জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আবারও যদি মাঠে নামতে হয়, সংগ্রাম করতে হয়, বিএনপি আবারও মাঠে নামবে এবং সংগ্রাম করবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল বিকেলে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া গার্লস স্কুলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ বিএনপি আয়োজিত যথাসময়ে সংস্কার ও দ্রুত সময়ে নির্বাচন দাবিতে এক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, একটা পক্ষ নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে। দেশের জনগণ তা মেনে নেবে না। ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের বদলে নিজেরা লড়াই শুরু করেছে। গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভিন্নভাবে বিভক্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন হলে যাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে, তারাই বলছে বিএনপি শুধু নির্বাচন চায়। এনসিপি আওয়ামী লীগের মতোই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বিক্রি করছে। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্য সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, সবাই মিলে বিএনপির পেছনে লেগেছে, কারণ সবাই জানে আগামী নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে জিতবে। এ কারণে তারা নির্বাচন চায় না। আওয়ামী লীগের পতন থেকে সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। হাসিনা পালালেও হাসিনার লোকজন আছে। এ কারণে দেশ থেকে এখনো দুর্নীতি কমেনি।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী এবং সমাবেশে সঞ্চালনা করেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোজাদ্দেদ আলী বাবু।
আইনে অস্পষ্টতার সুযোগে চালানো হয় নিপীড়ন : নজরুল
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘আইনে অস্পষ্টতার সুযোগে যারা আইন প্রয়োগ করে, তারা জনগণের ওপর নিপীড়ন চালায়। আইনে যদি অস্পষ্টতা থাকে এবং জনগণ হয়রানির শিকার হয়, তাহলে সে অস্পষ্টতা দূর করার কর্তব্য যারা আইন করেন তাদের।’
গতকাল শনিবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ কতটুকু সুরক্ষা দেয়’ শীর্ষক সেমিনারে নজরুল ইসলাম খান এসব কথা বলেন।
নজরুল বলেন, ‘যা যা পরিবর্তন করা প্রয়োজন ছিল, সেটা এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি। এই অধ্যাদেশে অতীতে যারা শাস্তি পেয়েছেন, তারা মুক্তি পাবেন। কিন্তু ঘুরে ফিরে ওই একই বিধান আরেক জায়গায় রাখা হয়েছে, যাতে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়া হবে। এর চেয়ে বড় অযৌক্তিক বিষয় আর কী হতে পারে। অধ্যাদেশের বিধানে অস্পষ্টতা আছে। আইন করা হয় মানুষের জন্য। কিন্তু মানুষ তা বোঝে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে।’ এসব আইন মানুষকে জানানোর ও বোঝানোর জন্য রাজনীতিক, দল ও নাগরিক সমাজের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা আইনের অপব্যবহার করে এবং ব্যত্যয় ঘটিয়ে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালায়, তাদেরও শাস্তির বিধান, জবাবদিহির বিধান থাকা উচিত।’
বিএনপি নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড চলে ঐকমত্য কমিশনে। সেখানে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও এই সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা নেই।’
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ৩৫ ধারার বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের বিধানের সমালোচনা করে বলেন, ‘যদিও সরকার বলছে, বিধানটি আগের মতো উন্মুক্ত নয়, সংকুচিত করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ কোনো সীমাবদ্ধতায় থাকে না। যে আইন নেই, তার ওপরও পুলিশ কাজ করে। এই অধ্যাদেশ রাখা যাবে না।’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব ভায়োলেন্সের সমালোচনা করেন মান্না। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদাকে বাড়ি থেকে বের করে যেভাবে মব তৈরি করা হয়েছে, তার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘এটা কোন সংস্কৃতি? তিনি অন্যায় করলে তাকে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দেন। ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য একে আজাদের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। এই বাড়ি ভাঙার সংস্কৃতি চললে দেশে গণতন্ত্র আসবে কী করে। থানা ঘেরাও করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই সরকারের ব্যর্থতার সীমা নেই।’
সেমিনারে ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশুরুর বলেন, ‘সরকার এই অধ্যাদেশ করার আগে অনেক কিছুই আমলে নিয়েছে এবং এটা আগের চেয়ে উন্নত। তবে বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে অপরাধ করলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এই বিধানের সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। আগে দেখা গেছে, দেশের গোয়েন্দা সংস্থা এবং এনটিএমসির মতো প্রতিষ্ঠান টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে মানুষের ফোনকল ফাঁস করেছে। তারাই গোপনীয়তা লঙ্ঘন করেছে।’
সেমিনারে মূল বক্তব্য পাঠ করেন নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক সাকিব আনোয়ার। এছাড়া বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের অর্থ সমন্বয়ক দিদারুল ভূঁইয়া, নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রধান সমন্বয়ক আকরাম হুসাইন প্রমুখ।
দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়াই আওয়ামী লীগের চরিত্র : মঈন খান
দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়াই আওয়ামী লীগের চরিত্র, বলেছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী লেখক ফোরাম আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
মঈন খান বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ধারণার বিস্তৃতি ছিল বিশাল। তার অর্থনীতি, রাজনীতি, অকুতোভয় দেশপ্রেম, সর্ব ক্ষেত্রের মূলভিত্তি ছিল এই জাতীয়তাবাদ। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও আওয়ামী লীগকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনা যেভাবে ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে গেছে ঠিক সেরকম মুজিবও পালিয়ে গিয়েছিল। ওদের চরিত্রই হলো পালিয়ে যাওয়া।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী আচরণ ও দুঃশাসনের বিষয়ে জনগণ অবগত দলটি দীর্ঘসময় দেশ শাসন করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ দেশে কখনোই জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।’
মঈন খান বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে সমস্যা দেখেছিলেন। তিনি নিজে সমস্যাটির সমাধান খুঁজে বের করেছিলেন। তা হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। জিয়াউর রহমান সবক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী নীতি মেনেই দেশকে এগিয়ে নিয়েছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান দেশ থেকে একদলীয় স্বৈরতন্ত্র উৎখাত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছেন। তিনি ভিন্নমতকে উৎসাহিত করতেন।’
এ সময় তিনি জাতীয়তাবাদী লেখক ফোরামের নবগঠিত কমিটি ঘোষণা করেন। কবি শাহীন রেজাকে সভাপতি এবং কবি ড. শহীদ আজাদকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ণাঙ্গ কমিটির ঘোষণা দেন। এ সময় অতিথিরা ‘চেতনায় জাতীয়তাবাদ’ নামে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। আলোচনা সভার উদ্বোধন ঘোষণা করেন ষাট দশকের কবি আল মুজাহিদী। বক্তব্য দেন দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে কবিতা পাঠের আসর বসে। যেখানে জাতীয়তাবাদ ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র জগতের প্রবীণ শিল্পী আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, ঢাবির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খানসহ কবি, সাহিত্যিক শিল্পী ও বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।
