লর্ডসে চলছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি ক্রিকেটের চোকার্স দক্ষিণ আফ্রিকা। এই ফাইনাল শুধু টেস্ট ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীকই নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী ও রোমান্টিক ফরম্যাটকে উদযাপন করার বড় উপলক্ষও। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাস ১৪৮ বছরের, আর এই দীর্ঘ সময় ধরেই এটি ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। তবে গত দুই দশকে অনেক দেশে এর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে।
সাদা পোশাকে খেলার জনপ্রিয়তা হ্রাসের পেছনে সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বিশেষত টি-টোয়েন্টি বড় ভূমিকা রেখেছে। অনেক বোর্ডের কাছে টেস্ট এখন এক ধরনের বোঝা, যা দর্শকশূন্য গ্যালারি আর অর্থনৈতিক ক্ষতির শঙ্কা তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে বিবিসি স্পোর্টস কথা বলেছে ক্রিকেট বিশ্বের অভিজ্ঞ কিছু ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। জানতে চেয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটের আর্থিকভাবে টিকে থাকার বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ: কাজের কাজ কতটা?
আইসিসির সাবেক চেয়ারম্যান গ্রেগ বার্কলেইয়ের মেয়াদকালে চালু হওয়া বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ছিল আধুনিক যুগের দর্শকদের টেস্টে আকৃষ্ট করার প্রয়াস। প্রতি চক্র চলে দুই বছর। ছয়টি সিরিজ খেলে প্রতিটি দল। তিনটি ঘরের মাঠে, তিনটি বাইরে। একটি জয় মানে ১২ পয়েন্ট, ড্রতে ৪, টাই হলে ৬। তবে প্রতিটি দল সমানসংখ্যক ম্যাচ না খেলায় র্যাংকিং নির্ধারণ হয় প্রাপ্ত পয়েন্টের শতকরা হারে।
বার্কলেই বললেন, ‘ফরম্যাটটা অনেক সমালোচনা পেয়েছে, তবু কিছু একটা তো করতেই হতো। অন্তত একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, দর্শকের অংশগ্রহণ বেড়েছে।’
তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক প্রধান নির্বাহী জনি গ্রেভ মনে করেন, এই চ্যাম্পিয়নশিপে ‘খেলাধুলার ন্যায্যতা’ এখনো আসেনি—সব দল সমান ম্যাচ খেলছে না, নেই সমান রাজস্ব বণ্টন বা কেন্দ্রীয় বিপণন। এমনকি সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দ্বৈরথ—ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ—এই টুর্নামেন্টে হয়ই না।
টেস্ট খেলছে না আফগানিস্তান-আয়ারল্যান্ড-জিম্বাবুয়ে
তিনটি টেস্ট খেলুড়ে দেশ—আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ে—এই প্রতিযোগিতার বাইরেই। আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেট প্রধান ওয়ারেন ডিউট্রোম সোজাসাপটা উত্তরে বলেন, ‘ভবিষ্যতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে আয়ারল্যান্ডের অংশগ্রহণে আমার কোনো আপত্তি নেই, তবে আইসিসির বাড়তি অর্থায়ন ছাড়া তা সম্ভব নয়। টাকা না বাড়লে আমরা এটা সিরিয়াসলি ভাবব না।’
খেলোয়াড়েরা কেন মুখ ঘোরাচ্ছেন টেস্ট থেকে?
ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলোতে টেস্ট খেলে এখনো আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকা যায়। ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকসের বার্ষিক চুক্তি ২.৪৭ মিলিয়ন পাউন্ড। কিন্তু বেশিরভাগ বোর্ডই এ ধরনের সুবিধা দিতে পারে না। ফলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরা ঝুঁকছেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দিকে।
দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের সেরা খেলোয়াড়দের দেশের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগে খেলাতে পাঠিয়ে নিউজিল্যান্ড সফরে পাঠায় দ্বিতীয় সারির দল। এদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিকোলাস পুরান—যিনি কখনোই টেস্ট খেলেননি—মাত্র ২৯ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন। শুধুমাত্র আইপিএলে তিনি পান ২৫ লাখ ডলার।
এই প্রেক্ষাপটে আইসিসি যদি টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আলাদা ফান্ড গঠন করে খেলোয়াড়দের আর্থিকভাবে অনুপ্রাণিত করে, তাহলে কি পরিবর্তন আসবে? জনি গ্রেভ মনে করেন, এটা নিয়ে ভাবতেই হবে। ‘খেলোয়াড়েরা এখন পেশাগত নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেয়।’
নতুন বাজারে টেস্টের সম্ভাবনা?
২০০৭ সালে আইসিসির তৎকালীন সিইও ম্যালকম স্পিড বলেছিলেন, ‘আমার স্বপ্ন, একদিন ভারত ও চীনকে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে দেখব।’ এখন পর্যন্ত চীনে টেস্ট নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই। তবে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—একসময় যে দেশে বিশ্বস্নুকারের কোনো চ্যাম্পিয়ন ছিল না, সেখানে এখন আছে ৩ লক্ষ স্নুকার হল।
আইসিসির সাবেক চেয়ারম্যান বার্কলেই মনে করেন, আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের মতো দলকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি এটি অনেক আর্থিক দায়ও তৈরি করে। পূর্ণ সদস্য মানেই বড় বাজেট, বড় কাঠামো। নেপাল, আমেরিকা, ইউএই ও স্কটল্যান্ডকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাদের জন্য এখনই আলাদা কোনো আর্থিক প্রণোদনা নেই।
রাজস্ব বণ্টনে বৈষম্য: ‘বড় থ্রি’র আধিপত্য?
ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের টেস্ট ম্যাচগুলো এখনো বিপণনযোগ্য, ব্রডকাস্টিং ও স্পনসরশিপে আয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ইংল্যান্ডের স্কাই স্পোর্টসের সঙ্গে চুক্তির পরিমাণ ৮৮০ মিলিয়ন পাউন্ড। তবে বাকি দলগুলোর অবস্থা করুণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা পাকিস্তানের মতো দলগুলোর র্যাংকিং পতন এসেছে ধীরে ধীরে—২০০১ সালে স্যাটেলাইট টিভির আগমনের পর থেকেই, দাবি গ্রেভের। তার মতে, এই বৈষম্য ঘোচাতে হলে পুরো রাজস্ব বণ্টন কাঠামোতে বড় সংস্কার প্রয়োজন। না হলে, ভবিষ্যতে কেবল তিন দেশই খেলবে টেস্ট।
টেস্ট কি হতে পারে চারদিনের?
২০১৯ সালের পর থেকে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বাইরে তিন ম্যাচের কোনো টেস্ট সিরিজই দেখা যায়নি। ম্যাচের মাঝে বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তা, সম্প্রচার ব্যয়, দর্শক আকর্ষণ সবকিছুকে বিবেচনায় এনে চারদিনের টেস্ট চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন অনেকে। বার্কলেই মনে করেন, ‘টেস্টের ভবিষ্যৎ ধরে রাখতে হলে এমন সব বিকল্প ভাবনাও টেবিলে রাখা উচিত।’
জনি গ্রেভ প্রস্তাব করেছেন, তিন সেশন করে ২৫ ওভারের এবং প্রতি ওভারে ৮ বল করে খেলতে পারে দলগুলো। এতে টেস্টে প্রয়োজনীয় ৪০০ ওভার পূরণ হবে, এবং প্রতিটি দল দুই ইনিংস খেলার সুযোগ পাবে।
তাহলে কি টেস্ট ক্রিকেট টিকবে?
টেস্ট ক্রিকেটের টিকে থাকার মূলমন্ত্র হতে পারে এর ঐতিহ্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন মানুষের পছন্দ বদলায়, তেমনি টি-টোয়েন্টি দিয়ে শুরু করে অনেকে পরে টেস্টের প্রতি আকৃষ্ট হন। বার্কলেই বলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেট ক্রিকেটের আত্মা। এটি হারিয়ে যাওয়া মানে হবে ক্রিকেটের এক অমূল্য ধন হারানো।’
তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান কাঠামোতে এই ফরম্যাট আর্থিকভাবে টেকসই নয়। সংস্কার না এলে, ভবিষ্যতে কেবল তিনটি দেশই হয়তো খেলবে সাদা পোশাকে। তবু, আইরিশ ক্রিকেট প্রধান ডিউট্রোম মনে করেন, এই ফরম্যাট অর্থের আগে ভালোবাসা দিয়ে দেখা উচিত। ‘আমরা এই খেলাকে ভালোবাসি। এটি আমাদের যাত্রার প্রতীক। অর্থের আলোচনা হোক, তবে আগে আসুক আবেগ।’
এই দীর্ঘ যাত্রায় কেউ বলছেন—‘টেস্ট ক্রিকেটের আত্মা’, কেউ বলছেন—‘অবশ্যই টিকে থাকতে হবে।’ অর্থনীতি জর্জরিত হলেও এর মহিমা আজও অক্ষুণ্ণ। প্রশ্নটা তাই শুধু টাকার নয়, বরং ভালোবাসা, ঐতিহ্য ও দায়বদ্ধতার।
এক দুঃখ কাটেনি, তার আগেই আরেক দুঃখ মিতুলের
বিশ্বকাপে জায়গা করে ইতিহাস গড়া উজবেক ফুটবলাররা উপহার পেলেন গাড়ি
বিশ্বকাপের বাকি আর ৩৬৫ দিন