার আভাস হল 'ক্রমশ'। প্রদর্শনীকে তিনটি ভাগে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভাগগুলো হলো-‘স্টেরিও’, ‘খেয়াল’ ও ‘সামান্য’। প্রদর্শনী শুরু হয় গত ১৮ এপ্রিল। শেষ হবে ৩১ মে। প্রদর্শনীকে ঘিরে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘নোকতা’ থেকে ‘ক্রমশ’ শিরোনামে একটি বইও প্রকাশিত হয়।
মুনেম ওয়াসিফ বহু বছর পুরান ঢাকায় থেকেছেন, ছবি তুলছেন। পুরান ঢাকা নিয়ে যারা লেখালেখি করেন তাদের অনেকের লেখা পড়ে বড় হয়েছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা শহীদুল জহিরের গল্পের প্রভাব তার ছবির মধ্যে আছে। পুরান ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেকটা দম নেওয়ার মতো। ২০০০ সালের শুরুর দিকে একটা রাশিয়ান জেনিথ দিয়ে তার ছবি তোলা শুরু। কিন্তু ক্যামেরার মিটার ঠিকমতো কাজ করত না। ফলে কীভাবে এক্সপোজার দেবেন সেটি ভাবতে ভাবতেই তার সময় কেটে যেত। শিশুরা প্রথম সাইকেল পেয়ে যেভাবে অলি-গলি ঘুরে বেড়ায়, মুনেমও তার জেনিথ ক্যামেরাটি নিয়ে পুরান ঢাকার বিভিন্ন গলিতে চক্কর দিতে থাকেন। পানিটোলা, তাঁতিবাজার, শাঁখারীবাজার, শ্যামবাজার, ফরাশগঞ্জ, মোহিনীমোহন দাস লেন, শিরীষ দাস লেন, বনগ্রাম, কাগজিটোলা, কসাইটুলী, নবাবপুর, বংশাল, দক্ষিণ মইশুন্দি, নারিন্দা, হোসনে দালান, উর্দু রোড— এই ছিল তার গন্তব্যস্থল। এসব এলাকার বিভিন্ন গলিতে তিনি পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। ছবি তোলা ছিল কেবল একটি উপলক্ষ।
পায়ে হেঁটে ঘোরার ফলে শহরটাকে তিনি যেভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছেন, অন্য কোনো বাহনে ঘুরলে সে অভিজ্ঞতার সুযোগ হতো কিনা-সন্দেহ। এই হাঁটাহাঁটির ফলে দিনের বিভিন্ন সময়ে একই জায়গাকে দেখা— ভোর, সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা কিংবা রাত এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে দিয়ে আলোর, স্থাপত্যের আর মানুষের জীবনের সঙ্গে তার এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার প্রথম দিককার ছবিগুলোর মধ্যে পায়ে হাঁটা কিংবা শাররীরিক কসরতের ছাপ আছে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে যেসব জায়গায় তিনি বিশ্রাম নিতেন, সেইসব জায়গা ও সেখানকার জীবনঘনিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক তার কাজে গভীর ছাপ ফেলে। শাঁখারীবাজারে কল্পনা বোর্ডিংয়ের পাশের ছোট্ট দোকানে দীপক দার হাসিমুখ—‘কি মিয়া, অনেকদিন আসেন নাতো?’ কিংবা কসাইটুলীর জহির ভাইয়ের পিঠার দোকান, বিউটি বোর্ডিংয়ের তারক দার গল্প তাকে অনেক বেশি তাড়িত করত। চায়ের দোকান, সেলুন, উঠোন— এসব ছিল তার বাস্তবতার বিরতির জায়গা, আর তাই এসবই হয়ে ওঠে তার কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০০৮ সালে ছবি মেলার সময়ে পাটকল শ্রমিকদের নিয়ে তার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়েছিল কল্পনা বোর্ডিংয়ে, যেখানে উন্মুক্ত আকাশের নিচে একসময় দুর্গাপূজা ও বিয়ে-শাদি হত ।
ছবি তোলার অনেক দিন পর মুনেম ওয়াসিফ পেলেন একটা নাইকন এফএম-টু ক্যামেরা আর একটা ২৮ মিলিমিটার ফিক্সড লেন্স। এই সীমাবদ্ধ গিয়ারেই তিনি ছবি তুলতেন। সাবজেক্টের কাছে পৌঁছাতে হলে তাকে পায়ে হেঁটে যেতে হত। আর দূরে যেতে হলে দুই পা পেছনে গিয়ে ছবি তুলতেন। মুনেমের কথায়, দুই পা-ই ছিল তার ‘ভ্যারিয়েবল লেন্স’। এই শারীরিক উপস্থিতি এবং বয়ান, তার প্রথম দিককার ছবিতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। পরের দিকের কাজে চরিত্রটা কিঞ্চিত বদলে যায়। ১২ বছর ছবি তোলার পর ‘বিলঙ্গিং’ নামে তার একটা বই বের হয় প্যারিসের ‘ক্লেমেন্তিন দে লা ফেরানিয়ের’ প্রকাশনা থেকে। এই বই বের হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন-যে চোখ দিয়ে তিনি পুরান ঢাকাকে দেখছেন, তার সঙ্গে বাস্তব দুনিয়ার অনেক ফারাক। তিনি এতদিন ধরে যে ছবিগুলো তুলছিলেন সেগুলো ছিল পুরান ঢাকার স্থাপত্য, দৈনন্দিন জীবন কিংবা উৎসবের আনন্দ মুহূর্ত।
২০১৫-১৬ সালের দিকে তার মনোজগতে পরিবর্তন আসে। সাহিত্য, সিনেমা আর শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি যে পুরান ঢাকাকে অনুভব করেন, তা অনেকটাই এক মানস জগৎ। সেই অনুভব থেকে ‘খেয়াল’ নামে তিনি একটা ফিল্ম বানানোর চিন্তা করেন। কাজটা শুরু করার সময় তিনি চারটা চরিত্রের কথা ভাবেন-যে চরিত্রগুলো একই মহল্লায় থাকেন কিন্তু কেউ কারো সঙ্গে পরিচিত না। এই কাজে তিনি এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক স্তর নিয়ে আগ্রহী হন যেখানে শারীরিকভাবে কোনো একটা জায়গায় অবস্থান করেও মানসিকভাবে অন্য একটা জায়গার কথা ভাবছেন। ‘খেয়াল’ বানানোর সময় তিনি নিজের মধ্যে এক নতুন অস্তিত্ব খুঁজে পান। তিনি নতুন করে শব্দ ও গন্ধ পেতে শুরু করেন। গভীরভাবে খেয়াল করলেন, চোখে অনেক কিছু দেখা যায় না কিন্তু কানে শোনা যায়। এই বিষয়গুলো তার শিল্পবোধকে আরো বেশি তরঙ্গায়িত করে।
পুরান ঢাকার জীবনগুলোর মধ্যে একটা বহুত্ব আছে। মানে অনেক ধরণের ঘটনা একই সঙ্গে ঘটতে থাকে। তিনি অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের অনেকগুলো কেন্দ্রবিন্দুকে একসাথে একজায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তার সর্বশেষ ছবি তোলার যে ধরণ- পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠা স্থাপত্য, স্থাপত্য বলতে যা বোঝায় ঠিক সেই রকম গ্রান্ড আর্কিটেকচার না। দৈনন্দিন জীবনে একজন চায়ের দোকানদার যেভাবে তার দোকানটা তৈরি করেন দুটো বাঁশ কিংবা একটা বড় পলিথিন মুড়িয়ে বা বাড়ির ছাদে মানুষজন যেভাবে কবুতরের ঘর তৈরি করে কিংবা একটি ইটের টুকরা যেভাবে খুঁটি আর পাটাতনের মধ্যে সমন্বয় ঘটায়। এই কাজের সময় কুড়িয়ে পাওয়া কিংবা ফেলে দেওয়া ব্যবহারিক নানান ধরণের অবজেক্ট ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করেন। তিনি এই কাজটার নাম দেন ‘সামান্য’। আলোকচিত্রের সবচেয়ে ক্ষমতার জায়গা হলো-এই শিল্পমাধ্যমটি খুব তুচ্ছ ও সাধারণ বিষয়কেও বিশেষ করে দেখতে পারে।
২০ বছর ধরে দেখা, জানা, পড়া ও অনুভবের ভেতর দিয়ে যে কাজটা করে যাচ্ছেন মুনেম, সেটি শেষ হওয়ার নয়, কাজটা চলমান; তাই এর নাম ‘ক্রমশ’।
লেখক : আলোকচিত্রশিল্পী ও গবেষক
