এনবিআরের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরা

সংস্কার চাই চেয়ারম্যানের অপসারণ চাই না

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৫, ০৭:৩৬ এএম

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চলমান অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে শীর্ষস্থানীয় চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় একটি দক্ষ, হয়রানিমুক্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গড়ার লক্ষ্যে সার্বিক সংস্কার বা আধুনিকায়নকে সমর্থন করে। তবে এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণ কোনোমতেই সমর্থন করে না এবং তা কোনো প্রকার সফলতা নিয়ে আসবে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন না।

পাশাপাশি দাবি আদায়ের নামে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যাতি করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। কালবিলম্ব না করে সমস্যা সমাধানে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নেতৃত্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যথা অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিডা যৌথভাবে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা অত্যন্ত জরুরি। সমাধান না হলে রপ্তানি মৌসুমে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেশের সুনাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্রেতারা বিকল্প দেশে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। তবে দাবি আদায়ের নামে রাজস্ব কর্মকর্তারা ব্যবাসয়ী, সরকার, রাষ্ট্র ও জনগণকে জিম্মি করেছে বলেও অনেক ব্যবসায়ী নেতা মনে করেন।

গতকাল শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সংবাদ সম্মেলন’ নেতারা সম্মিলিতভাবে লিখিত এই বক্তব্য দিয়েছেন। সমস্যা সমাধানে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ)। পরে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ব্যবসায়ী নেতারা।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, টালমাটাল বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রপ্তানি খাত, পণ্য সরবরাহ তথা সাপ্লাই চেইন, মুদ্রা ও পুঁজি বাজার, জনজীবন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বহুমুখী সমস্যা বিরাজমান। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক এই নাজুক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত প্রতিটি মুহূর্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে অতিবাহিত করছে। উল্লিখিত প্রতিকূল পরিবেশ থেকে জাতীয় অর্থনীতিকে উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি ও ফ্যাসিলিটেটিং জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ও টেকসই ভূমিকা অপরিহার্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সেগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

শিল্প উদ্যোক্তারা মনে করেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, স^চ্ছতার সহিত নীতি অনুসরণ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার লক্ষ্যে চলতি বছর ১২ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে দুটি বিভাগ করার সিদ্ধান্তে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। ফলে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর অন্তর্ভুক্ত সব দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে এবং এই অধ্যাদেশ বাতিলের লক্ষ্যে এনবিআর ও এর মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোয় আন্দোলনের সূচনা ঘটে। বিগত ১৪ মে থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কলম বিরতির ডাক দেন। এই সময় থেকে নানা আলোচনা ও বৈঠকের পরও এর সমাধান না হওয়ায় ধীরে ধীরে এই আন্দোলন এনবিআরসহ এর অন্তর্ভুক্ত দপ্তরসমূহে দৈনন্দিন কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে এই আন্দোলন আরও কঠিন রূপ ধারণ করে এবং উক্ত দপ্তরসমূহে আজকে (গতকাল) থেকে কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এনবিআরের অচলাবস্থার সমাধান না হলে বাংলাদেশের পণ্য বিদেশে বাজার হারানোর শঙ্কা প্রকাশ করে ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, বর্তমান জুন-জুলাই মাসে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, সিরামিক, ফার্মাসিউটিক্যাল, অ্যাগ্রো প্রোসেসিং, প্লাস্টিকসহ সব রপ্তানিমুখী শিল্পের অধিকাংশ কারখানাতেই আগামী শীত মৌসুমের পণ্য তৈরির জন্য চাপ রয়েছে। এই পিক সিজনে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ও কাস্টমস হাউসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরসমূহের অচলাবস্থার কারণে সঠিক সময়ে পণ্য রপ্তানি করতে না পারলে বায়াররা ক্রয়াদেশ বাতিল ও ভবিষ্যতে নতুন ক্রয়াদেশ প্রদানে অনাগ্রহী হতে পারে। আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজার কখনো বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করবে না। এই অর্ডারগুলো পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাবে, যা হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। এ ছাড়াও উৎপাদিত পণ্য সঠিক সময়ে না পাঠাতে পারলে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক ও আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। জুন মাসেই ব্যবসায়ীদের ওপর বার্ষিক ব্যাংক ঋণের মুনাফা জমা দেওয়ার একটি চাপ থাকে। এ সময়ে এই সব বিরোধের কারণে পণ্য রপ্তানি করতে না পারলে বায়ারের পেমেন্ট রিয়্যালাইজেশন হবে না। ফলে ব্যবসায়ীরা একটি কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের রপ্তানিকারী শিল্প নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এমতাবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গৃহীত আন্দোলন বায়ারদের মাঝে পুনরায় ইমেজ সংকট সৃষ্টি করবে। যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ব্যবসায়ীদের ৫ প্রস্তাব

আন্দোলনকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা করে সেবা বন্ধে ঘোষিত কর্মসূচি থেকে অবিলম্বে তাদের সরিয়ে এনে উক্ত সেবার অব্যাহত প্রবাহ নিশ্চিত করা; উত্তম কর তথা রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও প্রণীত নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আলাদাকরণসংক্রান্ত তর্কিত অধ্যাদেশসংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনাকরে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত করে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা ও জাতীয় বাস্তবতার আলোকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সামগ্রিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে পরস্পরের পরিপূরক করে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাস্তবায়ন করা; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের সার্বিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব জাতীয় প্রতিষ্ঠানে হয়রানিমুক্ত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা; বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য সরবরাহ তথা সাপ্লাই চেইনের উন্নয়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ও সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ও সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্যে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে অনতিবিলম্বে সংস্কার বা আধুনিকায়ন কর্মসূচি গ্রহণপূর্বক সময়াবদ্ধ পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করা; এবং উপরোক্ত উদ্দেশ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে সরকারের সর্বোচ্চ মহল হতে নিদের্শ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

সংবাদ সম্মেলন থেকে ব্যবসায়ী নেতারা আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ ন্যয়সংগত সুরক্ষা ও দেশের অর্থনীতি যাতে করে আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে লক্ষ্যে এখনই জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ভাই-বোনদের দেশের অর্থনীতির স্বার্থে কলম বিরতি বা কমপ্লিট শাটডাউনের মতো কর্মসূচি প্রত্যাহারপূর্বক কোনো প্রকার পূর্ব শর্ত ছাড়া অনতি বিলম্বে কাজে যোগদান করার আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে সাংবাদিকের এক প্রশ্নর উত্তরে এনবিআর কর্মকর্তাদের সমালোচনা করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল বলেছন, ‘এনবিআরে কি হয়, না হয় কমবেশি আমরা (ব্যবসায়ীরা) জানি। সব কিছু জনসম্মুখে বলা ঠিক নয়। আমরা চাই সংস্কার, আমরা চাই দেশের সবাই যাতে আইন মেনে চলে। আজকে আপনার যেটা লক্ষ্য করছেন, সেটা ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে, টাকাপয়সার বণ্টন নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। মাঝপথে আমরা ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এরা (রাজস্ব কর্মকর্তারা) সারা জীবন আমাদের জ্বালিয়েছে, এখন সরকারকে জ্বালাচ্ছে, এখন পুরো জাতীকে জ্বালাবে। সেজন্য আমরা সবাই একটু সক্রিয় হই, ওনারাও (রাজস্ব কর্মকর্তারা) আমাদের একটু সুনজরে দেখুক।’

সংবাদ সম্মেলন উপস্থিত ছিলেন, আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি) প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) প্রেসিডেন্ট কামরান তানভীর রহমান, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ) প্রেসিডেন্ট মঈনুল ইসলাম, মেট্রো চেম্বারের সহসভাপতি ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত