কোর্ট অব ওয়ার্ডসের দাবি ভিত্তিহীন

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৫, ০৭:২১ এএম

উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি সংস্থা কোর্ট অব ওয়ার্ডসের (ভাওয়াল রাজ এস্টেটের ক্ষেত্রে) এখন অস্তিত্ব নেই। তারপরও প্রজাবিলি গেজেটের সম্পত্তিতে মালিকানা দাবি করছে ওই সংস্থাটির কিছু দায়িত্বরত ব্যক্তি। ফলে মীমাংসিত বিষয়কে বিতর্কিত করার অপচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উচ্চ আদালতে নিয়মিত দেওয়ানি মামলা পরিচালনা করেন এমন একাধিক আইনজীবী বলেছেন, ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ সরকার কোর্ট অব ওয়ার্ডস আইন প্রর্বতন করে। ১৭৯৩ সালে প্রবর্তনকৃত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের বিধানমতে সৃজিত অপারগ জমিদারের সম্পত্তির রক্ষা করার জন্য এ আইন করা হয়। কোর্ট অব ওয়ার্ডস আইন অনুসারে ব্রিটিশ সরকার ‘কোর্ট অব ওয়ার্ডস’ নামে একটি সরকারি সংস্থা গঠন করে। পরে সংস্থাটি অপারগ ভাওয়াল জমিদার কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীসহ বেশ কিছু অপরাগ জমিদারের পক্ষে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বন্দোবস্তকৃত সব সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়।

কোর্ট অব ওয়ার্ডস যখন গাজীপুরের ভাওয়াল জমিদার কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর সব সম্পত্তির দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়, তখন ভাওয়াল জমিদারের মালিকানায় শুধু তার নিজের বা খাস দখলীয় সম্পত্তিই ছিল না, প্রজাদের কাছে বিলি করা বা বন্দোবস্তকৃত সম্পত্তিও তার মালিকানায় ছিল। আইনজীবীরা বলেন, কোর্ট অব ওয়ার্ডস ভাওয়াল জমিদারের উভয় ধরনের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা গ্রহণের পরও জমিদারের খাস দখলীয় অধিকাংশ সম্পত্তি আইনগতভাবে তার প্রজাদের কাছে বিলি করে বা বন্দোবস্ত দেয়। এ সম্পত্তিতে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের শুধু খাজনা আদায়ের অধিকার ছিল। কোর্ট অব ওয়ার্ডস ওই সম্পত্তি থেকে যে রাজস্ব বা খাজনা আদায় করত, তার একটি অংশ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হতো; বাকি অংশ জমিদার কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী বা তার অবর্তমানে তার ওয়ারিশানদের হিস্যামতে দিতে থাকে। পূর্ববঙ্গের (১৯৫৫ সালের ১৪ অক্টেবর থেকে পূর্ব পাকিস্তান) প্রাদেশিক সরকার ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন প্রবর্তন করে এবং প্রজাস্বত্ব আইন (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ) প্রবর্তন করে।

আইনজীবীরা বলেন, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন অনুযায়ী সরকারি সংস্থা কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ব্যবস্থাপনায় থাকা গাজীপুরের ভাওয়াল জমিদার কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীসহ সব জমিদারের খাস দখলীয় সম্পত্তিকে রিটেইনেবল খাস ও নন-রিটেইনেবল খাস সম্পত্তি হিসেবে ভাগ করা হয়। একই সঙ্গে প্রজাবিলিকৃত সম্পত্তিকে ভাগ না করে অক্ষুন্ন রাখা হয়। কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে থাকা তিন ধরনের সম্পত্তির মধ্যে প্রজাদের কাছে বিলি করা সম্পত্তির বিপরীতে সরকার প্রজাবিলি প্রপার্টি গেজেট ও নন-রিটেইনেবল খাস সম্পত্তির বিপরীতে নন-রিটেইনেবল খাস প্রপার্টি গেজেট প্রকাশ করে। এরপর জমিদার বা জমিদারের প্রতিনিধি হিসেবে কোর্ট অব ওয়ার্ডস রিটেইনেবল খাস সম্পত্তির বিপরীতে যে পছন্দক্রম তৈরি করে, সেই পছন্দক্রমে উল্লিখিত অনধিক ৩৭৫ বিঘা পরিমাণ জমি জমিদারের মালিকানাধীন সম্পত্তি বলে গণ্য হয়।

বাকি দুই ধরনের সম্পত্তির মধ্যে নন-রিটেইনেবল প্রপার্টি গেজেটে উল্লিখিত সম্পত্তিকে সরকারের মালিকানাধীন সম্পত্তি ও প্রজাবিলি গেজেটে উল্লিখিত সম্পত্তিকে জনগণের বা প্রজাদের মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে সরকার কর্তৃক ঘোষণা করার পর ঘোষিত তিন ধরনের পৃথক সম্পত্তির বিপরীতে আলাদা আলাদা তিন ধরনের এসএ খতিয়ান তৈরি ও প্রকাশ করা হয়। এক প্রকার খতিয়ানে সাধারণ জনগণকে, অন্য প্রকার খতিয়ানে সরকারকে এবং আরেক প্রকার খতিয়ানে সাবেক জমিদারদের মালিক হিসেবে উল্লেখ করে জমিদার ও প্রজাইস্বত্বে মালিকদের সরকারের অধীনে সাধারণ প্রজা বা কমন টেনান্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। সরকার উভয়কে মালিক উল্লেখ করে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত এসএ খতিয়ান অনুযায়ী ভূমি রাজস্ব গ্রহণ শুরু করে।

সরকার জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন কার্যকরী করার পর কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে ভাওয়াল জমিদার কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর শুধু রিটেইনেবল খাস অনধিক ৩৭৫ বিঘা জমি থাকে। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে এর আয়তন কমিয়ে ১০০ বিঘা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে ৬০ বিঘা করা হয়। পরে কোর্ট অব ওয়ার্ডসে ডেপুটেশনে নিযুক্ত অসৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন ও কোর্ট অব ওয়ার্ডস আইনে ১৯৫২ সালে সংযোজিত ৮ এ ধারা এবং পিও-এর (প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার ৯০/১৯৭২) বিধান লঙ্ঘন করে সিএস রেকর্ডে কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর পক্ষে কোর্ট অব ওয়ার্ডস নামে রেকর্ডকৃত সব সম্পত্তিকে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের সম্পত্তিরূপে মিথ্যা ও বেআইনি দাবিতে সাধারণ প্রজাইস্বত্বে এসএ ও আরএস রেকর্ডের মালিকদের কোর্ট অব ওয়ার্ডসে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উচ্ছেদের হুমকি দিতে থাকে। সর্বশেষ রেকর্ডে প্রজাইস্বত্বে এসএ ও আরএস রেকর্ডের মালিকদের পরিবর্তে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের নাম মালিক হিসেবে লেখার জন্য স্মারক ইস্যু করে।

একপর্যায়ে সংক্ষুব্ধ প্রজাইস্বত্বের মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৪ এমএলআর (এডি)-র ৪০১ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত রায়ে (২০০৯ সাল) একটি সিদ্ধান্ত দেয়। এতে বলা হয়, কোর্ট অব ওয়ার্ডস শুধু তার পছন্দক্রমে উল্লিখিত রিটেইনেবল খাস সম্পত্তির দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে। বাকি দুই ধরনের সম্পত্তি নন-রিটেইনেবল খাস অর্থাৎ সরকারের ওপর অর্পিত সম্পত্তি ও প্রজাবিলিকৃত সম্পত্তি অর্থাৎ প্রজাইস্বত্বে মালিকদের সম্পত্তিতে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মালিকানা দাবি করে তাদের হয়রানি করতে পারবে না। এমন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত থাকার পরও কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সিএস রেকর্ডের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি করে আবার স্মারক ইস্যু শুরু করে।

কোর্ট অর্ব ওয়ার্ডসের বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা পরিচালনাকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. খলিলুর রহমান বলেন, প্রজাবিলি গেজেটে উল্লিখিত প্রজাইস্বত্বের মালিকদের ভোগ দখলে থাকা সম্পত্তির বেআইনি মালিকানা দাবি করে আবার স্মারক ইস্যু করলে ওই সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হবেন।

এমন নির্দেশনার পরও ওই সংস্থার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রজাবিলি গেজেটের সম্পত্তিতে আবার মালিকানা দাবি করলে তাদের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে আদালত অবমাননার দুটি অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্তরা হাইকোর্টে সশরীরে হাজির হয়ে লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আর কখনো প্রজাবিলির সম্পত্তিতে বেআইনি মালিকানা দাবি করে প্রজাইস্বত্বে মালিকদের হয়রানি করা হবে না বলে মুচলেকা দেন। আদালত ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্টদের ক্ষমা করে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করে আদালত অবমাননার অভিযোগটির নিষ্পত্তি করে।

কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ডেপুটেড কর্মকর্তারা আবার একই তৎপরতা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. খলিলুর রহমান ভাওয়াল রাজ এস্টেটে ভাওয়াল জমিদারদের কোনো ওয়ারিশ এ দেশে না থাকায় এর বিলুপ্তির আরজি জানিয়ে ২০০৮ সালে রিট মামলা করেছিলেন। হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কোর্ট অব ওয়ার্ডস, ভাওয়াল রাজ এস্টেট বাতিল ঘোষণা করে পছন্দক্রমে উল্লিখিত রিটেইনেবল খাস সম্পত্তি সরকারের খাস সম্পত্তি গণ্য করে ১ নম্বর খাস খতিয়ানে রেকর্ড করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়। অ্যাডভোকেট খলিলুর রহমান বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কোর্ট অব ওয়ার্ডস ২০১৬ সালে আপিল বিভাগে সরকারি স্বার্থের বিরুদ্ধে সিভিল আপিল (মোকদ্দমা নম্বর ৫৭২/২০১৬) দায়ের করলেও সর্বোচ্চ আদালত তাতে স্থগিতাদেশ বা নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ায় বর্তমানে কোর্ট অব ওয়ার্ডস, ভাওয়াল রাজ এস্টেটের বাস্তব অস্তিত্ব নেই। রায় মেনে ভূমি মন্ত্রণালয় কোর্ট অব ওয়ার্ডস, ভাওয়াল রাজ এস্টেটের বিলুপ্তি ঘোষণা করে এর দখলে থাকা রিটেইনেবল সব সম্পত্তি সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ২০১৮ সালের ২২ জুলাই চিঠি দেয়। চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিভিন্ন মিস কেস মোকদ্দমা রুজুর মাধ্যমে অধিকাংশ রিটেইনেবল খাস সম্পত্তিকে সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে এর ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছেন। বাকি রিটেইনেবল সম্পত্তিও সরকারি খাসে নেওয়া হবে।

কোর্ট অব ওয়ার্ডস, ভাওয়াল রাজ এস্টেটের ম্যানেজার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’ হাইকোর্টের রায়ের ওপর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের স্থগিতাদেশ বা নিষেধাজ্ঞা না থাকার পরও কোর্ট অব ওয়ার্ডসের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ সত্য নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত