এক দিন পরেই মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদে পশু কোরবানি করার জন্য রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে ভিড় করছেন নগরবাসী। শেষ সময়ে ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম এবং দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে হাটগুলো। ঢাকার সব হাটেই গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষসহ কোরবানির পশুতে ভরে গেছে। তবে গতবারের তুলনায় এবার গরুর দাম কম হওয়ায় চিন্তিত ব্যাপারীরা।
ব্যাপারী এবং খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর যে গরু দেড় লাখ টাকার ওপর বিক্রি করেছেন, সেই গরু এবার এক লাখ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। বড় গরুর দাম আরও কম। মাঝারি ও ছোট গরুর চাহিদা বেশি থাকায় কিছুটা দাম পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারা। তারা বলছেন, গোখাদ্যের দাম কমেনি, গরু পালনের কোনো খরচ কমেনি। কিন্তু হঠাৎ গরুর দাম কমে যাওয়ার কারণে বড় লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।
গাবতলী হাটে কথা হয় পাবনার নাজমুল হুদার সঙ্গে। তিনি এ হাটে ১০টি গরু নিয়ে এসেছেন। দাম হাঁকিয়েছেন দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে ছোট গরু ১ লাখ ২০ হাজার আর বড় গরু দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দাম বললে বিক্রি করবেন। তিনি বলেন, ‘আমার সব গরুই মাঝারি সাইজের। আজ (গতকাল) সকালে একটা বিক্রি হয়েছে। আশা করি ঈদের আগের দিনের মধ্যে সব বিক্রি করতে পারব। তবে অন্য বছরের তুলনায় দাম কম।’
কমলাপুর হাটে আসা চুয়াডাঙ্গার খামারি আমিরুল ইসলাম সোমবার থেকে গতকাল পর্যন্ত মাত্র দুটি গরু বিক্রি করেছেন। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘হাটে ক্রেতা সমাগমও কম। যারা আসছেন তারাও ন্যায্য দাম বলছেন না। বাধ্য হয়ে কিছু কমে গরু ছাড়তে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। শেষ সময়ে দাম যদি আরও নেমে যায় তবে লোকসানে পড়ে যাব।’
সরেজমিনে রাজধানীর গাবতলী হাটে গতকালও ট্রাকে করে গরু-ছাগল আসতে দেখা গেছে। সারি সারি গরু-ছাগল সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। নিরাপত্তার কাজে তৎপর পুলিশ-র্যাব সদস্যরাও। হাটে ঢুকতেই চোখে পড়বে বিশাল এক তোরণ। কোরবানির পশু আনা-নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ট্রাক-পিকআপ। গতকাল দুপুরের পর থেকেই এ হাটে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
ক্রেতা-বিক্রেতা দরদামে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। হাটে ঘুরে ঘুরে সাধ্যের মধ্যে ভালো কোরবানির পশু কেনার নিরন্তন চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রেতারা। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ লাভে পশু বিক্রির জন্য চেষ্টা করছেন বিক্রেতারাও। কিন্তু তাদের অভিযোগ, এবার কাক্সিক্ষত দামের অনেক কমে গরু বিক্রি হচ্ছে। চার থেকে পাঁচ মণ ওজনের এবার গরু ১ লাখ ২০-৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এমন ওজনের গরু বিক্রি করেছিলেন ১ লাখ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়।
এদিকে গাবতলী হাটে এবারও এসেছে মরুর উট। ভারতের রাজস্থান থেকে আনা বিশালদেহী পুরুষ উটটি হাট জুড়ে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রেতার চেয়ে উটের দর্শনার্থীই বেশি। উটের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ কেউ ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট বানাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মাইকে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়ার পাশাপাশি এবার হাটে রয়েছে একটি উটও। ১০ ফুটের বেশি উচ্চতা ও ২৮ মণ ওজনের উটটির দাম শুরুতে হাঁকা হয়েছিল ২৮ লাখ টাকা। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ লাখে। উট বিক্রেতা মকবুল ইসলামের দাবি, এটাই শেষ উট, এরপর আর আসবে না। দর উঠলে ৩০ লাখের ওপরে গিয়েও বিক্রি হতে পারে।
রাজধানীর ঢাকার মতিঝিল এলাকায় কমলাপুর পশুর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে করে কোরবানির পশু নিয়ে আসছেন বিক্রেতারা। স্থানীয় কিছু লোকজনও হাটে এসেছেন গরু দেখতে। এর মধ্যে দুয়েকটা গরু বিক্রিও হয়েছে। কেউ আবার দামাদামি করছেন। তবে ক্রেতার সংখ্যা হাতেগোনা। বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, কয়েক দিন ধরে এ হাঁটে বেচাবিক্রি কম।
কোরবানির গরু কেনার জন্য হাটে এসেছেন শান্তিনগরের বাসিন্দা রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘আমরা ছোট সাইজের মধ্যে গরু খুঁজছি। চাহিদা অনুযায়ী গরুর অভাব নেই। কিন্তু ব্যাপারীরা দাম ছাড়ছে না। হাতে যেহেতু দুদিন সময় আছে, দেখেশুনে সময় নিয়ে কিনব। আরও কয়েকটা হাট দেখি।’
পাশেই ব্যাপারীর সঙ্গে দরদাম করছিলেন তৌহিদ ইসলাম নামে আরেক ক্রেতা। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় দাম স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আমি বড় একটি গরু এ হাট থেকে দুদিন আগে কিনে রেখেছি। আরও একটা লাগবে। আশা করি বাজেট অনুযায়ী পেয়ে যাব।’
এদিন সকালে দুর্গাপুর থেকে ১৪টি গরু নিয়ে এসেছেন আব্দুল হালিম নামে আরেক খামারি। তিনি বলেন, ‘হাটে আশার পর কয়েকজন দামাদামি করেছেন। দাম মোটামুটি ভালোই বলছে। পাঁচ-দশ হাজার টাকা নিয়ে দরকাষাকষি চলছে। আমার গরু একদম সলিড। কোনো ঝামেলা নেই। যে দেখবে তারই পছন্দ হবে।’
শেষ সময় বিক্রি হবে আশা বিক্রেতাদের : রুবেল মন্ডল নামে এক খামারি বলেন, ‘তিন দিন হলো ৪০টা গরু নিয়ে হাটে এসেছি। মাত্র দুটি বিক্রি হয়েছে। হাট এখন জমেনি। অনেক সরকারি চাকরিজীবী আজকে (গতকাল) বেতন পাবেন বলে শুনেছি। আবার অনেকে বেশি দিন বাসাবাড়িতে গরু রাখতে পারে না। তারা হাটে এলে গরু থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবার গরুও কম, ক্রেতাও কম।’
মানিকগঞ্জ থেকে আসা আজগর মিয়ার মতে, বৃহস্পতি ও শুক্রবার ঢাকার স্থানীয় ক্রেতারা হাটে আসবে। এখন যারা আসে, তারা অনেকে দাম দেখে যায়; তারা শেষ সময়ে কিনবে। শেষ সময়ে গরু দাম কমে গেলে কী করবেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড় গরুর দাম কমে। যেগুলো অ্যাভারেজ সাইজ এগুলো দাম স্বাভাবিক থাকে। আর এবার ভারতীয় গরু আসেনি। বৃষ্টি, বন্যা না হলে ন্যায্য দামই পাবেন বলে আশা করেন তিনি।
হাটের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ ক্রেতা-বিক্রেতার : কমলাপুর, গোপীবাগ ও মুগদা এলাকার সমন্বয়ে কমলাপুর পশুর হাটটি বেশ কয়েকটি স্থানে বসানো হয়েছে। কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো দায় তাদের নেই বলে জানালেন বিক্রেতারা। রাজধানীর বিভিন্ন হাটে আসা গরুর ব্যাপারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার করা হয় না। কাদাপানিতে একাকার হয়ে থাকলেও হাট কর্তৃপক্ষের কেউ খোঁজও নেয় না। তারা যেখানে গরু বা ছাগল বেঁধে রাখছেন, তার আশপাশেই বর্জ্য স্তূপ করে রাখছেন তারা।
রফিকুল ইসলাম নামে এক বিক্রেতা বলেন, হাটে আমাদের যেখানে জায়গা দেওয়া হয়েছে, সেখানে পানি জমে থাকে। মাঠ কর্তৃপক্ষকে বলেছি বালু দিতে। তারা দেয় না। পানি বালতিতে উঠিয়ে ফেলে আসতে হয়। বৃষ্টি হলে বা পানি ব্যবহার করলে তা জমে থাকে।
আফতাব হোসেন নামে এক ক্রেতা বলেন, মলমূত্র কাদাপানিতে একাকার হয়ে আছে কমলাপুরের সব হাট। সংশ্লিষ্টদের উচিত এদিকে নজর দেওয়া।
পশুর হাটে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা : গতকাল দুপুরে রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবসংলগ্ন কোরবানির পশুর হাটে পরিদর্শনে আসেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে এবার কোরবানির প্রতিটি হাটে বিপুলসংখ্যক আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি ইজারাদারদের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অসুস্থ পশু যেন হাটে ঢুকতে না পারে সেজন্য চেকআপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ অসুস্থ বা আহত হলে যেন চিকিৎসা নিতে পারে, সেজন্য মেডিকেল টিম রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে এবারের কোরবানির ঈদের হাট ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক প্রস্তুতি অত্যন্ত ভালো।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি গরুর এমন একটা স্বাভাবিক দাম থাকুক যেখানে কৃষক বা খামারি লাভবান হয় এবং ক্রেতাও লাভবান হয়। যাতে উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষিত হয় এবং কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রত্যেকটা কোরবানির পশুর ট্রাকের সামনে লেখা থাকবে ট্রাক কোন হাটে যাবে এবং এ-সংক্রান্ত ব্যানার টানানো থাকবে। যদি কেউ এর ব্যত্যয় করার চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
দিয়াবাড়ীতে মিরকাদিমের গরু : উত্তরার দিয়াবাড়ী হাটে এবার বিখ্যাত মিরকাদিমের ধবল ক্রস জাতের গরু উঠেছে। তবে এগুলো মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম থেকে আনা হয়নি। গায়ের রঙও খানিকটা গোলাপি। খামারি উজ্জ্বল হোসেন জানান, রাজবাড়ীর পাংশা থেকে আনা এ গরুগুলো নিজস্ব খামারে বড় হয়েছে। প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা হয়েছে। এর গায়ের রঙ এমনভাবে গোলাপি হয়েছে, অনেকেই প্রথমে দেখে অবাক হয়ে যান। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, রঙ করা কি না।
তিনি বলেন, এ বছর আমি পাঁচটি গরু বিশেষভাবে লালন-পালন করে হাটে নিয়ে এসেছি। প্রতিটি গরুই আমার নিজ খামারের, কোনো ধরনের স্টেরয়েড বা কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করিনি। আকার, ওজন আর শারীরিক গঠনের ভিত্তিতে গরুগুলোর দাম ৫ লাখ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ধরা হয়েছে।
এ হাটে গরু কিনতে এসেছেন আলম মুন্সী। তিনি জানান, পাঁচ মণের বেশি ওজনের একটি গরু তার পছন্দ হয়েছে। ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বলেছেন। কিন্তু ব্যাপারী দেড় লাখের কম ছাড়ছেন না। এর মাঝামাঝি একটা দামে পৌঁছাতে বিক্রেতার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলে তার ফোন নম্বর নিয়ে চলে যান আলম মুন্সী।
তাছাড়া অন্য হাটেও প্রচুর গরু উঠেছে বলে জানা গেছে। তেজগাঁও হাটের ইজারাদার মুনিরুজ্জামান বলেন, আজ (গতকাল) হাটে তিলধারণের জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রচুর গরু বিক্রি হচ্ছে। এ হাটে ছোট-মাঝারি সাইজের গরু বেশি হলেও বড় গরুও রয়েছে।
রাজধানীর বসিলা হাট ছোট গরুর জন্য বিখ্যাত। এ হাটে তুলনামূলক ছোট গরু বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ঝিনাইদাহের ব্যাপারী জমির হোসেন বলেন, সোমবার ছোট সাইজের ১৭টি গরু নিয়ে এসেছেন। বুধবার পর্যন্ত ১২টি বিক্রি হয়ে গেছে। লালবাগের রহমতগঞ্জ ফ্রেন্ডস সোসাইটি হাটের ইজারাদার টিপু সুলতান বলেন, ‘হাটে গরু-ছাগল বিক্রি শুরু হয়েছে। মাঝারি সাইজের গরুর বিক্রি বেশি।’
