ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিবন্ধন আবেদন করার শেষ দিনে নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর ভিড় পড়ে নির্বাচন কমিশনে। নিবন্ধনপ্রত্যাশী দলের নেতারা প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে কেউ এসেছেন ঘোড়ার গাড়িতে, কেউবা ট্রাকে। কেউ কেউ আবার চুপিসারে এসে আবেদন জমা দিয়ে গেছেন। এ সময় দলগুলো শীর্ষ নেতা ও কর্মী-সমর্থকরাও উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শেষ দিন গতকাল রবিবার পর্যন্ত ১৪৭টি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদায় নেয় আউয়াল কমিশন। ওই বছরের নভেম্বরে গঠন হয় এ এম এম নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। নতুন রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দিতে গত ১০ মার্চ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে ইসি। ২০ এপ্রিলের মধ্যে আবেদন করে ৬৫টি নতুন রাজনৈতিক দল। এরপর এনসিপিসহ ৪৬টি দলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দলের নিবন্ধন আবেদনের সময়সীমা দুই মাস বাড়িয়ে ২২ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী গতকাল পর্যন্ত ১৪৭ দল নিবন্ধন পেতে আবেদন করে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিবন্ধনপ্রত্যাশী ছিল ৭০টি। গতকাল যেসব দল আবেদন করেছে, তার মধ্যে রয়েছে এনসিপি, আম জনগণ পার্টি, জনতা পার্টি বাংলাদেশ (জেপিবি), গণদল, বাংলাদেশ জনজোট পার্টি (বাজপা) ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল)।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের আবেদন জমা দিয়েছে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নিবন্ধন শর্ত পূরণ করতে যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন, তা ট্রাকে করে নির্বাচন ভবনে নিয়ে আসে দলটি। প্রতীক হিসেবে শাপলা, কলম অথবা মোবাইল চেয়েছে তারা।
নিবন্ধন আবেদন জমাদান শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এনসিপির পক্ষ থেকে দল নিবন্ধনের জন্য যেসব কাগজপত্র এবং সব শর্তাবলি পূরণ করে আমাদের আবেদন নির্বাচন কমিশন বরাবর দাখিল করেছি এবং আমরা নির্বাচন কমিশনের যে শর্তাবলি রয়েছে, সেই শর্তাবলির অধিকাংশ পূরণ করেছি। ১০৫টি উপজেলা, ২৫টি জেলা কমিটি হয়েছে আমাদের। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় ২০০ সমর্থকের যে ফরম পূরণ করতে হয়, প্রতিটি জেলায় যে অফিস নিতে হয় এবং তার যে চুক্তিপত্র, সেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছি। এ ছাড়া খসড়া যে গঠনতন্ত্র, যা আগের দিন আমাদের সাধারণ সভায় পাস হয়েছে, সব কাগজপত্র একসঙ্গে নির্বাচন কমিশন বরাবর জমা দিয়েছি। আমরা আশাবাদী, দ্রুত সময়ের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিবন্ধন পাবে। নিবন্ধিত দল হিসেবে জনগণের কাছে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘দলীয় প্রতীক হিসেবে তিনটি মার্কা চেয়েছি শাপলা, কলম ও মোবাইল। আমাদের প্রথম পছন্দ শাপলা। আমরা আশা করি, জনগণের মার্কা হিসেবে, গণঅভ্যুত্থানের মার্কা হিসেবে শাপলা নাগরিক পার্টি পাবে। শাপলা মার্কা নিয়েই আমরা জনগণের মধ্যে কাজ করব। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।’
নাহিদ বলেন, ‘আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেছি, কথা বলেছি। প্রবাসী ভোটাধিকারের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। সেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টির যে প্রস্তাবনা, তা নিয়ে জোর দাবি জানিয়েছি, যাতে প্রবাসীদের ভোটাধিকার যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা হয়। তবে ওনারা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি কোন প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে। ওনারা বলেছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে।’
কেন জাতীয় ফুলকে দলের প্রতীক হিসেবে চাইছেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নাহিদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের যে আইন, সেগুলো পর্যালোচনা করেছি। আমরা দেখেছি, সে আইনগুলোয় এ রকম কোনো বাধা-নিষেধ নেই। জাতীয় ফল কাঁঠাল হিসেবে একটি দলের মার্কা হিসেবে রয়েছে। সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখিনি, বলে আমরা শাপলাকে প্রতীক হিসেবে চেয়েছি।’
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন প্রমুখ।
রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে আবেদন করেছেন ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীনের গড়া দল আম জনগণ পার্টি। দলটি প্রতীক হিসেবে আনারস, কলম বা ঘণ্টা চেয়ে আবেদন করেছে। আবেদন জমা দেওয়ার পর রফিকুল আমীন বলেন, ‘জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটিসহ যেভাবে ইসি চেয়েছে, সেভাবেই আমরা সব কাগজপত্র জমা দিয়েছি। আগামী দিনে আমরা ওয়ার্ডপর্যায়ে কমিটি এবং রাজনীতি চালু করতে পারব বলে আশা করি। আমরা বিশ্বাস করি, বহুদলীয় গণতন্ত্র, গণতন্ত্র চর্চা, সর্বত্র ন্যায়ভিত্তিক চর্চা করার জন্য নিবন্ধন দিয়ে রাজনীতিতে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ চালু করার জন্য সরকারের মাধ্যমে ইসির প্রতি আশা করি। আমরা আনারস, কলম বা ঘণ্টা প্রতীক চেয়েছি।’
রাজনৈতিক দল হিসেবে হাতি প্রতীকে নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে জনতা পার্টি বাংলাদেশ (জেপিবি)। নির্বাচন ভবনে আবেদন জমা দিয়ে দলটির মহাসচিব শওকত মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছি। নিবন্ধন বিধিমালার যে শর্ত আছে, সেগুলো পালন করা খুব কষ্টকর। নির্বাচন কমিশন কিছু কিছু বিধিমালা সংস্কারের প্রস্তাব রেখেছে। এ প্রস্তাবগুলো কিন্তু এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
চাবি প্রতীকে নিবন্ধন চেয়ে আবেদন করেছে জনতার দল। নির্বাচন ভবনের প্রাপ্তি ও জারি শাখায় আবেদন জমা দেন দলের আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম কামাল ও সদস্য সচিব আজম খান। আবেদন জমা দেওয়ার পর শামীম কামাল বলেন, ‘নিবন্ধনের সব শর্ত পূরণ করে আমরা আবেদন করেছি। আমাদের জেলা ও উপজেলা কমিটি আইন অনুযায়ী গঠন করা হয়েছে। এখন বাকি সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।’
২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পদ্ধতি চালু হয়। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৫০টি। সম্প্রতি আদালতের আদেশে ইসির নিবন্ধন স্থগিত হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আর নিবন্ধন ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইসি থেকে নিবন্ধন পেয়েছে, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ (জিওপি), নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজিপি) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি।
এর আগে গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ইসিতে ৯৩টি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল। শেষ পর্যন্ত নিবন্ধন পায় মাত্র দুটি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)। বাকি ৮৭টি দল নিবন্ধন পায়নি। এবারের নির্বাচনের আগে ওইসব দলও তাদের আবেদন পুনর্মূল্যায়ন করতে ইসিকে অনুরোধ জানিয়েছে।