জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, প্রস্তাবিত ২০২৫-২৬ বাজেটে জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। তিনি মনে করেন, এই বাজেট নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনমান উন্নয়নে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকার বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছে, কিন্তু সেগুলোর যথাযথ সমাধান বা বৈষম্যহীন উন্নয়নের ভিশন এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। বাজেট বাস্তবভিত্তিক হলেও নতুন অর্থনৈতিক রূপান্তর ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পূর্বের অর্থনীতির কাঠামো, লুটপাটের ধারা এবং ঋণগ্রস্ত অবস্থার প্রভাব এই বাজেটে স্পষ্ট। সরকারকে এই কাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে, যা বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।’ নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশে ধনী-গরিবের আয় বৈষম্য কমানোর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাজেটে এ বৈষম্য কমানোর কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘করদাতার সংখ্যা বাড়েনি, কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আওতায় আনার কার্যকর পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ অব্যাহত থাকবে।’
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল কর্মসংস্থানের দাবিতে। তরুণদের প্রত্যাশা ছিল বেকারত্বের সমাধান ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ। কিন্তু গত এক বছরে ২৬ লাখ বেকার বেড়েছে, অথচ কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বা উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা এবং পূর্বের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।’
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে নতুনত্বের অভাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা খাতে জিডিপির ন্যূনতম ২ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন, কিন্তু বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ১.৭ শতাংশ। স্বাস্থ্য ও অন্যান্য খাতেও বরাদ্দ বাড়েনি।’
প্রবাসী শ্রমিকদের প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘প্রবাসীদের রেমিট্যান্স অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমানো হয়েছে, যা আমরা নিন্দা করি। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুক্তবাজার নির্ভর বাজেট : বাম জোট
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের তীব্র সমালোচনা করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। তাদের মতে, এই বাজেট গতানুগতিক মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, যা সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হবে। বৈষম্য কমানো, বেকারত্ব হ্রাস, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ সংকট মোকাবিলায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এই বাজেটে নেই। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জোট এই অভিমত ব্যক্ত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বিরাট প্রত্যাশা না থাকলেও সাধারণ মানুষ আশা করেছিল যে বাজেটে তাদের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিফলন থাকবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের জনদাবি যেমন সর্বজনীন রেশন ব্যবস্থা, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা, এবং দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণে বিনিয়োগের কোনো উদ্যোগ বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি।
জোটের নেতারা উল্লেখ করেন, ‘বাজেটে লুটেরা পুঁজিবাদী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য কালো টাকা সাদা করার সংবিধানবিরোধী বিধান রাখা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার শামিল।’
তারা আরও বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলা হলেও বাজেট প্রণয়নের আগে রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, কৃষক সমিতি, এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। এই পরামর্শের মাধ্যমে সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও চাহিদাকে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে পারত।’
বিবৃতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ‘বাজেটে ধরা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। বৈষম্য দূরীকরণে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা না থাকায় বেকারত্ব ও দারিদ্র্য আরও বাড়বে। গত এক বছরে বেকারত্ব বেড়েছে ২৬ লাখ, কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বা শিল্পায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
জোট নেতারা বলেন, ‘কৃষি, গার্মেন্টস, এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই খাতগুলোর জন্য বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট সুখবর নেই। উল্টো প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমানো হয়েছে, যা অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে হতাশাজনক।’
নির্বাচন প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ বছরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের দাবির তুলনায় অর্ধেক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।’
এ ছাড়া, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপের সিদ্ধান্তকে ‘শ্রমিকবিরোধী’ হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাম জোট।
সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ উদ্ধার করে তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। তারা সর্বজনীন রেশন ব্যবস্থা চালু, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা, এবং কৃষি ও এসএমই খাতে ভর্তুকি বাড়ানোর আহ্বান জানায়।
এ ছাড়া, অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনৈতিক দল ও জনগণের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি জনবান্ধব ‘অন্তর্বর্তী বিশেষ বাজেট’ প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
