ক্রেতা নেই ৪০০ কোটি টাকার পাথরের!

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৫, ০৭:৩৫ এএম

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত মধ্যপাড়া পাথর খনি দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ পাথর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এই খনি থেকে উৎপাদিত উন্নতমানের বোল্ডার ও ব্লাস্ট পাথর রেলপথ নির্মাণ এবং নদী শাসন কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্রয় হ্রাস পাওয়ায় খনির ১৪টি ইয়ার্ডে ১২ লাখ ২০ হাজার টন পাথর মজুদ পড়ে আছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই অবিক্রীত পাথরের স্তূপ খনির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

মধ্যপাড়া পাথর খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে জার্মানিয়া-ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। ২০১৩ সালে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে জিটিসির সঙ্গে চুক্তির পর থেকে খনিটি দৈনিক ৫ হাজার ৫০০ টন পাথর উৎপাদন করছে। অবশ্য উত্তোলন কাজে বিস্ফোরক ক্রয়ে ৩৭ শতাংশ কর আরোপিত হয়েছে, যা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। চলতি অর্থবছরে ২৫০ কোটি টাকার ৯ লাখ ৫০ হাজার টন পাথর বিক্রি হলেও, উৎপাদন খরচ, ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধের পর খনিটি লাভজনক থাকলেও মজুদ পাথরের কারণে আর্থিক চাপ বেড়েছে।

মধ্যপাড়া খনির প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। খনির ৫১ শতাংশ উৎপাদিত পাথর রেলপথের জন্য বোল্ডার এবং নদী শাসনের জন্য ব্লাস্ট পাথর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাকি ৪৯ শতাংশ পাথর বিভিন্ন সাইজে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন উৎপাদিত হয়, যা বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যবহারের উপযোগী। অবশ্য কয়েক বছর থেকেই বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ড মধ্যপাড়ার পাথরের পরিবর্তে ভারত থেকে আমদানি করা পাথরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিগত সরকারের আমলে মেগা প্রকল্পে নতুন রেলপথ নির্মাণ ও নদী শাসন কাজে আমদানি করা পাথর ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। মধ্যপাড়ার বোল্ডার প্রচলিত ব্লকের তুলনায় টেকসই, উন্নতমানের এবং সাশ্রয়ী হলেও, পানি উন্নয়ন বোর্ড এই পাথর ব্যবহারে আগ্রহ দেখায়নি। রেলওয়ের ক্ষেত্রেও গত তিন বছরে মধ্যপাড়ার পাথরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি করা পাথরের প্রতি ঝোঁক এবং স্থানীয় পাথরের ট্যারিফ ভ্যালু ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণেই এ খনির পাথরের চাহিদা কমেছে। অবশ্য তারা আশা করছেন, মধ্যপাড়ার পাথর অন্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় ক্রাশিং পয়েন্ট স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে, যা পাথরের বিভিন্ন সাইজে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে বিক্রি সহজ করবে। তবে, আমদানি করা পাথরের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি এবং মধ্যপাড়ার পাথরের ট্যারিফ ভ্যালু বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করা সম্ভব। এ ছাড়া, ১৪ কিলোমিটার রেললাইন সংস্কার করা হলে পূর্বাঞ্চল রেলে পাথর পরিবহন খরচ কমবে, যা বিক্রি বাড়াতে সহায়ক হবে।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ডি এম জোবায়েদ হোসেন জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারি কোষাগারে উৎপাদন খরচ, ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধ করা হয়েছে। তবে, রেলওয়ে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্রয় হ্রাসের কারণে মজুদ পাথরের পরিমাণ বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘রেলপথ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পাথর ব্যবহার করলে মজুদের সমস্যা হতো না।’

খনির উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম জানান, দেশের মেগা প্রকল্প বন্ধ থাকায় এবং যমুনা সেতুর মতো বড় প্রকল্পে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার না হওয়ায় বিক্রি কমেছে। তিনি আমদানি করা পাথরের শুল্ক বৃদ্ধি, রয়্যালটি হার ৪ থেকে ১ শতাংশ করা এবং আগের ঋণ মওকুফের প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, সম্প্রতি পশ্চিমাঞ্চল রেলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং পূর্বাঞ্চল রেল ও পানি উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাকিতে ব্লাস্ট পাথর সরবরাহ শুরু হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত