বন্দর কর্তৃপক্ষই চালাবে টার্মিনাল

আপডেট : ২৩ জুন ২০২৫, ০৭:৩৫ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল আলোচিত এনসিটি কনটেইনার টার্মিনাল এখনই দেশি বা বিদেশি অপারেটরের হাতে যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই এ টার্মিনালটি পরিচালনা করবে। টার্মিনালটি পরিচালনা করতে আগামী ছয় মাসে প্রায় ৪২ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এ টাকা খরচের অনুমতি চেয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে গত ১৯ জুন তারিখের স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এনসিটি কনটেইনার টার্মিনাল প্রাইভেট অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আগামী ৬ জুলাই এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এনসিটি নিয়ে গত ১৮ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভার আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করবে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আর তা আগামী ছয় মাস মেয়াদে পরিচালনা করা হবে। কিন্তু টার্মিনালে থাকা কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ অন্যান্য ইকুইপমেন্ট পরিচালনা ও আইটি ব্যবস্থাপনার জন্য মাসে ৭ কোটি টাকা হারে ছয় মাসে ৪২ কোটি টাকা খরচ হবে। কিন্তু মাসে ৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে খরচের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। আর এ চিঠিতে সেই অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, এনসিটি পরিচালনার মেয়াদ আগামী ৬ জুলাই শেষ হচ্ছে। বন্দরের স্বাভাবিক আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অবশ্যই টার্মিনালের কার্যক্রম সচল রাখতে হবে। আর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগও সময় সাপেক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এ চিঠিকে শিপিং সেক্টরের অনেকেই পজিটিভ ভাবছেন। ৩৯ বছর ধরে শিপিং সেক্টরে কাজ করা রিলায়েন্স শিপিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা হুক দিয়ে জাহাজ থেকে পণ্য নামানো থেকে শুরু করে বর্তমানের কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন পর্যন্ত দেখছি। চট্টগ্রাম বন্দরের মালিক যেহেতু বন্দর কর্তৃপক্ষ, তাই তারা চাইলেই তা পরিচালনা করতে পারে। এতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে যেহেতু বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া নিয়ে একটি বিতর্ক চলছে, আবার দেশীয় অপারেটরের বিষয়টিও সামনে এসেছে; তাই বন্দরের টার্মিনাল বন্দর নিজেই পরিচালনা করে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে।’

কিন্তু ডক শ্রমিক বোর্ড ২০০৭ সালে বিলুপ্তির পর বন্দরের নিজস্ব জনবল ছাড়া টার্মিনাল পরিচালনা করতে পারবে কি? এ প্রশ্নের জবাবে বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে শ্রমিক দিয়ে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানো করি। কিন্তু এনসিটি পুরোপুরি ইকুইপট টার্মিনাল। আধুনিক সব যন্ত্রপাতি সেখানে রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন অপারেটর নিয়োগ দিতে পারে অথবা এখন যারা কাজ করছে তাদের মধ্য থেকেও নিয়োগ দিতে পারে। তবে যাই ঘটুক না কেন, বন্দরের কার্যক্রমে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’

তবে এতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, ‘বন্দরের নিজস্ব কোনো জনবল নেই। টার্মিনালটি বন্দর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। এতে যাতে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

৫৭০ কোটি টাকা খরচ করে এক হাজার মিটার দৈর্ঘ্যরে এই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) নির্মাণকাজ ২০০৭ সালে শেষ হলেও নানামুখী জটিলতায় অপারেটর নিয়োগ দেওয়া যায়নি। পরে অপারেটরের দায়িত্ব পায় সাইফ পাওয়ারটেক। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন করেছিল এ টার্মিনালে। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বছরে ৩২ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে, এর মধ্যে ৪৪ শতাংশ এককভাবে পরিচালনা হয় এনসিটি থেকেই। যে কারণে বন্দরের ১৮টি অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই স্থাপনা করা হয়েছে এখানে। একযোগে চারটি জাহাজ ভেড়ার সক্ষমতাসম্পন্ন এ টার্মিনালে রয়েছে একাধিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনও। বাকি চারটি গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে তিনটি জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিতে। সেখানে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে ৩৭ শতাংশ।

সাইফ পাওয়ারটেকের বক্তব্য : ১৭ বছর ধরে টার্মিনাল অপারেটরের কাজ করে আসা সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বা সরকার যেকোনো সময় চাইলে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারে। এতে আমার কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে ১৭ বছর ধরে এ টার্মিনাল পরিচালনা করতে গিয়ে এখানে আমার অনেক বিনিয়োগ করা হয়েছে, আমার ইকুইপমেন্ট ও প্রায় আড়াই হাজার জনবল রয়েছে। এ ছাড়া বন্দর ব্যবহারকারী অনেকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন রয়েছে। এসব বিষয় সুষ্ঠু সম্পাদনের জন্য আমাকে চার থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া প্রয়োজন। তাহলে হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি সুন্দর হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০০৭ সাল থেকে পরিচালনার পর তিন বছর করে অনুমোদন দেওয়া হতো। তবে ২০১৭ সাল থেকে ছয় মাস করে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। যেহেতু আমাদের এখনো চিঠি দিয়ে কিছু জানানো হয়নি, তাই সে হিসেবে আমরা মনে করছি এবারও আমাদের অনুমোদন দেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জেনারেল কার্গো বার্থ, এনসিটি, সিসিটি ও পিসিটি এ চারটি টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে জিসিবি পরিচালনা করছে বার্থ অপারেটররা। সিসিটি ও এনসিটি পরিচালনা করে আসছে সাইফ পাওয়ারটেক এবং পিসিটি পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটরদের দেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন। এরপর থেকেই এটা নিয়ে সমালোচনা দেখা দেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দেয়। এ অবস্থার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের টার্মিনাল নিজেরাই পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত