‘মা-বাবা এই বয়সে খুব কষ্ট করে আমার পড়াশোনা চালানোর জন্য দোকানদারি করছেন। আমি খুব কষ্ট পাই, কিন্তু কী করব, আমি তো এখনো লেখাপড়া শেষ করতে পারিনি। লেখাপড়া শেষ হলে আমি একটি ভালো চাকরি করব। দেশে চাকরি না পেলে বিদেশে গিয়ে চাকরি করব। তখন আর বাবাকে দোকানদারি করতে দিব না। তুমি মনে রেখ মা, আমার মনের খুব ইচ্ছা বাবার এই কষ্টের অবস্থা থেকে, তাকে অবসরে বিশ্রাম নেওয়ার সময় দিব।’
২০২৪ সালের ২৮ জুন দুপুরে বাড়ি থেকে সিলেট যাওয়ার জন্য প্রস্তুতিকালে মা শিখা বণিকের গলা ধরে কথাগুলো বলেছিলেন রুদ্র সেন। কিন্তু এর মাত্র ২০ দিনের মাথায় পরিবারের কাছে খবর আসে ‘রুদ্র সেন আর নেই।’ এই খবরে পরিবারের ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
দিনাজপুর শহরের পাহাড়পুর এলাকার শিখা বণিক ও সুবীর কুমার সেনের ছেলে রুদ্র সেন। দুই ভাই বোনের মধ্যে রুদ্র ছিলেন ছোট।
রুদ্রর বাবা সুবীর সেন (৬৭) দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ী ডিগ্রি কলেজে ১৯৮৫ সালে শিক্ষকতা শুরু করেন। ছয় বছর হলো, তিনি ওই কলেজ থেকে অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি শহরের বাহাদুর বাজার এনএ মার্কেটে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে মুদি দোকানের ব্যবসায় করছেন।
রুদ্র সেন সিলেটের হযরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে কেমিক্যাল অ্যান্ড পলিমার সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৪ সালে তিনি লেবেল-২ সেমিস্টার-ওয়ানে অধ্যয়নরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ২০ জুন ঈদের ছুটিতে রুদ্র বাড়িতে এসেছিল। কয়েক দিন থাকার পর তার সহপাঠী মোবাইল ফোনে রুদ্রকে জানায়, ২ আগস্ট থেকে সেমিস্টার ওয়ানের পরীক্ষা শুরু হবে।
রুদ্রর মা শিখা বণিক বলেন, ‘২৮ জুন রুদ্রর আবেগঘন কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি তাকে বলেছিলাম, বাবা তুই আগে লেখাপড়া শেষ কর, তার পরে তোর সব ইচ্ছা পূরণ করিস।’ দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর তার বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুদ্রকে শহরের কালিতলা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টায় সিলেটগামী বাসে তুলে দিই। রুদ্র আমাকে হাত নাড়িয়ে সাবধানে বাড়ি যাওয়ার কথা বলে চলে যায়।
রুদ্রর মা বলেন, এরপর ১৮ জুলাই রাত সাড়ে ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে একজন রুদ্রর বাবাকে ফোনে জানান, রুদ্র সেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়ায় পালাতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছেন। এই কথা শোনার পর রুদ্রর বাবার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি ঘরের মেঝেতে পড়ে যায়। জিজ্ঞেস করলে তিনি (রুদ্রর বাবা) বলেন, ‘আমাদের সন্তান রুদ্র সেন আর নেই। সে পুলিশের ধাওয়ায় পানিতে ডুবে মারা গেছে।’ আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুদ্রর বাবাকে বলেন, ‘রুদ্র সেন ১৮ জুলাই সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিক্ষোভ করেছে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ধাওয়া দিলে রুদ্রসহ তার সহপাঠীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে সিলেটের রূপসা আবাসিক এলাকায় তাদের ভাড়া নেওয়া মেসে আসে। সেখানে তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল। ওইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রদের একটি মিছিল ওই মেসের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ মিছিলটিকে ধাওয়া দেয়। এ সময় তারা চার সহপাঠী একসঙ্গে বাসার পেছন দিয়ে ভেলায় করে পালিয়ে যাচ্ছিল। ভেলাটি জলাশয়ের মাঝখানে গিয়ে ডুবে যায়। রুদ্র সেন সাঁতার জানত না। সে পানিতে ডুবে যায়। তার তিন সহপাঠী পেছনে ফিরে রুদ্রকে খুঁজে পাচ্ছিল না। এরপর তারা পানিতে নেমে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে গুরুতর অবস্থায় রুদ্রকে উদ্ধার করে। সেখান থেকে দ্রুত ভ্যানে করে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায় তারা। কিন্তু ক্লিনিকের লোকজন তাদের বলে, এই আন্দোলনে আহত রোগীকে তারা চিকিৎসা দিতে পারবে না। এরপর রুদ্রকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে রাত ৮টায় চিকিৎসক রুদ্র সেনকে মৃত ঘোষণা করেন।’
শহীদ রুদ্র সেনের মা আরও বলেন, ‘এই আন্দোলনে আমার ছেলের মতো অনেক মায়ের কোল খালি হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত জড়িতদের বিচার হলো না।
সুবীর সেন বলেন, ‘১৯ জুলাই বিকেল থেকে আমার বাসায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার দুজনেই এসে খোঁজখবর নেন। প্রশাসন থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ১৯ জুলাই রাতের মধ্যেই লাশ সৎকার করা হবে। এজন্য আমাদের প্রস্তুত থাকার জন্য বলেন। রাত ১২টায় আমার শহীদ পুত্র রুদ্রসেনের লাশ দিনাজপুর শহরে পাহাড়পুর মহল্লায় বাসার সামনে এসে পৌঁছায়। ঘণ্টাখানেক পর প্রশাসন তড়িঘড়ি করে লাশ সৎকারের তাগিদ দেয়। রাত দেড়টায় আমার শহীদ পুত্র রুদ্রসেনের লাশ কেন্দ্রীয় শ্মশানে নেওয়া হয়।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দিনাজপুর জেলা কমিটির সদস্য সচিব অন্তু খান বলেন, ‘শহীদ রুদ্র সেন আমার সমবয়সী। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রুদ্র সেন শহীদ হয়েছেন। আমি রুদ্র সেনের বাবা সুবীর সেনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। তিনি আমাদের নিজের ছেলের মতো ভালোবাসা ও স্নেহ দেন। আমি যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন এই পরিবারটির পাশে থাকব।’
