গাজায় ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে হামলায় নিহত ৩১

আপডেট : ০২ জুন ২০২৫, ০৭:২৬ এএম

গাজার দক্ষিণাঞ্চলের শহর রাফায় গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) পরিচালিত একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ১৭০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ডব্লিউএএফএ এবং হামাস-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম গতকাল রবিবার এ তথ্য জানিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এটি জিএইচএফ-এর ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরুর পর সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। 

হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজা সরকারের মিডিয়া অফিস এই হামলাকে ‘উন্মুক্ত হত্যাকাণ্ড’ এবং ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা অভিযোগ করেছে, ইসরায়েলি সেনারা রাফায় ত্রাণের জন্য অপেক্ষারত ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর সরাসরি গুলি চালিয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক তামের কিশতা জানিয়েছেন, ভোর ৫টার দিকে হাজার হাজার মানুষ ত্রাণকেন্দ্রের দিকে এগিয়ে গেলে ভারী গোলাগুলি শুরু হয়। আহতদের অনেককে নাসের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, যেখানে এখনো চিকিৎসা চলছে। 

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের ভেতরে সেনাদের গুলিতে কোনো হতাহতের বিষয়ে অবগত নয় এবং ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তবে তারা এই হামলার দায় অস্বীকার করেনি।

অন্যদিকে, জিএইচএফ দাবি করেছে, তাদের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম কোনো ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে এবং হতাহতের খবর মিথ্যা ও বানোয়াট। তারা এই খবর ছড়ানোর জন্য হামাসকে দায়ী করেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ারভিত্তিক সংস্থা জিএইচএফ গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইসরায়েল সরকারের সমর্থনে পরিচালিত এই সংস্থা জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে গাজায় ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব নিয়েছে। সংস্থাটি গত ২৭ মে থেকে রাফার তেল আল-সুলতান এলাকায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করে। তবে এর কার্যক্রম শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে পড়েছে। 

জিএইচএফ-এর ত্রাণ বিতরণ পদ্ধতি নিয়ে ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ত্রাণপ্রাপ্তদের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতি, যার মধ্যে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি রয়েছে, ব্যবহার করবে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এই পদ্ধতি হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দিতে সাহায্য করবে। তবে ফিলিস্তিনিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, এই প্রযুক্তি তাদের নজরদারি ও দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। 

জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থা জিএইচএফ-এর কার্যক্রমকে মানবিক নীতির লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের (ওসিএইচএ) প্রধান জোনাথন হুইটাল এই কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এটি কোনো মানবিক সহায়তা নয়, বরং যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ত্রাণকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাফার ত্রাণকেন্দ্রের কাছে ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ইসরায়েলি সেনারা সরাসরি গুলি চালায়। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ কাদেইহ সিএনএন-কে বলেন, আমাদের বলা হয়েছিল সকাল সাড়ে ৫টায় গেট খুলবে। কিন্তু তীব্র গোলাগুলি শুরু হলে আমরা ত্রাণের কাছে পৌঁছাতেই পারিনি। যারা সামনে এগিয়েছিল, তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরেকজন ব্যক্তি বলেন, এটি ত্রাণকেন্দ্র নয়, এটি মৃত্যুফাঁদ।

অনেকে অভিযোগ করেছেন, জিএইচএফ সীমিত পরিমাণ ত্রাণ নিয়ে আসে এবং তা বিতরণের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে না। ফলে, ক্ষুধার্ত মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। 

গাজায় চলমান সংঘাতের ফলে মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। এই সংঘাতে এ পর্যন্ত ৫৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। 

চলতি বছরের মার্চ থেকে ইসরায়েল গাজায় ত্রাণ প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা এই অঞ্চলের ২১ লাখ মানুষের জন্য দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রতিদিন ৫০০-৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রয়োজন, কিন্তু গত কয়েক মাসে এর একটি ভগ্নাংশও প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ইউনিসেফ জানিয়েছে, গাজার ১০ লাখ শিশু খাদ্য, পানি, আশ্রয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। 

আলজাজিরা বলছে, রাফা এখন ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুন থেকে ইসরায়েল রাফায় সামরিক অভিযান জোরদার করলে এখানকার বাসিন্দারা আবারও বাস্তুচ্যুত হয়। রাফা সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ থাকায় ত্রাণ প্রবেশ এবং চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। 

এর আগে গত ২৭ মে রাফার তেল আল-সুলতানে জিএইচএফ-এর ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে প্রথম দিনের কার্যক্রমের সময়ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ত্রাণের জন্য ভিড় করলে ইসরায়েলি সেনারা সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে বলে জানায়। সেই ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ৬২ জন আহত হন বলে জাতিসংঘ জানিয়েছিল। গাজা সরকার মিডিয়া অফিস তখন এই ঘটনাকে উদ্দেশ্যমূলক গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করে। 

জাতিসংঘ এবং অন্যান্য ত্রাণ সংস্থা বারবার সতর্ক করে বলেছে, জিএইচএফ-এর ত্রাণ বিতরণব্যবস্থা মানবিক নীতি মেনে চলে না। তারা অভিযোগ করেছে, এই ব্যবস্থা গাজার উত্তরাঞ্চলকে জনশূন্য করার ইসরায়েলি পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। ইউএনআরডব্লিউএ-এর কমিশনার জেনারেল ফিলিপ ল্যাজারিনি এই পদ্ধতিকে ‘অমর্যাদাকর’ এবং ‘অনিরাপদ’ বলে সমালোচনা করেছেন। 

এই ঘটনার পর জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল টম ফ্লেচার বলেছেন, ‘গাজার মানুষকে ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখছে।’ তিনি সীমান্তে অপেক্ষমাণ ত্রাণ প্রবেশের জন্য সব ক্রসিং খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। 

অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ২৭ মে এক বক্তৃতায় বলেন, জিএইচএফ-এর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা হামাসের হাতে ত্রাণ চলে যাওয়া রোধ করবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, রাফায় প্রথম দিন কিছুক্ষণের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা হয়েছিল। 

গাজায় চলমান এই সংকট কেবল ত্রাণ বিতরণের সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ, রাফা ক্রসিং বন্ধ এবং সামরিক অভিযানের ফলে গাজার অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৮০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্য সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে, ক্ষুধা, রোগ এবং চিকিৎসার অভাবে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মৃত্যুহার বেড়েছে। 

জিএইচএফ-এর ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থা এই সংকট সমাধানের পরিবর্তে আরও জটিলতা সৃষ্টি করছে। সীমিত সংখ্যক বিতরণ কেন্দ্রে ত্রাণ বিতরণের ফলে মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। এছাড়া, ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি এবং গুলির ঘটনা ত্রাণ বিতরণকে মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। 

রাফায় ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলা গাজার মানবিক সংকটের একটি মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছে। যুদ্ধ, অবরোধ এবং ত্রাণ বিতরণে বাধার কারণে গাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই সংকট সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এবং ত্রাণ বিতরণে নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যথায়, গাজার জনগণের জন্য এই দুর্ভোগ আরও গভীর হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত