সিসার বিষে সাড়ে ৩ কোটি শিশু

আপডেট : ২০ জুন ২০২৫, ০৬:০০ এএম

ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু সিসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত। এর একটি বড় উৎস হলুদ গুঁড়াতে থাকা লেড ক্রোমেট। এমন তথ্য জানিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) বলেছে, তাদের গবেষণার ফলস্বরূপ সরকার লেড ক্রোমেট আমদানি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয়। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হলুদে সিসার দূষণ ২৭ শতাংশ থেকে শূন্য শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার আইসিডিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ রিসার্চ গ্রুপ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআর,বি ইটভাটার ধোঁয়া কমানোর জন্য উদ্ভাবনী ও কম খরচের সমাধানও উপস্থাপন করে। সেখানে বলা হয়, এই ভাটাগুলো বার্ষিক কার্বন ডাইঅক্সাইডের ১১ শতাংশ এবং ঢাকা শহরের বায়ুদুষণের পিএম২.৫-এর ৫ শতাংশের জন্য দায়ী। নতুন উদ্ভাবন প্রয়োগের কারণে কয়লার ব্যবহার ২৩ শতাংশ এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড ও পিএম২.৫ নির্গমন ২০ শতাংশ কমেছে।

আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় আরও বলা হয়, পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে ১৫ শতাংশ কৃষি শ্রমিকের হিট এক্সেনশন হয় ও ১০ শতাংশ হিট স্ট্রোকের শিকার হন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে গত ২০০৪ সাল থেকে এখন প্লাস্টিক উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪৩ কোটি টনে পৌঁছেছে। প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় ব্যক্তিগতভাবে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিহার ও প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক বেছে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। গবেষণায় কমিউনিটি পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও আলাদা করার সুসংগঠিত উদ্যোগ, শিল্পের জন্য পরিবেশবান্ধব মোড়ক ব্যবহার এবং সঠিক পরিস্রাবণ ব্যবস্থা গ্রহণ, নীতিগত পর্যায়ে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া ও উৎপাদকদের দায়িত্ব বাড়ানো বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, আমাদের গবেষণা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা আবর্জনার স্তূপ এবং সিসার মতো নীরব দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর কারণে পুষ্টির অভাব, অপুষ্টি এবং এমনকি মস্তিষ্কের বিকাশেও সমস্যা হয়। তাই মানুষের ভালো থাকার জন্য এসব পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি।

এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ প্রোগ্রামের প্রধান ও প্রকল্প সমন্বয়ক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, এখান থেকে উৎপন্ন ব্যাকটেরিয়া আন্ত্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং অপুষ্টির কারণ হতে পারে।

অনুষ্ঠানের গবেষণা প্রদর্শনী পর্বে ৫০০টিরও বেশি জমা পড়া অ্যাবস্ট্রাক্টের মধ্য থেকে সেরা তিনটি রিসার্চ পেপার উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারহানা মুস্তারিনের ‘নগর তাপ হ্রাস : ঢাকায় তাপপ্রবাহ সহনশীলতার জন্য প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণায় ঢাকার ঘনবসতি এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট তাপপ্রবাহের ঝুঁকি কমাতে ছাদবাগান ও রাস্তার পাশের সবুজায়নের মতো প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের প্রস্তাব করেন।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শাবিহা সুলতানা নূহা ‘বর্জ্য থেকে সম্পদ : খাদ্য বর্জ্য থেকে বায়োডিগ্রেডেবল কাটলারির উদ্ভাবন’ শীর্ষক গবেষণায় কলার খোসা, ধানের তুষ এবং কাঁঠালের বীজের মতো খাদ্যবর্জ্য ব্যবহার করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব খাওয়ার সরঞ্জাম (চামচ, ছুরি ইত্যাদি) তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। ঢাকায় পরিচালিত ভোক্তা জরিপে দেখা যায়, এই সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব সমাধানটির প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শরাফ নওয়ারের ‘ঢাকার ল্যান্ডফিল থেকে প্লাস্টিক-হ্রাসকারী সিউডোমোনাস : বৈশ্বিক প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি প্রতিশ্রুতিশীল পদ্ধতি’ শীর্ষক গবেষণায় ঢাকার ল্যান্ডফিল থেকে পৃথক করা সিউডোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার প্লাস্টিক হজম করার ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়, যা প্রচলিত বর্জ্য নিষ্পত্তির একটি টেকসই বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থার দিক পরিবর্তনে অণুজীবের ভূমিকা স্পষ্ট করে তোলে।

এ ছাড়া পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও সমাধানগুলোকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরতে একটি আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রতিযোগিতায় জমা পড়া ১ হাজার ১০০-এরও বেশি ছবি থেকে সেরা ১০টি ছবি প্রদর্শনীতে স্থান পায় ও বিচারকদের রায়ে শীর্ষ তিনজন ফটোগ্রাফার মো. আল-আমিন ইসলাম, মো. শাজাহান ও কাজী আরিফুজ্জামানকে পুরস্কৃত করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ ও বিশেষ অতিথি পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামান।

অনুষ্ঠানের শেষে পরিবেশবান্ধব সেরা উদ্যোগ এবং অসাধারণ অবদানগুলোর জন্য পুরস্কৃত করা হয়। পোস্টার উপস্থাপনার জন্য সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন রুবিনূর ইসলাম (শ্রেষ্ঠ পোস্টার), রয়েল হোসেন, তাশফিয়া হাসান, নাজিফ মুহাম্মদ, আনোয়ার হোসেন রায়হান, বুশরা হামিদ, নাফিসা আবেদীন, জয়শ্রী কর্মকার, মো. নাজিফা ইশরাত তাসনিম এবং তাশদিকা মাহদী হোসেন। রিসার্চ অ্যাবস্ট্রাক্টের মৌখিক উপস্থাপনার জন্য সম্মানিত হন শারাফ নাওয়ার (শ্রেষ্ঠ উপস্থাপক), ফারহানা মুস্তারিন ও শাবিহা সুলতানা নুহা।

আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার বিজয়ীরা হলেন মো. আল-আমিন ইসলাম, মোহাম্মদ শাহজাহান ও কাজী আরিফুজ্জামান। এ বিভাগে সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন মো. শহীদুল আলম, ডা. কুমার বিশ্বজিৎ সূত্রধর, মো. আহিদুল হাসান, মো. জাবেদ নূর শান্ত, বিধান চন্দ্র দাস, মোহাম্মদ শাহজাহান ও মোহাম্মদ সুম্মন।

পরিবেশবিষয়ক অনুপ্রেরণাদায়ী উদ্যোগের জন্য সম্মানিত করা হয় হোপ ইন হার হ্যান্ডস (সংগঠন) এবং মাহমুদ রহমানের (ব্যক্তি) ফিফটি ফাইভ কদমতলা উদ্যোগকে। হ্যাশট্যাগ রিতআর্থ রিবার্থ সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়ে সম্মাননা পেয়েছেন অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ, ইয়াসমিন আক্তার ও আর কে সোহান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত