চীনের সঙ্গে বিএনপির নতুন কূটনৈতিক অধ্যায় 

  • তিন দফা সফরে বন্ধুত্ব দৃঢ়করণের চেষ্টা
আপডেট : ৩০ জুন ২০২৫, ০১:৩৭ এএম

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক মিত্রতার ছকে বড় রদবদলের আভাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বিএনপির ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নতুন এক কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত এক বছরে চীন সফর করেছে বিএনপির তিনটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। সর্বশেষ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল বেইজিং সফর শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরেছে।

সফর থেকে ফিরে মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে। এই সফরটি ছিল রাজনৈতিক। আমাদের সফরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল বৈঠক হয়েছে। পার্টি টু পার্টি সম্পর্ক আরও নিবিড় ও শক্তিশালী হয়েছে।’ সফরে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা চীনের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী সান ওয়েইডং, আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ জিয়ানচাও এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ভাইস চেয়ারম্যান লি হংঝংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামনে নির্বাচনে আমরা যদি সরকার গঠন করি তাদের যেন সমস্যা না হয়, ধারাবাহিকতা যেন থাকে, এগুলো নিয়ে আলাপ হয়েছে। তারাও ইতিবাচক বলেছে। আমরাও ইতিবাচকভাবে দেখছি।’ তিনি জানান, ‘গ্রেট হলে মিটিং সাধারণত হয় রাষ্ট্র প্রধান ও সরকার প্রধানদের সঙ্গে। সুতরাং বুঝতে হবে যে তারা আমাদের গুরুত্ব কম দেয়নি। এখানে বৈঠকই বলে দেয়, তারা বিএনপিকে কীভাবে দেখছে।’

আর সংশ্লিষ্টদের মতে, চীনের এই সফর রাজনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং চীনের সঙ্গে ভবিষ্যতের গভীর কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ার প্রস্তুতি। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সমর্থন, অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াত ও বাম ঘরানার দলের সঙ্গে বেইজিংয়ের নিবিড় যোগাযোগ এ বার্তাই দেয় যে, চীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘পরবর্তী ধাপ’ অনুধাবনে সক্রিয় রয়েছে।

তাদের মতে, সম্প্রতি চীন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। এটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক কৌশলগত জোট গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ভারতের প্রতি এক প্রকার বার্তা দেওয়ার প্রয়াসও দেখছেন তারা। কারণ, আওয়ামী লীগ আমলে ভারত-ঘনিষ্ঠতা যতটা ছিল, বর্তমানে তা অনেকটাই শীতল। ফলে বেইজিং দ্রুত এই শূন্যতা পূরণের কৌশলে নেমেছে।

২০২৪ সালের নভেম্বর, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি এবং সর্বশেষ জুন- এই তিন সময়ে বিএনপির তিনটি প্রতিনিধি দল বেইজিং সফর করেছে। প্রথমটি ছিল ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান খান রিপনের নেতৃত্বে, দ্বিতীয়টি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, আর সর্বশেষ মির্জা ফখরুল।

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- এই সফরগুলো কৌশলগত বন্ধুত্ব গড়ার অংশ। চীনের সঙ্গে পার্টি টু পার্টি সম্পর্ক জোরদার করে, তারা ভবিষ্যতের সরকার গঠনের ক্ষেত্রেও একটি নীরব সহমত তৈরি করতে চাচ্ছে।

দলটি মনে করে, সরকার পরিবর্তনের পর চীন যেন বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে। বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও টেকসই করতে চায় তারা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন বিএনপির এমন তিন জন নেতা জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএনপির নীতিনির্ধারকরা নিজেদের মধ্যে বৈঠকে বন্ধু রাষ্ট্রকে বাস্তবতা কী তা বার্তা দেওয়ার সিদ্ধান্তে আসে। নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভেতরেই উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়টিকে নতুন করে ঝালাই করার।’

১৯৭৬ সাল থেকে বিএনপির সঙ্গে চীনের আন্তরিক সম্পর্কের সূচনা। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের কারণেই ওই সময় চীন এগিয়ে আসে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত শিক্ষক অধ্যাপক তারেক শামসুর রহমান ‘চার দশকের পররাষ্ট্রনীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেন, ‘চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রশ্নে তার (জিয়াউর রহমান) অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি চীনের সঙ্গে শুধু সম্পর্ক বৃদ্ধিই করেননি, বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে চীনের উপস্থিতিকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছিলেন।’ ‘বেগম জিয়ার (১৯৯১-৯৬, ২০০১-২০০৬) বৈদেশিক নীতির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া।’

যদিও ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ঢাকায় তাইওয়ানের কনস্যুল খোলা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে চীনের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। ২০০৪ সালের জোট সরকারে ছিলেন এমন দায়িত্বশীলদের মতে, বাংলাদেশে তাইওয়ানের কনস্যুল খোলার অনুমতি দিয়েছিল বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড। এই বোর্ডের আইনের অধীনে নিবন্ধিত নতুন বাণিজ্য প্রতিনিধিত্বমূলক অফিসের মাধ্যমে ম্যানপাওয়ার আমদানি করার সুযোগ পায় তাইওয়ান। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই কনস্যুল বন্ধ করে দেয়।

২০১৬ সালের অক্টোবরে বিএনপির চেয়ারপারসনের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বৈঠকে খালেদা জিয়া জানিয়েছেন, শহীদ জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় থেকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুরু হয়। বাংলাদেশ আশা করে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’

২০১৬ সালের আগে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে বিএনপির ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। ওই সফরে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ প্রমুখ ছিলেন। এরপরের বছর আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল চীন সফরে গেলেও বিএনপি কোনো আমন্ত্রণ পায়নি। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে আবারও চীন সরকারের আমন্ত্রণে যান বিএনপির তিন নেতা। সেবার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য) ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ২০২০ সালে খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে উপহার সামগ্রী পাঠায় ঢাকায় নিযুক্ত চীনা দূতাবাস।

চীনের সঙ্গে আবার বিরোধ সৃষ্টি হয় ২০২১ সালে। ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূতের একটি ভিডিও বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর বিবৃতি দেয় বিএনপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চীন তার নিজ দেশে কী ব্যবস্থা বহাল রাখবে তা একান্তই তার অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ঐতিহ্যগতভাবে অবাধ নির্বাচন ও প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার চর্চার মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানা চর্চা করেছে ও করবে। কেননা, প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার প্রয়োগই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রাণ এবং জনগণের ক্ষমতা চর্চার একমাত্র মাধ্যম, যার মাধ্যমেই রাষ্ট্র জনগণের কাছে জবাবদিহিতে আবদ্ধ থাকে। এটাই জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণতন্ত্র চর্চার সর্বজনীন পন্থা।’

এই বিবৃতি-বিরোধিতার পর থেকে চীনের সঙ্গে স্বাভাবিক হতে পারেনি বিএনপি। মাঝখানে ২০২৩ সালের ২৩ জুন চেয়ারপাসনের কার্যালয়ে কয়েক কার্টন উপহার পাঠালেও তা যায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি ও চীন উভয় পক্ষই বন্ধুত্ব দৃঢ়করণের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে চীনের বিশাল বাজার ও বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল বিনিয়োগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ কৌশলগত কারণেই ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায় বেইজিং। তাদের মতে, ভ‚রাজনৈতিক কারণে চীনের জন্য বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জায়গা। পাশাপাশি প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই দেশ চীনা রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বাজার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে ৬৭৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং চীন থেকে ২২.৯০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগীও। বিশেষ করে পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন আর্থিক ও প্রকৌশলগত সহযোগিতা দিয়ে আসছে বাংলাদেশকে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক, সেতুসহ বাংলাদেশের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে চীনের।

এছাড়া সামরিক দিক থেকেও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দশকের পর দশক ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সমরাস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জামের বেশিরভাগই আসে চীন থেকে। প্রতিরক্ষা খাতবিষয়ক আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সুইডেনের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আমদানি করা সমরাস্ত্রের ৭২ শতাংশই সরবরাহ করে চীন। চট্টগ্রামে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সাবমেরিন ঘাঁটি, যেখানে ৬টি সাবমেরিনের পাশাপাশি ৮টি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্ত হওয়া দুটি সাবমেরিনের সরবরাহকারীও চীন।

ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতে চীনের জন্য বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের এই নতুন অধ্যায়ে চীনকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করছে। কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহায়তার যে আশ্বাস তারা চীন থেকে পাচ্ছে, তা তাদের ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের কাজে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

গয়েশ্বর আরও বলেন, ‘এখানে (চীনে) আমাদের চেয়ে চীনের আগ্রহই বেশি। কারণ বাংলাদেশে চীনের ব্যবসা রয়েছে। সেটা তারা অব্যাহত রাখতে চায়। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করতে চায়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত