সন্তান আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত। সন্তানের সঠিক পরিচর্যা করা প্রতিটি মা-বাবার জন্য ফরজ দায়িত্ব। সন্তানের পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠা, তার বিশ্বাস, চারিত্রিক গঠন, আখলাক-আদব এবং নৈতিক দৃঢ়তা অর্জন সবকিছুই অভিভাবকের দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতার ওপর নির্ভর করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান কেবল দুনিয়ার উপকরণ নয়, বরং আখেরাতের পুঁজি, সদকায়ে জারিয়ার বাহক এবং একজন ধার্মিক উত্তরসূরি হিসেবে মা-বাবার জান্নাতের মাধ্যম হতে পারে। আবার অবহেলা ও অবজ্ঞা যদি সন্তানের বেড়ে ওঠার ভিত্তি হয়, তাহলে সেই সন্তান হতে পারে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। সুতরাং সন্তান প্রতিপালন কোনো সাধারণ দায়িত্ব নয়, বরং এটা এক পবিত্র আমানত, যার হিসাব আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।
আজকের সমাজে এই আমানতের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আধুনিকতার মোড়কে সন্তানদের দুনিয়াবি সাফল্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা প্রায় ভুলে গেছি, তাদের অন্তরে ইমান ও দ্বীনদারিত্ব গঠনের বিষয়টি। কোরআন শেখানো, নামাজে অভ্যস্ত করা, হালাল-হারামের পার্থক্য বোঝানো, আদব-কায়দায় ইসলামি স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা এসব মৌলিক দ্বীনি শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেওয়ার বদলে আমরা যেন বিজাতীয় সংস্কৃতির চক্রে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছি। অথচ শিশুর প্রথম পাঠশালা হলো তার মা, তার প্রথম আদর্শ হলো পরিবার। এই পারিবারিক পর্যায়ে ইসলামি শিক্ষার বুনিয়াদ না গড়ে দিলে দুনিয়াতে সেই সন্তান যত সফলই হোক না কেন, আখেরাতে তা পরিণত হবে ভয়ংকর ক্ষতির রূপে। তাই প্রয়োজন, সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ইসলামি রূপরেখা অনুসরণ করা, যার মাধ্যমে তারা হয়ে উঠবে দ্বীনদার, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ এক পরিপূর্ণ মানুষ।
সন্তান নিজের আমল দিয়ে যেমন মা-বাবার জন্য জান্নাতের দ্বার খুলে দিতে পারবে, তেমনি হতে পারবে উম্মাহর একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। এ বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা, হাদিসের শিক্ষা ও মা-বাবার দায়িত্ব সম্পর্কে বিবরণী উল্লেখ করা হলো। সুসন্তান যেমন মা-বাবার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের বড় সম্পদ এবং সদকা জারিয়া, তেমনি সন্তান যদি দ্বীন ও শরিয়তের অনুগত না থাকে, দুর্নীতি ও গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে যায়, তাহলে সে উভয় জগতেই মা-বাবার জন্য বিপদ। দুনিয়াতে লাঞ্ছনা ও পেরেশানির কারণ। আর কবরে থেকেও মা-বাবা তার গুনাহের ফল ভোগ করতে থাকবে। আখেরাতে এই আদরের সন্তানই আল্লাহর দরবারে মা-বাবার বিরুদ্ধে নালিশ করবে যে, ‘তারা আমাকে দ্বীন শেখায়নি, তাদের দায়িত্ব পালন করেনি’। তাই এই আমানতের হক আদায়ের প্রতি খুবই যতœবান হতে হবে।
একজন মুসলিম তার সন্তানকে আল্লাহর কালাম শেখাবে না, এটা কল্পনাও করা যায় না। বাস্তবতা হলো, এদেশের অধিকাংশ মুসলমানের অবস্থা অন্যরকম। লাখ লাখ টাকা খরচ করে সন্তানের বড় বড় ডিগ্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে, কিন্তু কোরআন শেখানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। সন্তানকে কোরআন শেখায় না, এমন মা-বাবার হার যদি শতকরা ৫০ ভাগ হয়ে থাকে, তবে দ্বীন শেখায় না, এদের হার শতকরা ৭০ ভাগ। নামাজ কীভাবে পড়বে তাও শেখায় না। হালাল-হারাম, পাক-নাপাক, অজু-গোসল তো দূরের কথা। অথচ সন্তানকে দ্বীনের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শেখানো পিতা-মাতার ওপর ফরজ। শিশুর প্রথম পাঠশালা হচ্ছে মায়ের কোল। এখানে সে জীবনের অনেক কিছু শেখে। পরবর্তী সময়ে এটাই তার অভ্যাসে পরিণত হয়। ইসলামে এই পাঠশালার অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুঃখজনক হলো, বর্তমানে শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় স্মার্টফোন বা টেলিভিশন দিয়ে। ইসলামের নির্দেশনা হলো, ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুর ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেবে। যেন তার জীবন শুরু হয় আল্লাহর বড়ত্বের বাণী ‘আল্লাহু আকবার’ দিয়ে। এরপর মা-বাবার দায়িত্ব হলো, সন্তানের ভালো অর্থবোধক নাম রাখা। বাচ্চা কথা বলা শিখলে তাকে সর্বপ্রথম আল্লাহর নাম শেখানোর চেষ্টা করা। যিনি এই সন্তান দান করলেন, এরপর বাকশক্তি দিলেন তার নাম সর্বপ্রথম শেখানোই কৃতজ্ঞ বান্দার পরিচয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “সন্তানকে প্রথম কথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শেখাও এবং মৃত্যুর সময় তাদের লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর তালকিন (মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কালেমা স্মরণ করানো এবং তাকে কালেমা পাঠ করার দীক্ষাকে তালকিন বলা হয়) করো।’ (শুয়াবুল ইমান)
শিশুকে ধীরে ধীরে ছোট ছোট আদব-কায়দা, যেমন ডান হাতে তিন শ্বাসে বসে পানি পান করতে শেখানো। জুতা পরিধান করতে আগে ডান পা এবং খোলার সময় আগে বাম পা খোলা। বাথরুমে ঢোকার সময় আগে বাম পা, বের হওয়ার সময় ডান পা ইত্যাদি শেখার উত্তম সময় এই শৈশবই। ঘুমের দোয়া, ঘুম থেকে ওঠার দোয়া, খাওয়ার দোয়া ইত্যাদি সহজ বিষয় এবং ছোট ছোট ব্যবহারিক সুন্নতে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলার সময় এখনই। সন্তানের আখলাক-চরিত্র গড়ার দায়িত্ব মা-বাবার। সময়মতো তাকে শাসন করা, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা, সৎ ও দ্বীনি পরিবেশে রাখা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাজের আদেশ দাও, দশ বছর বয়সে নামাজের জন্য শাসন করো এবং এ বয়সে তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (আবু দাউদ) সন্তানকে একেবারে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না, বরং বোধসম্পন্ন হওয়া থেকেই তাকে পরিমিত শাসনের মধ্যে রাখার ব্যাপারে এই হাদিস সুস্পষ্ট দলিল। এ ছাড়া আরও অসংখ্য বর্ণনায় রয়েছে, মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানকে দ্বীন শেখানো, মন্দ কাজ ও মন্দ পরিবেশ থেকে দূরে রাখা। শুধু কি তাই? সন্তানের পরিণত বয়সে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করাও মা-বাবার দায়িত্ব। যেন তারা কোনো পাপাচারে লিপ্ত না হয়।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
